তিস্তার চরে স্বপ্নের আলো জ্বালাচ্ছে ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ০৪:১৫ পিএম, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
লালমনি বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা নাঈম রহমান

লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর চরাঞ্চল, দিগন্তজোড়া বালুচর, প্রকৃতির রুক্ষতা আর জীবনের সঙ্গে প্রতিদিনের নিরন্তর লড়াই। এই চরের শিশুদের চোখে একসময় কেবল দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার ছায়াই দেখা যেত। তবে এখন সেই চোখে উঁকি দিচ্ছে আগামীর স্বপ্ন। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন লালমনিরহাটের তরুণ সমাজকর্মী নাঈম রহমান। নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’-এর মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন তিস্তা পাড়ের শত শত সুবিধাবঞ্চিত শিশুর স্বপ্নসারথি।

২১ বছর বয়সী নাঈম রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা লালমনিরহাট সদর উপজেলায়। বাড়ির কাছেই তিস্তার চরাঞ্চল হলেও মূল ভূখণ্ড ও চরের বাস্তবতার পার্থক্য তাকে ছোটবেলা থেকেই নাড়া দিত। একদিকে আধুনিক নাগরিক সুবিধা, অন্যদিকে চরম দারিদ্র্য, অশিক্ষা আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা শৈশব। এই বৈষম্যই নাঈমকে ভাবিয়ে তোলে।

jagonewsতিনি দেখতেন, সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে চরের শিশুরা একে একে স্কুলছুট হচ্ছে, কেউ জড়িয়ে পড়ছে শিশুশ্রমে, কেউ আবার মাদকের অন্ধকারে। এই অভিভাবকীয় শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যাত্রা শুরু করে ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’।

লালমনি বিদ্যাপীঠ কোনো গতানুগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে নেই চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষ কিংবা বাঁধাধরা পাঠ্যসূচি। এটি মূলত একটি সমন্বিত কাঠামো, যা চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য ‘ছায়া অভিভাবক’ হিসেবে কাজ করছে।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য, শিক্ষা সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ ও স্বাস্থ্যজ্ঞান প্রদান করে একটি শিশুকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

বর্তমানে ৩০ জন নিবেদিতপ্রাণ ভলান্টিয়ারের মাধ্যমে ৬টি কেন্দ্রে সপ্তাহে একদিন পাঠদান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয়,পরিচ্ছন্নতা, শিষ্টাচার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা,সবই রয়েছে এই কার্যক্রমে।

এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, কুসংস্কার আর নিয়মিত অর্থের অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। নিজেদের পড়াশোনার খরচ বাঁচিয়ে এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সামান্য সহযোগিতায় নাঈম ও তার সহযোদ্ধারা এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী এই উদ্যোগে নেই কোনো বড় দাতা সংস্থার অর্থায়ন, আছে কেবল তারুণ্যের অদম্য শক্তি।

jagonewsলালমনি বিদ্যাপীঠের মাধ্যমে এরই মধ্যে ৮০০’র বেশি অভিভাবক বাল্যবিবাহ না দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। অর্ধশতাধিক সচেতনতা ক্যাম্প পরিচালিত হয়েছে। ঝরে পড়া অনেক শিশুকে পুনরায় স্কুলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। শিশুশ্রম ও মাদক থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।

ডাউকিচরের বাসিন্দা সালমা বেগম বলেন, অর্থের অভাবে সন্তানকে পড়ালেখা করাতে পারতাম না। এখন লালমনি বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করে সে নিজের নাম লিখতে পারে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় সুখ।

খাটামারী চরের মোসলেমা আক্তার বলেন, স্কুল অনেক দূরে হওয়ায় নিয়মিত পাঠাতে পারি না। লালমনি বিদ্যাপীঠে পড়ালেখা করায় এখন দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে। ভলান্টিয়ার শিক্ষক মাইশা আক্তার বলেন, ‘শহরে বসে চরের জীবন বোঝা যায় না। এখানে এসে বুঝেছি তারা কতটা সংকটে থাকে। লালমনি বিদ্যাপীঠের মাধ্যমে শিশুদের পড়াতে পারাটা আমাদের জন্য আনন্দের।’

লালমনি বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা নাঈম রহমান বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিশুরা মেধার দিক থেকে পিছিয়ে নেই, তারা কেবল সুযোগের অভাবে পিছিয়ে থাকে। যদি অভিভাবকের মতো পাশে থাকা যায়, তাহলেই তাদের জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব।’

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে তিস্তা পাড়ের প্রতিটি চরে এই মডেল ছড়িয়ে দিয়ে একটি মানবিক ও সুযোগ-সমৃদ্ধ প্রজন্ম গড়ে তুলাই একমাত্র লক্ষ্য আমাদের।

আরও পড়ুন
সেলাই মেশিনে ভাগ্য বদলানো সান্ত্বনা শত নারীর অনুপ্রেরণা
‘জয়নগরের মোয়া’ কেন এত জনপ্রিয়

মহসীন ইসলাম শাওন/কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।