আল-জাজিরার প্রতিবেদন
জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান: যার সঙ্গে সবাই দেখা করতে চায়
জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান/ ছবি: ফেসবুক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গত বুধবার সন্ধ্যায় একটি উচ্চাভিলাষী নির্বাচনি ইশতেহার উন্মোচন করেন। এর একটি মূল অঙ্গীকার হলো—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তার দল ক্ষমতায় এলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) চারগুণ বাড়িয়ে দুই লাখ কোটি (দুই ট্রিলিয়ন) ডলারে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি করা হবে।
রাজনীতিক ও কূটনীতিকদের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ৬৭ বছর বয়সী শফিকুর রহমান প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, উৎপাদনশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি, তিনি বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা এবং সরকারি ব্যয় বাড়ানোর কথাও বলেন।
ঢাকার অর্থনীতিবিদরা অবশ্য এত বড় প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ইশতেহারটি স্লোগানে ভরপুর হলেও বিস্তারিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের নেতৃত্বের কাছে এই ইশতেহারের মূল উদ্দেশ্য হিসাবনিকাশ নয়, বরং রাজনৈতিক অভিপ্রায় স্পষ্ট করা।
সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থি দল জামায়াতকে এমন একটি দল হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, যারা ধর্মীয় মতাদর্শে অতিমাত্রায় চালিত হওয়ায় তরুণ, বৈচিত্র্যময় ও ভবিষ্যৎমুখী জনগোষ্ঠীকে শাসন করার সক্ষমতা রাখে না। কিন্তু ইশতেহারটি সেই ধারণার বিপরীতে গিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলকে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং দেখাতে চাইছে, ধর্মীয় ভিত্তি ও আধুনিক ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে জামায়াত কোনো বিরোধ দেখে না।
এক্ষেত্রে শ্রোতাদের উপস্থিতিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর নির্বাচন, কার হাতে ভবিষ্যৎ?
তারেক রহমানকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদন
আল-জাজিরার প্রতিবেদন/ ড. ইউনূসকে কীভাবে মনে রাখবে বাংলাদেশ?
কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী অভিজাত শ্রেণি ও বিদেশি কূটনীতিকরা জামায়াত থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন বা নীরবে যোগাযোগ করতেন। এখন তারা তা প্রকাশ্যেই করছেন।
গত কয়েক মাসে ইউরোপীয়, পশ্চিমা এমনকি ভারতীয় কূটনীতিকরাও শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছেন, যিনি অল্প সময় আগেও আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেকের কাছে প্রায় রাজনৈতিকভাবে ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
তার দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে দুবার নিষিদ্ধ হয়েছিল, এর মধ্যে একবার ছিল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে। সেই দলটির নেতার জন্যই আসন্ন নির্বাচন এমন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে, যা এক বছর আগেও খুব কম মানুষ কল্পনা করতে পারতো। প্রশ্নটি হলো: শফিকুর রহমান কি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন?

‘মানুষের জন্য লড়বো’
জামায়াত ও এর নেতাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে এই পরিবর্তনের পেছনে অন্তত আংশিকভাবে দায়ী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৃষ্টি হওয়া শূন্যতা।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান শুধু শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটায়নি, বরং দেশের রাজনৈতিক কাঠামোও উল্টে দিয়েছে। এতে ভেঙে পড়েছে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দ্বৈত আধিপত্য, যা কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে।
আওয়ামী লীগ কার্যত রাজনীতির মাঠের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং বিএনপি একমাত্র বড় দল হিসেবে টিকে থাকায় একটি শূন্যতা তৈরি হয়। শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন, ছাত্রনেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সেই জায়গা দখল করবে। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থায় থাকা জামায়াতই সেই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসে।
ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে এগোতে থাকা বাংলাদেশে এখন জামায়াত দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির একটি। নির্বাচন-পূর্ব কিছু জরিপে দলটিকে সরাসরি বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দেখানো হচ্ছে।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছেন শফিকুর রহমান, বলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দীর্ঘদিনের সহযোগী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
সিলেট অঞ্চলে জামায়াতের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় শফিকুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে জুবায়েরের। তিনি জানান, এই পুনরুত্থান এসেছে দীর্ঘদিনের তৃণমূল সামাজিক কাজ এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও রাজনৈতিক টিকে থাকার ফল হিসেবে।
আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশের নির্বাচন কী প্রভাব ফেলবে ভারত-নেপালে?
জেন জির হাতে স্বৈরাচার পতন: নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে পুরোনো শক্তিরাই
জনগণ স্বাগত জানালে যে কারও রাজনীতি করার অধিকার আছে: তারেক রহমান
মৃদুভাষী সাবেক সরকারি চিকিৎসক শফিকুর রহমান ২০১৯ সালে যখন জামায়াতের আমির হন, তখন দলটি শেখ হাসিনার সরকারের সিদ্ধান্তে নিষিদ্ধ ছিল। ২০২২ সালের ডিসেম্বর গভীর রাতে তাকে ‘উগ্রবাদে সহায়তার’ অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় ১৫ মাস পর জামিনে মুক্তি পান তিনি।
২০২৫ সালের মার্চে শেখ হাসিনার পতন ও নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পর মামলার আসামির তালিকা থেকে শফিকুর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়।
এরপর থেকে তার জনসমাবেশগুলো ব্যাপক মনোযোগ কাড়ে। গত জুলাইয়ে ঢাকায় এক বিশাল সমাবেশে প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে মঞ্চে দু’বার লুটিয়ে পড়লেও চিকিৎসকদের পরামর্শ অমান্য করে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
‘আল্লাহ যতদিন আমাকে জীবন দেবেন, ততদিন আমি মানুষের জন্য লড়বো,’ তিনি বলেছিলেন। ‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে আমরা মালিক নই, সেবক হবো। কোনো মন্ত্রী প্লট নেবে না, করমুক্ত গাড়ি নেবে না। চাঁদাবাজি হবে না, দুর্নীতি হবে না। তরুণদের আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি।’

জামায়াতের ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ার চেষ্টা
সমর্থকদের ভাষায়, শফিকুর রহমান একজন সহজপ্রাপ্য ও নৈতিকভাবে দৃঢ় নেতা, যিনি ড্রয়িংরুমের চেয়ে দুর্যোগকবলিত এলাকায় থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
টানা তৃতীয় মেয়াদে দলের প্রধান হিসেবে তিনি দলের ভেতরে দৃঢ় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।
‘তিনি একজন ভালো ও ধার্মিক মানুষ। দলে সবাই তাকে বিশ্বাস করে,’ বলেন ঢাকার জামায়াত সমর্থক লোকমান হোসেন। তার মতে, গত দেড় বছরে দলটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে, আর এতে জামায়াতের প্রচলিত সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে শফিকুর রহমানের গ্রহণযোগ্যতা বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে শফিকুর রহমানের চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল নির্বাচনী নয়—এটি ভাবমূর্তিগত।
নতুন সমর্থকেরা জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে থাকায় তিনি দলটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চাইছেন: ধর্মীয় মতাদর্শ ও ইতিহাসে আবদ্ধ একটি ইসলামী শক্তি হিসেবে নয়, বরং সুশাসন, শৃঙ্খলা ও পরিবর্তনের বাহন হিসেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পুনর্গঠন বাস্তব নাকি কেবল বাহ্যিক—সেটিই নির্ধারণ করবে শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব ও জামায়াতের ভবিষ্যৎ।
তবে জামায়াতের ভাবমূর্তি পাল্টানোর যেকোনো প্রচেষ্টাই গিয়ে ঠেকে ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত উত্তরাধিকারে। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করেছে।
শফিকুর রহমান এই ইতিহাসের প্রশ্নে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বিস্তারিত স্বীকারোক্তি এড়িয়ে গেলেও সম্প্রতি জামায়াতের ‘অতীতের ভুল’-এর কথা স্বীকার করেছেন এবং দল যদি ক্ষতি করে থাকে, তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
এই কথাগুলো সরাসরি অস্বীকার থেকে এক ধরনের সূক্ষ্ম সরে আসার ইঙ্গিত দেয়, যদিও নির্দিষ্ট কোনো কাজ বা দায় স্বীকার পর্যন্ত যায় না। সমর্থকদের মতে, এটি এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা—দলকে তার অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। তবে সমালোচকদের মতে, এই অস্পষ্টতা ইচ্ছাকৃত; এতে অতীতের মূল দায়ের মুখোমুখি না হয়েই জামায়াতের ভাবমূর্তি নরম করা হয়।
‘তিনি জানেন সেই ভুলগুলো কী ছিল। কিন্তু সেগুলো স্পষ্ট করে বললে দলের ভেতরে তার নেতৃত্ব অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে,’ বলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালেহ উদ্দিন আহমেদ।
তবু তার মতে, আগের জামায়াত নেতাদের তুলনায় শফিকুর রহমান বেশি মধ্যপন্থিথী। তিনি অমীমাংসিত ঐতিহাসিক প্রশ্ন নিয়ে কথা বলার এবং নারীর অধিকারসহ আগে এড়িয়ে যাওয়া বিষয়গুলো আলোচনায় আনার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে আগ্রহী। ‘বর্ধিত জনমনোযোগ ও গণমাধ্যমের নজরদারির কারণেও এই খোলামেলা ভাব এসেছে,’ বলেন তিনি। ‘মানুষ এখন প্রশ্ন করছে, আর জামায়াতকে তার জবাব দিতে হচ্ছে।’
আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশের নির্বাচনে যুক্তরাজ্য প্রবাসী ভোটাররা কতটা প্রভাব ফেলবেন?
বাংলাদেশের নির্বাচনই বদলে দিতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির সমীকরণ
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন/ নতুন বাংলাদেশ গঠনে বহু পথ বাকি, তবে অর্জনও কম নয়
প্রচলিত সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে ভোটারদের কাছে পৌঁছানো এবং বিদেশি মহলকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা—এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করতে গিয়ে জামায়াত এক ধরনের স্থায়ী টানাপোড়েনে পড়েছে, যার ফল হিসেবে প্রায়ই দ্বৈত বার্তা দেখা যাচ্ছে।
এই ভারসাম্যের চেষ্টা শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেও স্পষ্ট। শফিকুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদুল্লাহ মো. তাহের আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জামায়াত একটি মধ্যপন্থি দল। তারা ইসলামী আইন চাপিয়ে দেবে না বা কঠোরভাবে তা অনুসরণ করবে না।
এছাড়া, দলটি তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে।
তবে রক্ষণশীল সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় জামায়াত এখনো তার ইসলামী পরিচয়কে জোরালোভাবে তুলে ধরে। এমনকি কিছু সমর্থক ধর্মীয় সওয়াবের অংশ হিসেবে জামায়াতকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। এটিকে ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার হিসেবে তীব্র সমালোচনা করেছে বিএনপি।
এই কৌশল একদিকে জামায়াতকে আবার এমন রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে, যেগুলো একসময় তাদের জন্য বন্ধ ছিল। অন্যদিকে, বৃহত্তর ভোটারগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করতে গিয়ে দলটির অতীত ও মতাদর্শ নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে শফিকুর রহমান কতটা এগোতে পারবেন—সে প্রশ্নও তীব্র হয়েছে।
এই সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে স্পষ্ট জামায়াতের নারী ও নেতৃত্ব বিষয়ে অবস্থানে। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেন, দলের শীর্ষ পদে নারীর নেতৃত্ব সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্য জামায়াতের অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তির দাবিকে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
‘আল্লাহ সবাইকে আলাদা প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন,’ তিনি বলেন। ‘একজন পুরুষ সন্তান জন্ম দিতে পারে না বা স্তন্যদান করতে পারে না। এসব শারীরিক সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করা যায় না।’
সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্যই জামায়াতের ‘মধ্যপন্থা’র দাবির সীমা স্পষ্ট করে দেয়।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটারিয়ান অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের সংযুক্ত গবেষক ও ‘ন্যারেটিভস অব বাংলাদেশ’ বইয়ের লেখক মুবাশ্বার হাসানও জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, প্রকাশ্যে এসব মত সমর্থন করা নারী নেতারাও পুরুষ-প্রধান কাঠামোর ভেতরেই কাজ করেন। তিনি দলটির বিপুলসংখ্যক নারী সমর্থক ও সদস্যের কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ফোরাম মজলিসে শূরার নারী সদস্যরাও রয়েছেন। ‘এটি এমন একটি কাঠামোর প্রতিফলন, যেখানে নারীরা পুরুষদের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করেন,’ বলেন তিনি।
এই সমালোচনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যে আন্দোলন জামায়াতের জন্য রাজনৈতিক পরিসর আবার উন্মুক্ত করেছে, সেখানে নারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে নারীরা ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিলেন, অনেক সময় আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন তারা। ‘নারীরা এই আন্দোলনের অংশ ছিলেন পুরুষদের মতোই, বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি,’ বলেন মুবাশ্বার হাসান। ‘এখন তাদের অবমূল্যায়ন করা জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে সমস্যাযুক্ত করে তোলে।’
রাজনৈতিক ইতিহাসবিদদের মতে, এটি কোনো নতুন দ্বন্দ্ব নয়, বরং দীর্ঘদিনের। ১৯৮৬ সালে নিজস্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর থেকে জামায়াত কখনোই সাধারণ সংসদীয় আসনে নারী প্রার্থী দেয়নি; বরং সংরক্ষিত কোটার ওপর নির্ভর করেছে।
‘এটি সাময়িক অবস্থান বা কৌশলগত ভুল নয়,’ বলেন রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ। ‘এটি দলের আদর্শিক কাঠামোর প্রতিফলন, আর সেই কাঠামো মৌলিকভাবে বদলায়নি।’

জনপ্রিয়তা বাড়ানো ‘দাদু’
তবু সমর্থকদের, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রশ্ন প্রায়ই আদর্শের চেয়ে শফিকুর রহমানের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যের ছাঁকনিতে দেখা হয়।
সাম্প্রতিক দেশব্যাপী প্রচারণায় তরুণদের অনেককেই তাকে ‘দাদু’ বলে ডাকতে শোনা যায়। শুভ্রদাড়ি, নরম ভাষা ও সমর্থকদের প্রতি মনোযোগী আচরণে এই নামের সঙ্গে তার ভাবমূর্তি মিলে যায়।
‘তিনি তার কথার মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেন,’ বলেন চট্টগ্রামের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও জামায়াত সমর্থক আবদুল্লাহ আল মারুফ। ‘সাম্প্রতিক সময়ে তার কাজকর্মে দাদা ও নাতি-নাতনির সম্পর্কের মতো একটা অনুভূতি আছে। বিএনপি নেতারা যেখানে অনেক সময় তরুণদের ছোট করে দেখেন, সেখানে শফিকুর রহমান সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন।’
মারুফের মতে, শফিুকুর রহমানের গ্রহণযোগ্যতা জামায়াতের প্রচলিত সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরেও বিস্তৃত। ‘তিনি আগের যেকোনো জামায়াত নেতার চেয়ে বেশি জনপ্রিয়,’ বলেন মারুফ।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জুবায়ের বলেন, হিন্দু প্রার্থী মনোনয়নের মতো সিদ্ধান্তগুলো কৌশলগত নয়; বরং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের চেয়ে দলের গঠনতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, ধর্ম নির্বিশেষে যে কোনো বাংলাদেশি আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির সঙ্গে একমত হলে দলের সদস্য হতে পারেন,’ বলেন তিনি। ‘রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য আমাদের ধর্মীয় মতবাদ সমর্থন করা বাধ্যতামূলক নয়।’
জামায়াত নেতাদের মতে, এসব পদক্ষেপ দলটির জনসমক্ষে ভাবমূর্তি বদলের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ—ধর্মতত্ত্বকেন্দ্রিক দল থেকে সুশাসন ও জবাবদিহিকেন্দ্রিক দলে রূপান্তরের চেষ্টা। ‘আমরা দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি, শৃঙ্খলা ও জনসেবাকে গুরুত্ব দিচ্ছি,’ বলেন জুবায়ের। ‘মানুষ দেখেছে, বন্যার সময়, কোভিডের সময়, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে আমাদের নেতারা তাদের পাশে ছিলেন। এ কারণেই সমর্থন বাড়ছে।’
খুলনা শহরে জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীও এতে একমত। আল-জাজিরায় লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘যখন পরিবারগুলো দারিদ্র্যে পড়ে, জামায়াত-সংযুক্ত কল্যাণ নেটওয়ার্কগুলো ধর্ম বা রাজনৈতিক আনুগত্য না দেখে সহায়তায় এগিয়ে আসে। এই সেবামূলক সংস্কৃতিই অনেক নাগরিককে জামায়াতকে স্লোগানের দল নয়, বরং শৃঙ্খলা, কাঠামো ও দায়িত্ববোধের দল হিসেবে দেখতে সাহায্য করেছে।’
বাড়ছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
জামায়াতের এই যোগাযোগ কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। জুবায়ের জানান, শফিকুর রহমান অসুস্থ হলে ঢাকার ভারতীয় কূটনীতিকেরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। এছাড়া, গত মাসে ভারতীয় হাইকমিশনে ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের সংবর্ধনায় জামায়াত নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা নজিরবিহীন।
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপীয় ও পশ্চিমা কূটনীতিকেরাও রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ওয়াশিংটনেও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ প্রকাশিত ফাঁস হওয়া অডিওতে এক মার্কিন কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধু হতে চায়’।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়তে থাকা এবং বিএনপির পাশাপাশি একটি শক্তিশালী নির্বাচনী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপটে অনেক সাধারণ সমর্থকই শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে আশাবাদী।
‘তিনি একজন দেশপ্রেমিক,’ বলেন রহমানের ঢাকার আসনের ভোটার আবুল কালাম। ‘প্রধানমন্ত্রী হোন বা বিরোধী নেতা—তিনি আমাদের ভালোভাবেই নেতৃত্ব দেবেন।’
দলের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফল যাই হোক, জামায়াতের ভেতরে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে শফিকুর রহমানের অবস্থান আপাতত দৃঢ়।
‘শফিকুর রহমান একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক এবং প্রায়ই শিরোনামে থাকেন,’ বলেন রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদ। ‘তার রাজনৈতিক চিন্তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, কিন্তু দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ যে শক্ত, তা পরিষ্কার।’
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/