পশ্চিমবঙ্গে প্রার্থীদের চমকে জমে উঠেছে ভোট উৎসব
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের ময়দানে এখন আর শুধু বক্তৃতা দিলেই হচ্ছে না- ‘ট্যালেন্ট’ও দেখাতেই হবে। আর তাই কেউ ভাজাপোড়ার দোকানে ঢুকে ক্যামেরার সামনে চপ ভাজছেন, কেউ আবার সাধারণ লোকজনের গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ হঠাৎ ক্রিকেটার সেজে ব্যাট হাতে নেমে পড়ছেন পাড়ার মাঠে। ব্যাটে বল লাগুক আর না লাগুক, ক্যামেরার যেনো ফ্রেম ঠিকঠাক থাকে।
চমক এখানেই শেষ নয়। কেউ আবার আস্ত মাছ হাতে ঝুলিয়ে প্রচারণা সাড়ছেন। বুঝিয়ে দিচ্ছেন-আমিষ খাবার বিষয়ে বাংলায় টেনশন নেই, তাই নির্বিঘ্নে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-কে ভোট দিন!
বীরভূমের দুবরাজপুর আসনে তৃণমূল প্রার্থী নরেশ চন্দ্র বাউরী। তার ‘হাঁড়ি ভাঙা’ খেলা এখন ভাইরাল! চোখ বেঁধে হাঁড়ি ভাঙতে গিয়ে বারবার মিস- যা দেখে দর্শকদের হাসি থামেই না। তবে প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস টনটনে, ‘হাঁড়ি না ভাঙুক, ভোটে কিন্তু বিজেপির হাঁড়ি ভাঙবই’।
অন্যদিকে ওই একই আসনে বিজেপি প্রার্থী অনুপ কুমার সাহা সোজা পথেঘাটে মানুষের দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন! এক বৃদ্ধকে দাড়ি কামাতে দেখে নিজেই রেজার তুলে নিয়ে কাজে নেমে পড়েন। বিজেপি প্রার্থীর দাবি, সকালবেলায় প্রচারে বের হয়েছি, আমাকে সময় দেবে মানুষের হাতে অত সময় কই? সকলেই ব্যস্ত। তাই তাদের কাজের মধ্যেই নিজেদের প্রচারণা করে নিতে হচ্ছে। তবে পাশে থাকা বিরোধীদের দাবি, ভোটের ফল কী হবে তা তিনি জানেন। ফলে সেলুন খোলার অভ্যাসে মন দিয়েছেন।
সন্দেশখালি আসনে বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র, মাঠে ছেলেদের খেলা দেখে, ক্রিকেট খেলতে নেমে পড়েন। বল ব্যাটে লাগুক বা না লাগুক, ক্যামেরা সামনে সঠিক পোজটা দিচ্ছেন। প্রার্থীর অভিমত, বারেবারে বাংলায় বিজেপি ফসকেছে, এবার আর বল ফসকাবে না।
এদিকে সল্টলেকে বিধাননগর আসনের বিজেপি প্রার্থী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় হাতে কাতলা মাছ নিয়ে গনসংযোগে ব্যস্ত। তার বার্তা ‘বাঙালি মানেই মাছেভাতে বাঙালি’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বিজেপিকে নিয়ে মিথ্যা বলছে যে, ভারতীয় জনতা পার্টি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে নাকি মানুষের মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা বলছি, আমরা মাছ নিয়েই চলব। বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে নেই। মমতা যে বিজেপিকে নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে, তা বোঝাতেই আমার ‘মাছ প্রচার’।
অপরদিকে বীরভূমের লাভপুর আসনে বিজেপি প্রার্থী দেবাশীষ ওঝা তো একেবারে ‘মাস্টারশেফ’। অন্যের রান্নাঘরে ঢুকে রাধলেন মুরগি ভুনা। শুধু তাই নয় নিজেও খেলেন, রেঁধে খাওয়ালেন সকলকে। মজার ছলে অনেকে বলছে, ভোট না পাক, কেটারিং লাইনে প্রার্থীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ!
কম যায় না তৃণমূল কংগ্রেসও। আরামবাগ আসনে মিতা বাগ ভাজাপোড়ার দোকানে ঢুকে নিজেই চপ ভাজতে শুরু করলেন। গরম তেলেভাজা নিজেও খেলেন এবং সমর্থকদের মধ্যে বিলিয়েছেন। প্রার্থীর বার্তা, নারীরা সব পারে। ইচ্ছে হলো নিজ হাতে ভেজে খাবো। তাই আর কী!
তবে বিরাধীদের দাবি, বাংলায় এখন শিল্প বলতে একটাই। তা হলো চপ শিল্প। তাদের নেত্রীও প্রাকাশ্যে এসব করে থাকেন, প্রার্থীরাও তাই করছে! ভোট চাইতে এসে উনি কুকিং শো করছেন!
পুড়শুড়া আসনে তৃণমূল প্রার্থী পার্থ হাজারি আবার এককদম এগিয়ে, গৃহস্থের হেঁসেলে গিয়ে রুটি বেলে দিলেন। তা আবার কাঠের চুলায় সেঁকে দিলেন। নিজ হাতে সবজি কেটে তা ভেজে পরিবেশন করলেন। নিজেও খেলেন। প্রার্থীর দাবি, বিজেপি গ্যাস বন্ধ করে দিয়েছে। কাঠের চূলায় সাধারণকে রান্না করতে হচ্ছে। সেই কষ্ট ভাগ করে নিতেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
বরানগরে তৃণমূল প্রার্থী অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, গনসংযোগে ব্যাডমিন্টন খেলতে খেলতে ভোট চাইলেন। কখন উঠে পড়লেন চলন্ত সিনজিতে। প্রার্থীর আবদার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ের হাত শক্ত করতেই হবে, ভোট যেনো অনত্র না পড়ে। বর্তমানে সিনেমা না করলেও, একজন পরিচিত অভিনেত্রী। সহজে তো দেখা মেলে না! ফলে তাকে সামনে পেয়ে ভীড় জমাচ্ছে জনগন।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট এখন আর শুধু ভোট নয়-একেবারে ‘ফুল অন ফেস্টিভাল’। প্রার্থীদের এসব কাণ্ডকারখানা দেখে ভোটাররা মুখ চেপে হাসছেন। কেউ বলছেন, ভোটটা তো সিরিয়াস ব্যাপার, কিন্তু মজা করতে দোষ কী! ফল যাই হোক, এন্টারটেইনমেন্ট তো সারাবছর মেলে না। তবে প্রার্থীদের এত শত টিপ্পনি করলেও, কেউ মেজাজ হারাচ্ছে না।
ডিডি/টিটিএন