বাংলাদেশের নির্বাচনে যুক্তরাজ্য প্রবাসী ভোটাররা কতটা প্রভাব ফেলবেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২১ পিএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত বাংলাদেশি ভোটার মাত্র ৩২ হাজারের কিছু বেশি/ ছবি: সোশ্যাল মিডিয়া

দুপুর বেলা লন্ডনের ইস্ট এন্ডের হোয়াইটচ্যাপেল রোডে ক্যাসাব্লাংকা ক্যাফের ভেতরে বেশ ভিড়। কাউন্টারের পেছনে রুপালি ট্রেতে রাখা সিঙ্গারা, বিরিয়ানি আর হ্যাশ ব্রাউন। কাচের জানালার বাইরে গাড়ির শব্দ, ভেতরে চাপা কথাবার্তা। এই ব্যস্ততার মাঝেই ঘুরেফিরে উঠে আসছে একটি প্রসঙ্গ—বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন।

ক্যাফের একটি টেবিলে বসে আদা-মধু চা হাতে খালেদ নূর বলছিলেন, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই এ নিয়ে আলোচনা থামছে না। ব্যারিস্টার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নূরের কথায়, ‘নির্বাচনের কথা ঘোষণা হওয়ার পর মানুষ এটা নিয়েই কথা বলছে।’

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভোট

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ভোট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। প্রায় দুই দশক পর এটি এমন একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যেতে পারে। এর আগে বছরের পর বছর নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, বিরোধীদের বর্জন আর দমন-পীড়নের অভিযোগে দেশে বহু ভোটার যেমন হতাশ হয়ে ঘরে বসে ছিলেন, তেমনি বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরাও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বে আবর্তিত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সময়ে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও কর্তৃত্ববাদ ও দমন-পীড়নের অভিযোগ বেড়েছে।

আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর নির্বাচন, কার হাতে ভবিষ্যৎ?
তারেক রহমানকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদন

আল-জাজিরার প্রতিবেদন/ ড. ইউনূসকে কীভাবে মনে রাখবে বাংলাদেশ?

দীর্ঘ সময় কোণঠাসা থাকা বিএনপি এখন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আবার সক্রিয় হতে চাইছে। সমর্থকদের কাছে তিনি একদলীয় প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক; সমালোচকদের কাছে তিনি অতীতের দণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত। ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটি প্রথম নির্বাচন, ফলে প্রতিযোগিতাটির আবেগী ও প্রতীকী গুরুত্বও বেড়েছে।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনা অপসারিত হওয়ার পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নির্বাচনি রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করেছে।

এই অস্থিরতার মধ্যেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার পেয়েছেন। নূর বলেন, ‘বছরের পর বছর আমরা এই মুহূর্তের জন্য আন্দোলন করেছি। মানুষ স্বীকৃতি চেয়েছে।’

তবে ক্যাফের পাশের টেবিলগুলোতে কয়েকজন কথা বলতে রাজি হননি। সাবেক স্থানীয় কাউন্সিলর নূর জানান, যুক্তরাজ্যে থাকা কিছু বাংলাদেশি নাগরিক, যারা কারিগরি দিক থেকে ভোটার হলেও অভিবাসন অবস্থান নিরাপদ নয়, তারা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক।

তিনি বলেন, ‘তারা নির্বাচন খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন, কিন্তু নিজের দিকে দৃষ্টি টানতে চান না।’

যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি সম্প্রদায়

দশকের পর দশক ধরে প্রবাসীরা দেশে বিপুল অংকের রেমিট্যান্স পাঠালেও জাতীয় নির্বাচনে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা ছিল না। আন্দোলনকারীরা বলতেন, প্রবাসীদের বাদ দেওয়া অগণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক সহিংসতা বা দমন-পীড়নের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

দীর্ঘ চাপের পর নির্বাচন কর্তৃপক্ষ প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন সম্প্রসারণ করে। তাদের হিসাবে, বিশ্বজুড়ে ৭০ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি নিবন্ধিত হয়েছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় পাঁচ শতাংশ। মোট প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা আনুমানিক দেড় কোটি।

তবে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত ভোটার মাত্র ৩২ হাজারের কিছু বেশি, যা বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মোট আকারের তুলনায় খুবই কম। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার। সবচেয়ে বেশি থাকেন ইস্ট লন্ডনে; শুধু টাওয়ার হ্যামলেটসেই বাসিন্দাদের প্রায় ৩৫ শতাংশ বাংলাদেশি।

এই ফারাক দেখিয়ে দেয়—সাংস্কৃতিক পরিচয় আর নাগরিকত্ব বা ভোটার হওয়ার যোগ্যতা এক নয়। তাই বাংলাদেশে কী হচ্ছে, তার প্রভাব ইস্ট লন্ডনের দৈনন্দিন জীবনে পড়লেও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না।

আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশের নির্বাচন কী প্রভাব ফেলবে ভারত-নেপালে?
জেন জির হাতে স্বৈরাচার পতন: নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে পুরোনো শক্তিরাই
জনগণ স্বাগত জানালে যে কারও রাজনীতি করার অধিকার আছে: তারেক রহমান
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন/ নতুন বাংলাদেশ গঠনে বহু পথ বাকি, তবে অর্জনও কম নয়

তবু বিশ্লেষকদের মতে, হাড্ডাহাড্ডি আসনে প্রবাসী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। কিছু আসনে নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই প্রবাসী, যারা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

কিন্তু বাস্তবে ভোট দিতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বাধ্যতামূলক। যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া বা বড় হওয়া অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশির কাছে এই নথি নেই, ফলে তারা বাদ পড়ছেন।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর অনাগ্রহ

হোয়াইটচ্যাপেল রোড মার্কেটে সকালে দুই তরুণী রঙিন পোশাক দেখছিলেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে তারা কাঁধ ঝাঁকালেন। একজন বললেন, ‘এটা আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে না। আমরা তো এখানে থাকি।’ তার কাছে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নূর বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই অনাগ্রহ স্বাভাবিক। বছরের পর বছর বিতর্কিত নির্বাচনে আশাবাদ থাকলেও বাস্তব বাধা অংশগ্রহণ কমিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ভোট দিতে এনআইডি, বায়োমেট্রিক, এরপর মোবাইল অ্যাপে আরেকটি ডিজিটাল প্রক্রিয়া—অনেকের জন্য, বিশেষ করে বয়স্কদের কাছে, এটা খুব জটিল।’

উপসাগরীয় দেশগুলোতে চিত্র ভিন্ন। সৌদি আরবে নিবন্ধিত ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি, কাতারে প্রায় ৭৬ হাজার। নূরের মতে, সেখানে প্রবাসীরা অনেকেই একা থাকেন, পরিবার দেশে—তাই দেশের সঙ্গে যোগসূত্র বেশি।

টাওয়ার হ্যামলেটসের অফিসে বসে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারীদের দৈনন্দিন উদ্বেগ এখানকার জীবন ঘিরেই।

এখানে পুরোনো প্রজন্মের দেশমুখী আগ্রহ আর নতুন প্রজন্মের যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক বাস্তবতার যে বিভাজন, ইস্ট লন্ডনের কথোপকথনে সেগুলো বারবার ফিরে আসে।

বাংলা সংলাপ নামের দ্বিভাষিক সাপ্তাহিকের ছোট অফিসে সম্পাদক মোশাহিদ আলী পাঠকদের ভোট নিয়ে তর্ক, গুজব সংশোধন, নিবন্ধনের তথ্য নিয়ে নানা বার্তা দেখছিলেন। তিনি বলেন, ‘ভোটাধিকার পেয়ে মানুষ উচ্ছ্বসিত। কিন্তু প্রক্রিয়াটা স্পষ্ট বা সহজ ছিল না।’

অনেকে অভিযোগ করেছেন, প্রচার ছিল সীমিত। হাইকমিশনে বায়োমেট্রিকের দীর্ঘ লাইন, তারপর অ্যাপে আবেদন—এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আগ্রহ কমিয়েছে।

কেউ কেউ পোস্টাল ভোটের খবর দেরিতে জেনেছেন। কেউ এনআইডির আবেদন করেও সময়মতো পাননি।

৪৪ বছর বয়সী কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক মিজানুর খান বলেন, তিনি ভোট দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। এখন দেশে গিয়ে ভোট দেওয়ার কথাও ভাবছেন।

তিনি বলেন, ‘সচেতনতা কম ছিল। তবে সবচেয়ে জরুরি—অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সেটা হলে বাংলাদেশের সুযোগ আছে।’

এ বিষয়ে লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলে তারা সাড়া দেয়নি।

আবার সবাই ভোট দিতে চাননি। হোয়াইটচ্যাপেল মার্কেটের এক দোকানে ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রাদওয়ান আহমেদ বলেন, এনআইডি থাকলেও তিনি ভোট বর্জন করছেন। তার মতে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় নির্বাচন বৈধতা হারিয়েছে।

নির্বাচনে এবারই প্রথম জামায়াতে ইসলামীকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ছাত্রদের গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট বেধেছে তারা।

যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে উভয় পক্ষের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতি। লন্ডনে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকা তারেক রহমানকে ঘিরে মতভেদ স্পষ্ট। অনেকের মতে, তার যুক্তরাজ্যে থাকা মানেই কমিউনিটির সঙ্গে সংযোগ—তা হয়নি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ব্রিটিশ রাজনীতিকদের উপস্থিতিও বিতর্ক তৈরি করেছে। তাদের মধ্যে লেবার এমপি টিউলিপ সিদ্দিক রয়েছেন, যাকে বাংলাদেশে অনুপস্থিতিতে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচিত হলেও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে।

এই জটিলতার মধ্যেও অধিকাংশ মানুষের কাছে চাকরি, পরিবার, নিরাপত্তা—এসবই বড়।

মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ক্যানারি ওয়ার্ফের কাচে মোড়া ভবনের কাছে আইল অব ডগস বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড কালচারাল সেন্টারে চা আর বিস্কুটের আড্ডায়ও আলোচনায় উঠে আসে নির্বাচন প্রসঙ্গ।

জরুরি সেবায় কর্মরত মুহাম্মদ সাইফুল মিয়া জানান, এনআইডি না থাকায় ভোট দিতে পারেননি। তবু বলেন, ‘আমার পরিবার সেখানেই—তাই বিষয়টা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’

কুমিল্লার জাহানারা বেগম ভোট দিতে পেরে আনন্দিত। বলেন, ‘অনেক দিন পর মনে হচ্ছে—এটার সত্যিই গুরুত্ব আছে।’

তার বন্ধুও একই আশার কথা বলেন। কিন্তু পরের প্রজন্মের নরগিস আখতার সন্দিহান। তার প্রশ্ন, ‘নির্বাচনই কি সব বদলাবে?’ তিনি বলেন, ‘কল্যাণব্যবস্থা নেই, কর্মসংস্থানের সুরক্ষা নেই। সুরক্ষা ছাড়া চাকরির কথার মানে কী?’

এই প্রশ্নই যেন ইস্ট লন্ডনের বাতাসে ভাসছে—ভোটাধিকার মিললেও আস্থা ফিরবে কি না, সেটাই বড় অনিশ্চয়তা।

সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।