ফিলিস্তিনিদের জন্য ইসরায়েলের মৃত্যুদণ্ড আইন, বিচার নাকি বৈষম্য?
জেরুজালেমে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে উপহাস করে বানানো একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে এক যুবক/ ২০২৫ সালের ৫ জুন তোলা ছবি/ এএফপি
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রেখে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে পাস হওয়া নতুন আইন দেশটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ও আন্তর্জাতিক মহলেও নিন্দা উঠেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে যে ব্যবস্থাকে ইসরায়েলের ‘বর্ণভিত্তিক শাসন’ বলে আখ্যা দিয়ে আসছে, এই আইন সেটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আইনটি ইসরায়েলের ইহুদি নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে দেশটির কট্টর ডানপন্থিদের মধ্যে এটি নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।
ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্য- এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আইনটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিলটির ভাষা ও কাঠামো স্পষ্টভাবে বর্ণবাদী ও এটি কেবল ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করেই তৈরি করা হয়েছে।
এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, এই বিলের প্রকৃত বৈষম্যমূলক চরিত্র নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এটি গৃহীত হলে গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি ইসরায়েলের অঙ্গীকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোও আইনটির সমালোচনা করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফেব্রুয়ারিতে বলেছিল, এই আইন মৃত্যুদণ্ডকে ইসরায়েলের বর্ণভিত্তিক ব্যবস্থার আরেকটি বৈষম্যমূলক হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জানিয়েছে, এই আইন যদি একচেটিয়া নাও হয়, তাহলেও প্রধানত ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হবে।
সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক উপপরিচালক অ্যাডাম কুগল বলেন, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, মৃত্যুদণ্ড আরোপের উদ্দেশ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এটি বৈষম্যকে আরও গভীর করে ও দ্বিস্তরবিশিষ্ট বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, যা বর্ণভিত্তিক শাসনের বৈশিষ্ট্য।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুদণ্ড অপরিবর্তনীয় ও নিষ্ঠুর। আপিলের সুযোগ সীমিত রাখা এবং ৯০ দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধান যুক্ত করে এই বিলটি ফিলিস্তিনি বন্দিদের দ্রুত ও কম পর্যবেক্ষণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথ তৈরি করছে।
তবে পার্লামেন্টে বিলটি পাস হওয়ার পর সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দণ্ডিত কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে শ্যাম্পেন হাতে উৎসবমুখর পরিবেশে দেখা গেছে। একই সঙ্গে বিলটির পক্ষে অবস্থান নিতে পার্লামেন্টে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আইনটি পাস হওয়ায় আইনপ্রণেতাদের অভিনন্দন জানান।
কীভাবে এই আইন শুধু ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে
এই আইনের বড় অংশটি সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে সামরিক আদালতের মধ্যে, যেখানে কেবল দখলকৃত অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের বিচার করা হয়। নতুন আইনে বলা হয়েছে, দখলকৃত পশ্চিম তীরে কোনো ইসরায়েলি নাগরিককে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
যদিও আদালত নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না, তবে ২০১০ সালে স্বীকার করা হয়েছিল যে পশ্চিম তীরে অপরাধের অভিযোগে বিচার হওয়া ফিলিস্তিনিদের ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশই দোষী সাব্যস্ত হয়।
অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক সপ্তাহে সাত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বিচার হয় ইসরায়েলের দেওয়ানি আদালতে। মার্চের শেষে ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই দশকের শুরু থেকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি হত্যার দায়ে এখনো কোনো ইসরায়েলি নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করেনি দেশটি।
নতুন আইনে ইসরায়েলি নাগরিকদের ক্ষেত্রে আদালতকে শাস্তি নির্ধারণে অতিরিক্ত নমনীয়তা দেওয়া হয়েছে। বিচারকরা চাইলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, যে কোনোটি বেছে নিতে পারবেন।
কিন্তু ফিলিস্তিনিদের বিচারের ক্ষেত্রে সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড প্রায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেখানে শুধু চরম ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া যেতে পারে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ইয়েশ দিনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বসতি স্থাপনকারীদের হার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ। সংস্থাটি জানায়, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনায় তদন্তের ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো অভিযোগ গঠন ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এই বৈষম্যের পেছনে রয়েছে ২০১৮ সালের ‘জাতীয় রাষ্ট্র আইন’, যা অনেকের মতে ইসরায়েলের বর্ণভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকে আইনি কাঠামো দেয়। এতে ইসরায়েলকে কেবল ইহুদিদের রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ও ইহুদি বসতি স্থাপনকে জাতীয় মূল্য হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এতে জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকের মর্যাদা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে ও সমতার কোনো নিশ্চয়তা রাখা হয়নি। অনেকের মতে, এটি আইনসম্মত নয়।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তার অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ দখলকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করলেও অঞ্চলটি এখনো সামরিক দখলে থাকা একটি বিদেশি ভূখণ্ড। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আমিচাই কোহেনের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইসরায়েলের পার্লামেন্টের পশ্চিম তীরের জন্য আইন প্রণয়ন করার অধিকার নেই, কারণ এটি দেশটির সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ নয়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এক প্রস্তাবে এক বছরের মধ্যে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান চেয়েছে। এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আদালতের এক মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, যেখানে দখলদারিত্বকে ‘অবৈধ’ বলা হয়েছে।
আইনটি পাস হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইসরায়েলের নাগরিক অধিকার সংস্থা সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে আবেদন করেছে। তাদের দাবি, আইনটি পরিকল্পিতভাবে বৈষম্যমূলক ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ওপর এটি প্রয়োগ করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
এর আগেও কি এমন অভিযোগ ছিল?
অনেক আগ থেকেই রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য আলাদা আইনি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ফিলিস্তিনিরা সামরিক আইনের অধীনে থাকলেও বসতি স্থাপনকারীরা দেওয়ানি আইনের আওতায় পড়ে, ফলে একই ভূখণ্ডে দুটি ভিন্ন বিচারব্যবস্থা চালু রয়েছে।
এই কাঠামো প্রশাসনিক আটকসহ নানা বৈষম্যমূলক প্রথাকে সম্ভব করেছে, যেখানে কাউকে অভিযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা যায়। একই সঙ্গে আইনের সুরক্ষা ও প্রয়োগেও বড় ধরনের বৈষম্য দেখা যায়, যা বর্ণভিত্তিক শাসনের অভিযোগকে জোরালো করেছে।
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ইসরায়েলের কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই কোনো বিচার ছাড়াই প্রশাসনিক আটক বা ‘অবৈধ যোদ্ধা’ হিসেবে আটক, ফলে তারা নিজেদের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান না।
শিশুদের আটক সংক্রান্ত আইন নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, ফিলিস্তিনি শিশুদের অনেক সময় অভিভাবক ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়, যা দেশটির নিজস্ব আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হলো ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা। অনুমতি ছাড়া নির্মিত বাড়িগুলো ধ্বংস করা হয়, যদিও এই অনুমতি পাওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রায় অসম্ভব। বিপরীতে, অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের স্থাপনাগুলো খুব কমই ভাঙা হয় ও অনেক ক্ষেত্রে পরে সেগুলো বৈধতা দেওয়া হয়।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ