দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর নির্বাচন, কার হাতে ভবিষ্যৎ?
তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমান/ ছবি: ফেসবুক
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাইরে উত্তর দিকে এগোচ্ছিল তারেক রহমানের বুলেটপ্রুফ প্রচারণা বাস। প্রতি কয়েক মাইল পরপরই গাড়ির গতি কমানো হচ্ছিল, যাতে অপেক্ষমাণ সমর্থকেরা তাকে কাছ থেকে দেখতে পারেন। রাজনীতিকের বহর সামনে যেতেই উল্লাসিত সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে সেলফি তুলতে থাকেন। পোশাক কারখানাগুলোর জানালায় জানালায় জড়ো হচ্ছিলেন নারী শ্রমিকেরা। চার ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রাপথজুড়ে ময়মনসিংহে পৌঁছানো পর্যন্ত ভিড়ের দিকে রাজকীয় ভঙ্গিতে হাত নাড়তে থাকেন তিনি। ফিরতি পথেও চার ঘণ্টার বেশিরভাগ সময় একইভাবে হাত নাড়ানোর কথা।
বিখ্যাত এক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন তিনি।
বিপ্লবের পর প্রথম নির্বাচন
১৮ মাস আগে বাংলাদেশে সংঘটিত জেন-জি বিপ্লবের পর এটাই হবে প্রথম নির্বাচন। ওই বিপ্লবে তরুণ বিক্ষোভকারীরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের রক্তক্ষয়ী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের অবসান ঘটায়। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক কিছুটা মেরামত হওয়ার কথা। তবে দেশের বিপ্লবীরা যে ব্যাপক রাজনৈতিক সংস্কারের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা এই নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে—এমন সম্ভাবনা কম।
২০০৮ সালে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশে আর কোনো প্রকৃত নির্বাচন হয়নি। দেশের ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই কখনো প্রকৃতভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। ঢাকাভিত্তিক থিংকট্যাংক বিআইপিএসএসের শাফকাত মুনির বলেন, ‘জীবনের দুই দশকজুড়ে আমার ভোটের কোনো মূল্যই ছিল না।’ এবার রাজধানীর সড়কগুলো প্রচারণার ব্যানারে ছেয়ে গেছে। নতুন নির্বাচনী বিধি মেনে অধিকাংশ ব্যানারই সাদা-কালো রঙে ছাপা হয়েছে।
নির্বাচন তদারক করা হবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দায়িত্ব। বিপ্লবের পর থেকে এ সরকার পরিচালনা করছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সরকারের কার্যক্রম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও অধিকাংশ মানুষের মতে, পতনের মুখে থাকা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এই সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নতুন করে স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়া ঠেকাতে রাজনীতিকদের সঙ্গে কাজ করে কিছু সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে রয়েছে নতুন একটি উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা। এই আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষাবিদ আলী রিয়াজ বলেন, ‘চারদিকে সংশয়বাদীরা আমাকে বলেছিল, এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হবে—দলগুলো একে অপরের সঙ্গে কথা বলবে না, চিৎকার করবে, চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু করবে।’ বাস্তবে বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই প্রস্তাবগুলোর পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। নির্বাচনের দিনই গণভোটে এগুলো ভোটারদের সামনে তোলা হবে। প্রস্তাবগুলো পাস হলে সেগুলো আইনে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পড়বে পরবর্তী সরকার গঠন করবে যে দল, তার ওপর।
ভোট প্রতিযোগিতায় এগিয়ে কে
কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তবে সরকার পতনে বড় ভূমিকা রাখা ছাত্র আন্দোলনের নেতারা একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং অন্তর্বর্তী সময়ে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস থাকা দুটি দল।
এর মধ্যে সবচেয়ে নজর কাড়ছে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে জামায়াত দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। (ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে; সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের এটিও একটি কারণ।) বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম; দীর্ঘদিনের কুশাসনের পর রাজনীতিতে ধর্মীয় মূল্যবোধের ধারণাটি অনেকের কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান বলেন, ‘ইসলামপন্থি দল হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতের নতুন সমর্থনের বড় অংশ ওই কারণে আসেনি।’
জামায়াতের দাবি, তারা সব বাংলাদেশির জন্য সংযতভাবে দেশ পরিচালনা করবে। কিন্তু শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে তাদের উত্থান আতঙ্ক তৈরি করেছে। তারা লক্ষ্য করছেন, দলটি একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। নারীদের কর্মঘণ্টা সীমিত করা হবে—এমন বক্তব্য থেকেও পুরোপুরি সরে আসতে পারেনি জামায়াত। সংসদে আগে কখনো ১৮টির বেশি আসন না পাওয়া দলটি দেশ চালানোর মতো অভিজ্ঞ কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে। তাদের কিছু নীতি শুনতে ব্যয়বহুল ও অপরিপক্ব মনে হয়।
এই পরিস্থিতিই তারেক রহমানের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। জরিপে তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এগিয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার সদ্যপ্রয়াত মা খালেদা জিয়া; তারও আগে ছিলেন বাবা জিয়াউর রহমান—যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় আসে, যদিও তাদের শাসনকালও ছিল বিতর্কিত। ২০০৬ সালের নির্বাচন ঘিরে কারচুপির অভিযোগ ওঠার পর সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করেছিল।
তারেক রহমান তার মায়ের সরকারে আনুষ্ঠানিক কোনো পদে না থাকলেও অধিকাংশ বাংলাদেশির চোখে তিনিই ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। ফাঁস হওয়া ২০০৮-২০০৯ সালের মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তায় দাবি করা হয়, তারেক রহমান ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একজন হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন’ এবং ‘ঘন ঘন ও প্রকাশ্যে ঘুস দাবি করার জন্য কুখ্যাত ছিলেন।’ শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে বিরোধীদের দমন শুরু করলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। তার আগেই অবশ্য তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান এবং লন্ডনে ১৭ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসনে কাটান। গত ডিসেম্বরেই তিনি দেশে ফেরেন।
প্রচারণা বাসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান তার দলের শাসনামলের পক্ষে সাফাই দেন। তার দাবি, শেষবার ক্ষমতায় থাকাকালে তার দল দুর্নীতি দমনের উদ্যোগ নিয়েছিল। অতীতের অভিযোগগুলো তিনি অস্বীকার করে বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে আনা মামলাগুলো ছিল সাজানো। বিপ্লবের পর বাংলাদেশের স্বাধীন আদালত তার বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল করেছে, যা দেশে ফেরার পথ সুগম করেছে।
কার হাতে ভবিষ্যৎ?
তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। তরুণ বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশে ভালো বেতনের কাজ পেতে সহায়ক প্রশিক্ষণের কথাও বলেছেন। পানিসংকট সমাধানে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং প্রতিবছর পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ভালো হবে বলেও মনে করেন তারেক রহমান। তার কথায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ‘খুবই বাস্তববাদী, একজন ব্যবসায়ী’।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তারেক রহমান বলেন, তার সরকার বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, শৃঙ্খলা বজায় রাখবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হবে। ২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না বলে আশ্বস্ত করেছেন তারেক রহমান। তার কথায, বিপ্লব প্রমাণ করেছে—যেসব সরকারের ‘মানুষের জন্য কোনো কর্মসূচি নেই’, তাদের পরিণতি কী হতে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ হওয়া কারও জন্যই ভালো নয়।’
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা এবং অধিকাংশ উদারপন্থি তারেক রহমানকে সমর্থন দিচ্ছেন। তারা যা শুনতে চান, দেশে ফেরার পর তেমন কথাই বলেছেন তারেক রহমান। পর্যবেক্ষকদের মতে, লন্ডন থেকে ফেরা মানুষটি আগের তারেক রহমানের চেয়ে আলাদা বলেই মনে হচ্ছে।
তবে, বিকল্পগুলো খুব একটা আকর্ষণীয় নয় বলে মন্তব্য করেছেন এক বাস্তববাদী স্থানীয় বিশ্লেষক। তার মতে, সামনে বাংলাদেশ হয় একটি অগ্রগামী সরকার পাবে, নয়তো ‘হালকা তালেবান’ ধরনের একটি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকবে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/
সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক
- ১ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ভিয়েতনাম
- ২ বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর নির্বাচন, কার হাতে ভবিষ্যৎ?
- ৩ বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের গ্রন্থাগার ও তথ্যকেন্দ্র ঢেলে সাজানো হয়েছে
- ৪ খুলেছে রাফাহ ক্রসিং, মিশরে প্রবেশ করছেন ফিলিস্তিনিরা
- ৫ ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষা করেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হবে