‘দ্য গ্রেট গেম’: যখন থেকে পরাশক্তিদের ‘ছায়াযুদ্ধে’র ময়দান মধ্যপ্রাচ্য
এআই
ঊনবিংশ শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে যে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় তা বুঝাতে ‘দ্য গ্রেট গেম’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়।
১৮৩০ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকার মধ্য এশিয়ার অভিমুখে রাশিয়ার বিস্তার নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ১৮৩৮ সালে প্রথম ব্রিটিশ-আফগান যুদ্ধের মাধ্যমে এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার আনুষ্ঠানিক উত্তেজনা শুরু হয়।
এর পর (১৮৫০ - ১৮৯০) এই সময়ে রাশিয়া তাসখন্দ, সমরকন্দ এবং খিভা জয় করে আফগানিস্তানের সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়। অন্যদিকে ব্রিটিশরা আফগানিস্তানকে একটি ‘বাফার স্টেট’ বা মধ্যবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়ে যায়।
১৯০৭ সালের অ্যাংলো-রাশিয়ান কনভেনশন স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই ধ্রুপদী গ্রেট গেমের সমাপ্তি ঘটে। এই চুক্তিতে পারস্য (ইরান), আফগানিস্তান এবং তিব্বত নিয়ে দুই পরাশক্তি একটি সমঝোতায় পৌঁছায়।
গ্রেট গেমের ময়দান মধ্যপ্রাচ্য:
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরাশক্তিগুলোর নাম পরিবর্তন হলেও খেলার মাঠ একই ছিল। এর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল আফগানিস্তান, তৎকালীন পারস্য যা বর্তমান ইরান এবং তিব্বত।
যুদ্ধের ধরণ (প্রক্সি ওয়ার)মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে রাশিয়া এবং অন্য পরাশক্তিগুলো কখনোই সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি বরং ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে গেছে।
যুদ্ধের ধরণ(ছায়াযুদ্ধ)
ছায়া যুদ্ধ বা প্রক্সি যুদ্ধ হলো এমন এক ধরনের সংঘাত, যেখানে দুটি শক্তিশালী দেশ সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না নেমে কোনো তৃতীয় পক্ষকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। এই তৃতীয় পক্ষ হতে পারে কোনো ছোট দেশ, বিদ্রোহী গোষ্ঠী, বা সশস্ত্র সংগঠন।
ষড়যন্ত্র, গুপ্তচরবৃত্তি এবং স্থানীয় শাসকদের ব্যবহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করাই এই যুদ্ধের কৌশল। ১৯০৭ সালে ‘অ্যাংলো-রাশিয়ান কনভেনশন’-এর মাধ্যমে এর সাময়িক সমাপ্তি ঘটে।
প্রক্সি যুদ্ধের স্বর্ণযুগ ছিল ১৯৪৫-১৯৯১ পর্যন্ত। উদাহরণস্বরূপ : ভিয়েতনাম যুদ্ধ (যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত সমর্থিত উত্তর ভিয়েতনাম) এবং আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধ (সোভিয়েত বনাম মার্কিন সমর্থিত মুজাহিদিন)।
কেনো এই ছায়াযুদ্ধ?
পারমাণবিক অস্ত্র আবিষ্কারের পর বড় শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চায়। যাতে ধ্বংসযজ্ঞ নিজের দেশে না আসে তাই তারা অন্যের মাটিতে যুদ্ধ পরিচালনা করে।
মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ছায়াযুদ্ধের ময়দান। এর প্রধান কারণগুলো হলো-
ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব: এই দ্বন্দ্ব গত কয়েক দশকের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী প্রক্সি যুদ্ধ। ইরান হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়, অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রভাব রুখতে কাজ করে।
শিয়া-সুন্নি মেরূকরণ: এই বিভেদ সমীকরণের কারণে ইরান (শিয়া) এবং সৌদি আরব (সুন্নি) দীর্ঘকাল ধরে ইয়েমেন, সিরিয়া এবং লেবাননে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে আসছে।
জ্বালানি রাজনীতি: মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতেই পরাশক্তিগুলো এখানে প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
বর্তমান সংঘাতটি এখন আর কেবল প্রক্সির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েলি এবং ইরানি যুদ্ধবিমানের সরাসরি আকাশ সীমায় যুদ্ধ এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর এই প্রক্সি যুদ্ধকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নিউ গ্রেট গেম (প্রেক্ষাপট-২০২৬)
১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ (তেল ও গ্যাস) এবং ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে, তাকে অনেক ইতিহাসবিদ ‘নিউ গ্রেট গেম’ বলেন।
বর্তমানে অনেকে মনে করেন একটি ‘নিউ গ্রেট গেম’ শুরু হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় হিসেবে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া। এখনকার লড়াই শুধু ভূখণ্ড নয়, বরং খনিজ সম্পদ, জ্বালানি এবং প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।
সূত্র: বিবিসি,আল-জাজিরা,দ্য গার্ডিয়ান,উইকিপিডিয়া
কেএম