ভোলা সদর হাসপাতালে ‘ম্যানেজ করে নেওয়া’ই বাস্তবতা!
ভোলা সদর হাসপাতালে রোগী দেখছেন অর্থোপেডিক কনসালটেন্ট চিকিৎসক শুভ প্রসাদ/ছবি-সংগৃহীত
দুই বছর আগে রাজধানীর আধুনিক চিকিৎসা পরিবেশ ছেড়ে নিজ জেলা ভোলায় যোগ দিয়েছিলেন একজন অর্থোপেডিক কনসালটেন্ট চিকিৎসক শুভ প্রসাদ। কিন্তু ১০০০ শয্যার একটি সুসজ্জিত হাসপাতাল থেকে এসে তিনি যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা ছিল একেবারেই ভিন্ন—ভাঙাচোরা ভবন, অপর্যাপ্ত জনবল, আর সীমাহীন রোগীর চাপ।
২০২৪ সালের ২ এপ্রিল ভোলা সদর হাসপাতালে যোগদানের পর তার প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল হতাশাজনক। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় ছাগল ও কুকুর। পুরো পরিবেশ দেখে তার মনে হয়েছিল, এটি যেন একটি পরিত্যক্ত ভবন।
২০ লাখ মানুষের ভরসা, কিন্তু ‘নাই নাই’ অবস্থা। ভোলা সদর হাসপাতালটি প্রায় ২০ লাখ মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল। অথচ এখানে রয়েছে তীব্র সংকট—পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই, নার্সের অভাব, এক্স-রে ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট এবং ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা সামগ্রীর ঘাটতি।

ভোলা সদর হাসপাতাল/ছবি-সংগৃহীত
চিকিৎসকদের ভাষায়, এই সংকটের মধ্যেই প্রতিনিয়ত বলা হয়- ‘ম্যানেজ করে নাও’। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। শুধু শিশু ওয়ার্ডেই রয়েছে ২৫০-এর বেশি রোগী, যেখানে শয্যা মাত্র ৬০টি।
প্রতিদিন একজন চিকিৎসককে আউটডোরে প্রায় ৩০০ রোগী দেখতে হয়। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ২০০-র বেশি রোগীর চাপ সামলাতে হয়। জনবল সংকটের কারণে পুরো ব্যবস্থাই চলছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মী দিয়ে।
অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে সেবায় সামান্য বিলম্ব হলেই ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন রোগী ও স্বজনরা। সম্প্রতি শিশু ওয়ার্ডে একটি ক্যানুলা দিতে দেরি হওয়ায় এক স্টাফকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে কাজ করা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভোলা এখন অনেক চিকিৎসকের কাছেই আতঙ্কের নাম।
অর্থোপেডিক কনসালটেন্ট চিকিৎসক শুভ প্রসাদ/ছবি:সংগৃহীত
গত বছর একসঙ্গে সাতজন চিকিৎসককে ভোলায় পদায়ন করা হলেও, কেউই যোগ দেননি। স্থানীয় সহিংসতা ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এর অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে।
চিকিৎসকদের অভিযোগ, গণমাধ্যমে হাসপাতালের নানা সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হলেও, জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের বাস্তবতা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ফলে জনমনে চিকিৎসকদের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।
তবে সব প্রতিকূলতার মাঝেও চিকিৎসকদের টিকিয়ে রেখেছে মানুষের ভালোবাসা। অনেক রোগী চিকিৎসকদের জন্য নিজের ধরা মাছ, বাড়ির ফল বা ডিম নিয়ে আসেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশে।
চিকিৎসক শুভ প্রসাদের ভাষায়, ‘অনেক মানুষ আছে যারা আমার জন্য অপেক্ষা করে। তাদের জন্যই টিকে আছি।’
এই চিত্র শুধু ভোলার নয়, দেশের অনেক উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেরই প্রতিচ্ছবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত জনবল নিয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করলে এই সংকট আরও তীব্র হবে।
এমআরএম