ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

মফস্বলের লাইব্রেরিগুলোর নীরব কান্না

ফিচার ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ০১ মার্চ ২০২৬

তানজিদ শুভ্র
ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ সরকারি ফুলবাড়ীয়া মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। একসময় টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই একদল পড়ুয়া ছুটত মাঠের একপ্রান্তে থাকা হলুদ রঙের ভবনটির দিকে। সেখানে একটি বেসরকারি সংস্থার পরিচালনায় চলা পাবলিক লাইব্রেরিতে ছিল প্রাণের স্পন্দন। ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা পড়ার টেবিল, ইনডোর গেমস আর সারাদিন সংবাদপত্রের পাতায় চোখ বুলানো পাঠকদের ভিড়-সব মিলিয়ে জ্ঞানচর্চার এক জমজমাট আসর।

আজ সেখানে গেলে দেখা মেলে এক ভিন্ন চিত্রের। দরজায় ঝুলছে মরচে ধরা তালা। করোনা মহামারির ধাক্কায় ধুঁকতে ধুঁকতে সেই যে বন্ধ হলো, আর খুলল না।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন-শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম ও একাডেমিক পড়াশোনার জন্য বিদ্যালয়ের নিজস্ব পাঠাগারটি অবশ্য সচল রয়েছে। কিন্তু স্কুলের গণ্ডির বাইরে সাধারণ পাঠক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী কিংবা স্থানীয় বইপ্রেমীদের জন্য জ্ঞানচর্চার যে উন্মুক্ত দুয়ারটি ছিল, সেটিই আজ রুদ্ধ। স্কুলের একাডেমিক লাইব্রেরি শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটালেও, মাঠের ওই পাবলিক লাইব্রেরিটি ছিল মূলত সৃজনশীল আড্ডা ও মুক্ত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, যা এখন শুধুই স্মৃতি।

পুরোনো সেই পাঠকরা যখন স্কুল মাঠে যান, বুকভরা দীর্ঘশ্বাস আর স্মৃতিকাতরতা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকে না। কেন এই বিমুখতা? কারণ খুঁজলে দুটি চিত্র পাওয়া যায়। প্রথমত, সংস্থার কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পর স্থানীয়ভাবে আর সেটির হাল ধরেনি কেউ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার আজ তালাবদ্ধ। দ্বিতীয়ত, সময়ের সঙ্গে তাল না মেলানো। পুরোনো লাইব্রেরিগুলোতে কেবল বই সাজিয়ে রাখা হতো, কিন্তু পাঠকদের টানার মতো কোনো আধুনিক আয়োজন ছিল না।

JAGONEWS

আরও পড়ুন
তিস্তার চরে স্বপ্নের আলো জ্বালাচ্ছে ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’
ফেব্রুয়ারি মাস কেন ২৮ দিনে হয় জানেন?

তবে হতাশার এই চিত্রের বিপরীতেই আশার আলো জ্বলছে একই উপজেলার আছিম এলাকায়। সেখানে তারুণ্যের শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে ‘জাগ্রত আছিম গ্রন্থাগার’। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একদল তরুণের সাহসী উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এই বাতিঘর।

তরুণরা কেন বই পড়ছে না-এই অভিযোগ যখন চারদিকে, তখন প্রত্যন্ত গ্রামে এমন লাইব্রেরি গড়ার সাহস তারা পেলেন কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে ‘জাগ্রত আছিম গ্রন্থাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জিল্লুর রহমান রিয়াদ শোনালেন এক মুগ্ধকর শুরুর গল্প।

তিনি বলেন, ‘আমরা আসলে অন্য কাউকে পড়ানোর জন্য গ্রন্থাগার করিনি। ছোটবেলা থেকেই ঈদের সালামি এবং টিফিনের টাকা জমিয়ে বই কিনতাম। কলেজে পড়ার সময় ব্যক্তিগতভাবেই আমার সংগ্রহে অর্ধশতাধিক বই জমে যায়। পরবর্তীতে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে সবার সহযোগিতায় আমরা এই পাঠাগারটি গড়ে তুলি।’

কেবল বই সাজিয়ে রেখেই তারা দায়িত্ব শেষ করেননি। রিয়াদ জানান, পাঠকদের ধরে রাখতে তারা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়েছেন। বৃক্ষরোপণ, উন্মুক্ত কুইজ প্রতিযোগিতা, উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সেমিনার, বিতর্ক কর্মশালা, এমনকি ভ্রাম্যমাণ বইমেলার মতো আয়োজনও তারা করছেন নিয়মিত। ফলে যাদের বই পড়ার অভ্যাস ছিল না, তারাও কুইজ বা আড্ডার টানে লাইব্রেরিতে এসে এখন নিয়মিত পাঠক হয়ে উঠেছেন।

ফুলবাড়ীয়া সদরের বন্ধ হয়ে যাওয়া পাবলিক লাইব্রেরিটি কীভাবে প্রাণ ফিরে পেতে পারে? এ বিষয়ে উদ্যমী তরুণদের পরামর্শ বেশ স্পষ্ট। জিল্লুর রহমান রিয়াদের মতে, লাইব্রেরি বাঁচাতে হলে আয়োজকদেরও বইপ্রেমী হতে হবে। পাঠকদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে না পারলে লাইব্রেরি টিকিয়ে রাখা কঠিন। আর সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে লাইব্রেরি খোলা রাখা। অনিয়মিতিই পাঠক বিমুখতার বড় কারণ।

একটি লাইব্রেরি বন্ধ হওয়া মানে কেবল একটি ঘরের দরজা বন্ধ হওয়া নয়, বরং একটি এলাকার সংস্কৃতিচর্চার ফুসফুস অকেজো হয়ে যাওয়া। লাইব্রেরিহীন এই সময়ে কিশোরদের হাতে বইয়ের বদলে উঠেছে দামী গ্যাজেট। অলস মস্তিস্ক তাদের ঠেলে দিচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং কালচার’ বা মাদকের মতো ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে।

মফস্বলের লাইব্রেরিগুলো কি তাহলে এভাবেই হারিয়ে যাবে? নাকি আছিমের মতো তরুণরা আবার জেগে উঠবে প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায়? ফুলবাড়ীয়া পাইলট স্কুলের মাঠের সেই তালাবদ্ধ লাইব্রেরিটি খোলা আজ সময়ের দাবি। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি ধুলোমাখা তালা চাই, নাকি আছিমের মতো জাগ্রত বাতিঘর চাই?

কেএসকে

আরও পড়ুন