ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

হাজার বছর আগের মহামারি হাম, বছরে লাখ লাখ প্রাণহানি

ফিচার ডেস্ক | প্রকাশিত: ১১:০২ এএম, ৩১ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মিজেলস বা হাম। টিকাদান কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝে মধ্যেই হাম আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়নি বা টিকাদানের আওতার বাইরে রয়েছে, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম এখনো শিশুদের জন্য অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, এবং দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি আবার বড় আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

হাম মূলত একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মিজেলস ভাইরাস নামে পরিচিত জীবাণুর কারণে হয়। এটি মানুষের শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। গবেষকদের ধারণা, প্রায় হাজার বছর আগে এই ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে ছড়াতে শুরু করে।

jagonews১০ম শতাব্দীতে পারস্যের চিকিৎসক মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি প্রথম হাম রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি হাম এবং গুটিবসন্তের মধ্যে পার্থক্যও ব্যাখ্যা করেছিলেন। তখন থেকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই রোগের পরিচিতি তৈরি হয়। তবে ধারণা করা হয়, এর উৎস আরও পুরোনো। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গবাদি পশুর মধ্যে থাকা এক ধরনের ভাইরাস থেকে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে হাম ভাইরাসের উদ্ভব ঘটে।

হামকে বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি বলা হয়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে খুব সহজেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিতে পারেন। মধ্যযুগে ইউরোপে যখন জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল, তখন শহরগুলোতে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বাণিজ্য, যুদ্ধ এবং মানুষের যাতায়াতের মাধ্যমে এই রোগ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়।

১৫ ও ১৬ শতকে ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা যখন আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছান, তখন তাদের সঙ্গে হাম ভাইরাসও সেখানে প্রবেশ করে। সে সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। ফলে ব্যাপক মৃত্যু ঘটে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, কিছু অঞ্চলে পুরো জনসংখ্যার বড় অংশই এই রোগে মারা যায়।

jagonews২০ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হাম ছিল শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই রোগে মারা যেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের আগে প্রতি বছর প্রায় ২৬ লাখ মানুষ হাম রোগে মারা যেত। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোতে মৃত্যুহার ছিল বেশি।

১৯৫৪ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথম হাম ভাইরাসকে আলাদা করে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মার্কিন বিজ্ঞানী জন এফ. এন্ডার্স এবং তার সহকর্মীরা। এরপর ১৯৬৩ সালে প্রথম হাম প্রতিরোধী টিকা তৈরি করা হয়। এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বড় এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

টিকা আবিষ্কারের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধীরে ধীরে হাম প্রতিরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। অনেক দেশেই শিশুদের বাধ্যতামূলক টিকাদান চালু করা হয়। ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০০০ সালের পর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। এতে হাম আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে আসে।

jagonewsবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হাম প্রতিরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটির বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। যদিও হাম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবুও এটি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বিভিন্ন দেশে টিকা নেওয়ার হার কমে গেলে আবার সংক্রমণ বাড়তে দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু অঞ্চলে টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং যুদ্ধ বা সংকটের কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হলে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার কিছু দেশে আবার হাম আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়মিত টিকাদানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

jagonewsবাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের হাম টিকা দেওয়া হয়। এর ফলে একসময় এই রোগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু এলাকায় এখনো টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশু রয়েছে। পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শহরে মানুষের ঘনবসতির কারণে সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে হাম থেকে সহজেই সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। সাধারণত শিশুদের নির্দিষ্ট বয়সে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেয়। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

কেএসকে

আরও পড়ুন