সিএনএনের প্রতিবেদন
চীনের আক্রমণের ভয়ে তাইওয়ান ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন অনেকে
চীনের আক্রমণের ভয়ে তাইওয়ান ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন অনেকে/ ফাইল ছবি: এএফপি
চীনের আক্রমণের ভয় এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদেশ পাড়ি জমানোর প্রবণতা বাড়ছে। যদিও তাইওয়ান সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার মেয়াদ বাড়ানো এবং যুদ্ধ মহড়ার মাধ্যমে প্রতিরোধের চেষ্টা করছে, তবে অনেক নাগরিক ব্যক্তিগতভাবে ‘নিরাপদ আশ্রয়ের’ সন্ধানে বিকল্প পথ খুঁজছেন।
সম্পদ স্থানান্তর ও দ্বিতীয় পাসপোর্ট
তাইপের ৫১ বছর বয়সী নেলসন ইয়ে তিন বছর আগে সিঙ্গাপুরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে তার সম্পদের এক অংশ বিদেশে সরিয়ে নেন। পরে তিনি তুরস্কের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন এবং নিজের ও স্ত্রীর জন্য দ্বিতীয় পাসপোর্ট পান।
তার মতে, তাইওয়ানে যদি হামলা হয়, তাহলে তিনি বিদেশে থাকা টাকা ব্যবহার করতে পারবেন এবং সহজে অন্য দেশে যেতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘এমনটি হওয়ার আশঙ্কা কম, কিন্তু হলে ক্ষতি হবে অনেক বড়। তাই বিকল্প পরিকল্পনা রাখা দরকার।’
আরও পড়ুন>>
২০২৬ সালেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে চীন
অবরুদ্ধ তাইওয়ান, ব্যাপক আকারে সামরিক মহড়া চালাচ্ছে চীন
যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ দেখে তাইওয়ান দখলে উদ্বুদ্ধ হবে চীন?
তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি, ২০ মার্কিন কোম্পানির ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাড়ায় বিশ্ব পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে গেছে এবং বড় শক্তিগুলোর ওপর তার আস্থা কমে গেছে।
চীনের চাপ ও মানুষের উদ্বেগ
তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় আছে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে মনে করে এবং স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপটি ঘিরে নিয়মিত সামরিক মহড়া ও অবরোধের অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক তাইওয়ানবাসী প্রাথমিক চিকিৎসা, অস্ত্র চালানোসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। আবার অনেকেই বিদেশে যাওয়ার উপায় খুঁজছেন।
‘আজ হংকং, কাল তাইওয়ান’
হংকংয়ে চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর থেকে তাইওয়ানীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৯ সালে হংকংয়ের গণতন্ত্রকামী আন্দোলনের সময় জনপ্রিয় হওয়া স্লোগান ‘আজ হংকং, কাল তাইওয়ান’ এখন অনেকের মনে বাস্তব শঙ্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর ‘আজ ইউক্রেন, কাল তাইওয়ান’—এমন কথাও শোনা গেছে।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় আগ্রহ
তাইওয়ানীদের মধ্যে নিরাপদ আবাসন হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ব্যাংককের এক রিয়েল এস্টেট এজেন্ট জানান, তাদের সঙ্গে যোগাযোগকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন তাইওয়ানিজ নাগরিক। অনুসন্ধানের এই বিপুল প্রবাহ সামাল দিতে তার কোম্পানি ব্যাপক হারে কর্মী নিয়োগ করছে বলেও জানান ওই ব্যক্তি।
এমন তাইওয়ানিজদের অনেকেই কম্বোডিয়ায় সম্পত্তি কিনছেন বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যাতে যুদ্ধের সময় আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেলেও নৌপথে পালানো সম্ভব হয়।
যুদ্ধ হলে লড়াই নাকি পলায়ন?
২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হলে তাইওয়ানের ২০ শতাংশ নাগরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পক্ষে।
বিপরীতে, ১১ শতাংশ নাগরিক সরাসরি তাইওয়ান ছেড়ে পালানোর কথা বলেন। ১৭ শতাংশ সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। ৩৭ শতাংশ মানুষ নাগরিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে চলার কথা বলেছেন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানের জনগণের লড়াই করার মানসিকতা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি চীন বুঝতে পারে যে মানুষ লড়াই করার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলছে, তবে তারা আক্রমণে আরও সাহসী হবে।
বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব
ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টরা জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে সেন্ট লুসিয়া, ভানুয়াতু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব নেওয়ার হার বেড়েছে। আগে মানুষ কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার গ্রিন কার্ড খুঁজতো, কিন্তু এখন তাদের লক্ষ্য হলো ঝুঁকি কমানো এবং সম্পদের বৈচিত্র্য আনা।
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এবং আগামী মে মাসে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্ভাব্য বৈঠক তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমান এই অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক তাইওয়ানিজ নাগরিকের কাছে নিজের জন্মস্থান এক ‘অনিশ্চিত গন্তব্য’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: সিএনএন
কেএএ/