ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

মাটি, রং আর স্বপ্নে গড়া এক উৎসব

জান্নাত শ্রাবণী | প্রকাশিত: ১২:৪৪ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

শীতের নরম রোদ আর কুয়াশাভেজা সকালের মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চত্বরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক আলাদা জগৎ। বাঁশের খাঁচা, রঙিন কাপড় আর কাঁচা মাটির গন্ধে সেখানে তৈরি হচ্ছে বিদ্যার আরাধনার মঞ্চ। কেউ হাতে তুলছেন তুলি, কেউ মাটি ছুঁয়ে দিচ্ছেন আকার, আবার কেউ স্বপ্ন আঁকছেন মণ্ডপের নকশায়।

প্রতিবছরের মতো এবারও সরস্বতী পূজাকে ঘিরে জগন্নাথ হল যেন রূপ নিচ্ছে মাটি, রঙ আর শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত স্বপ্নে গড়া এক উৎসবে। যেখানে ধর্মীয় আচার ছাড়িয়ে মিলেমিশে আছে সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা আর ক্যাম্পাস জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চত্বরে চলছে সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী আবাসিক হল জগন্নাথ হল বরাবরই সরস্বতী পূজাকে ঘিরে এক আলাদা পরিচয়ের বাহক। এখানে সরস্বতী পূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সম্মিলিত উদ্যোগ আর সাংস্কৃতিক চর্চার এক জীবন্ত উদাহরণ।

জগন্নাথ হলের খোলা মাঠ এখন যেন এক অস্থায়ী কর্মশালা। বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে পূজা মণ্ডপ তৈরিতে নেমেছেন। কোথাও বাঁশ আর কাপড়ের ফ্রেম দাঁড়িয়ে গেছে, কোথাও রঙিন কাগজে ফুটে উঠছে আলপনার নকশা। কেউ পরিকল্পনা করছেন আলো সাজানোর, কেউ আবার হিসাব করছেন শেষ মুহূর্তে কী কী লাগবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চত্বরে চলছে সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি

এই ব্যস্ততার মধ্যে নেই কোনো ক্লান্তি, বরং আছে এক ধরনের আনন্দ। ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্টের চাপের বাইরে এসে শিক্ষার্থীরা এখানে একসঙ্গে কাজ করছেন এটাই যেন পূজার সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি। একেকটি মণ্ডপে ফুটে উঠছে আলাদা ভাবনা, কোথাও বিদ্যার আলো, কোথাও সৃষ্টিশীলতার রূপক, আবার কোথাও শান্তি ও মানবতার বার্তা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চত্বরে চলছে সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি

মাঠের একপাশে চলছে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর প্রতিমা তৈরির কাজ। খড়, মাটি আর রঙের সংমিশ্রণে ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছেন দেবী। শিল্পীর নিখুঁত হাতে কখনো গড়ে উঠছে মুখের অবয়ব, কখনো শঙ্খ, বীণা আর পদ্মের সূক্ষ্ম কাজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চত্বরে চলছে সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি

প্রতিমার চোখ আঁকার মুহূর্তটি যেন সবচেয়ে আবেগঘন। বিশ্বাস করা হয়, এই চোখ আঁকার মধ্য দিয়েই প্রতিমায় প্রাণ সঞ্চার হয়। সেই সময়টাতে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চোখেও এক ধরনের নীরব শ্রদ্ধা আর বিস্ময় দেখা যায়। শহরের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে, জগন্নাথ হলের এই কোণে যেন শিল্প আর বিশ্বাস মিলেমিশে এক হয়ে যায়।

সরস্বতী পূজা জগন্নাথ হলে একটি সামাজিক উৎসবও বটে। এখানে শুধু আবাসিক শিক্ষার্থী নয়, অন্যান্য হল ও অনুষদ থেকেও বন্ধুরা আসেন। সাদা-হলুদ শাড়ি, পাঞ্জাবি, কপালে চন্দনের টিপ সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চত্বরে চলছে সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি

এই দিনটিতে অনেকের জন্য স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যায়। কেউ প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পূজা দেখছেন, কেউ আবার শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে বিদায়ের আগে শেষবারের মতো এই আয়োজন উপভোগ করছেন। ছবি তোলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, প্রসাদ গ্রহণ সবকিছু মিলিয়ে সরস্বতী পূজা হয়ে ওঠে স্মৃতি জমা করার এক বিশেষ দিন।

জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজা মানে শুধু বর্তমান নয়, অতীতের সঙ্গেও এক গভীর সংযোগ। এই হলের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীর স্মৃতি। বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় পূজা, একই ধরনের আয়োজন সবকিছু মিলিয়ে এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চত্বরে চলছে সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি

তবে সময়ের সঙ্গে বদলও এসেছে। এখন পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের চেষ্টা, প্লাস্টিক কমানোর উদ্যোগ, আলোয় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চিন্তা সবই নতুন প্রজন্মের ভাবনায় যুক্ত হচ্ছে। এতে করে পূজাটি শুধু ঐতিহ্য রক্ষা করছে না, বরং সময়ের দাবির সঙ্গেও তাল মিলিয়ে চলেছে।

শিক্ষাজীবনের চাপ, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, শহুরে জীবনের ক্লান্তি সবকিছুর মাঝখানে সরস্বতী পূজা শিক্ষার্থীদের দেয় একদিনের প্রশান্তি। বিদ্যার দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে সবাই যেন নিজের মতো করে কিছু প্রার্থনা করেন ভালো ফলের, সৃজনশীলতার, কিংবা মনের স্থিরতার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চত্বরে চলছে সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি

২৩ জানুয়ারি জগন্নাথ হলের মাঠে সেই প্রার্থনা আর উৎসবের মিলন ঘটবে আবারও। বাঁশ আর কাপড়ের মণ্ডপ, মাটির প্রতিমা আর রঙের ছোঁয়ায়, শিক্ষার্থীদের হাসি আর ব্যস্ততায় জগন্নাথ হল হয়ে উঠবে বিদ্যা, সংস্কৃতি আর মানুষের মিলনের এক অনন্য ঠিকানা।

জেএস/

আরও পড়ুন