ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. আইন-আদালত

ব্যারিস্টার আরমান

আমাকে নামাজের সময় বলা হতো না, দিন না রাত বুঝতে পারতাম না

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৩:০৩ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

গুমঘরে বন্দি থাকার সময় কোরআন শরিফ চাইলেও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কারণে তাকে তা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান)। তিনি বলেন, আমাকে নামাজের সময় বলা হতো না, দিন না রাত বুঝতে পারতাম না। বাইরের আওয়াজ যেন ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য একটি একজস্ট ফ্যান চালিয়ে রাখা হতো।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষী হিসেবে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) কাটানো নিজের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন মীর কাসেমের ছেলে ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। এদিন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল টিএফআই সেলে সংঘটিত গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষীর জবানবন্দি নেন। অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মামলায় আসামি করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ বর্তমান, সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের।

৪১ বছর বয়সী মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বাবা মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ব্যারিস্টার আরমান বলেন, আমি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার যাদের গুম করে রেখেছিল আমি তাদের একজন। আমার পিতা শহীদ মীর কাসেম আলীর মামলায় নিয়োজিত আইনজীবী ছিলাম। ট্রাইব্যুনালে তার ফাঁসির রায় হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও খারিজ হয়েছিল এবং রিভিউ শুনানি চলছিল। ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট রাতে আমাকে বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে অপহরণ করা হয়। আমি তাদের জানাই সুপ্রিম কোর্টের আদেশ আছে, কোন বাহিনী তাদের পরিচয় না দিয়ে কাউকে আটক করতে পারবে না। তারা উত্তরে বলে, তাদের পরিচয় দেওয়া লাগে না। এর আগে ৪ আগস্ট রাতেও র‍্যাব পরিচয় দিয়ে আমার বাসায় প্রবেশ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, আমাকে নিয়ে একটি সংকীর্ণ সেলে প্রবেশ করায় এবং আমার জামা কাপড় খুলে তাদের দেওয়া লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরতে বলে। আমি পরনের সব কাপড়-চোপড় ও স্যান্ডেল তাদের দিয়ে দেই এবং তাদের দেওয়া লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরি। আমাকে চোখ বেঁধে ওই ঘরে রাখা হয়েছিল। ওই ঘরের মেঝে স্যাঁতসেতে, ইঁদুর এবং তেলাপোকা আমার শরীরের ওপর দিয়ে চলাফেরা করছিল। আমি নিজেকে সান্তনা দিচ্ছিলাম এই বলে যে, আমাকে হয়ত এখানে ২৪ ঘন্টার বেশি থাকতে হবে না। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হলেও আমাকে আদালতে হাজির করা হয়নি। আমি বুঝতে পারলাম যে, একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমি যে গুমের বিরুদ্ধে কথা বলতাম, আমি সেই গুমের শিকার হয়েছি। সেখানে আমাকে ১৬ দিন রাখা হয়। আমি এই ১৬ দিনে বেশ কয়েকবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি।

আরও পড়ুন

সরকারের কাছে যে আহ্বান জানালেন গুমের শিকার ব্যারিস্টার আরমান
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত নেতাদের উত্তরসূরিরা ভোটের মাঠে

গুমঘরের বর্ণনায় আরমান বলেন, ১৬ দিন পর একদিন মাঝরাতে ঐ বন্দিশালা থেকে বের করে চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে একটা গাড়িতে করে আরেকটি বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে সিঁড়ি বেয়ে একটি ভবনের দোতলায় তোলা হয়। তারপর সেখান থেকে কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে পাঁচধাপ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বামদিকে একটি বন্দি সেলে নেওয়া হয়। এই সেলটি আগের চেয়ে অনেক বড় এবং ফ্লোর টাইলস করা। টাইলসের রং ছিল সাদা রংয়ের ওপর ধূসর ডোরাকাটা এবং সেই সেলের সঙ্গে একটি অ্যাটাচড টয়লেট ছিল। টয়লেটের টাইলসে রং ছিল সাদার ওপরে নীল ডোরাকাটা। সেলের প্রবেশদ্বার ছিল স্টিলের। ভিতরে নজরদারির জন্য দেওয়ালের ওপরে একটি ছোট্ট জানালা ছিল, যা বাহির থেকে খোলা যায়। টয়লেটে যাওয়ার সময় এবং খাওয়ার সময় আমার চোখের বাঁধন আলগা করে দেওয়ার কারণে আমি ওপরের বর্ণনাগুলো দেখতে পাই। আমি বন্দি থাকা অবস্থায় সিলিংয়ের একটা অংশ খুলে পড়েছিল, যা পরবর্তীতে মেরামত করা হয়।

গুমের শিকার ব্যারিস্টার আরমান বলেন, এই সেলের প্রহরীদের আচরণ ছিল নির্মম এবং আমাকে সার্বক্ষণিক চোখ বেঁধে এবং হাতকড়া পরিয়ে রাখা হতো। খাবারের সময় ডান হাত খুলে দিতো। টয়লেটের সময় বাম হাত খুলে দিতো। গভীর রাতে প্রতিদিন দুই হাত পেছনের দিকে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়া হতো। সকালে নাস্তা না দেওয়া পর্যন্ত এভাবে রাখা হতো। আমাকে নামাজের সময় বলা হতো না, দিন না রাত বুঝতে পারতাম না। বাইরের আওয়াজ যেন ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য একটি একজস্ট ফ্যান চালিয়ে রাখা হতো। শীতকাল এলে একজস্ট ফ্যান বন্ধ রাখা হতো, তখন বাইরের শব্দ শুনতে পারতাম। যার মধ্যে বিমান, ট্রেন এবং জোরে গাড়ি চলাচলের শব্দ শুনতে পারতাম। ওখানে অন্যান্য সেলের বন্দিদের নির্যাতনের সময় আর্তচিৎকার শুনতে পেতাম। আমি প্রায়ই প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়তাম। সেই সময় বাইরে থেকে চিকিৎসক এসে চিকিৎসা দিতো। কয়েক মাস পরে আমার ডান উরুতে ফোঁড়া হয়, যা পেকে গিয়ে রক্ত ও পুঁজ বের হতো। তখন আমাকে আমার সেল থেকে বের করে ডান দিকে মোড় নিয়ে পাঁচ ধাপ সিঁড়ি ওপরে উঠে কিছুদূর গিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিয়ে মাইনর সার্জারি করা হয়। আমি তাদের বলি, এভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ? তখন তারা বলে, সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আপনার বিষয়ে নির্দেশ আসে। আমাদের করার কিছু নেই।

তিনি বলেন, আমাকে সেলে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ওষুধ দেওয়া হতো। একদিন ওষুধ দেওয়ার সময় একটি কাঠের বাক্স দেওয়া হয়, আমি চোখ বাঁধা অবস্থায় নিচ দিয়ে নাকের ফাঁক দিয়ে একটু দেখতে পেতাম, ওই ফাঁক দিয়ে দেখি, ওই বাক্সের গায়ে লেখা টিএফআই এবং আমার ওষুধগুলো একটি বড় ঠোঙ্গার মধ্যে ছিল, তার গায়ে লেখ্য ছিল ভিআইপি-২।

তিনি জানান, একবার গরমের সময় তার হিটস্ট্রোক হয়েছিল। তখন কয়েকদিনের জন্য একটি স্ট্যান্ড ফ্যান তার সেলের ভেতর দেওয়া হয়েছিল। স্ট্যান্ড ফ্যানের নিচের অংশে লেখা ছিল র‍্যাব-১।

খাবারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাকে তিন বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবারের পরিমাণ খুব সীমিত ছিল। আমাকে মুক্ত করার কয়েক মাস আগে থেকে খাবার খাওয়ার পরে আমার সারা শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হতো। মনে হতো হাজারটি পিঁপড়া আমাকে কামড়াচ্ছে। খাবার পর প্লেট আমার নিজের ধুতে হতো। তখন আমি দেখতাম প্লেটে পানি পড়লে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মত বুদবুদ উঠতো। আমার তখন সন্দেহ হয় আমার খাবারে তারা কিছু মেশাচ্ছে। তখন আমি অধিকাংশ খাবার টয়লেটে ফেলে দিতাম। মাঝে মাঝে ক্ষুধার কারণে কিছু খাবার পানি দিয়ে ধুয়ে খেতাম।

ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াত মনোনীত এই প্রার্থী আরও বলেন, রমজান মাস এলে তারা আমাকে জানাতো। ঐ রমজান থেকে আমি হিসাব করতাম ভেতরে কতদিন ছিলাম। আমি আটটি রমজান ওখানে অবস্থান করেছি। আমি অনেকবার তাদের কাছে কোরআন শরিফ চেয়েছিলাম, তারা আমাকে নিয়মের দোহাই দিয়ে কোরআন শরিফ দেয়নি। একজন প্রহরী আমাকে গভীর রাতে জানায় আমরা মুসলমান, কোরআন শরীফ আমরা দিতে চাই কিন্তু ‘র’ এর যে অফিসার আছে তার কারণে দিতে পারছি না। প্রথম রমজানের পর আমার শরীরে প্রচণ্ড খিচুনি হয়। তখন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমার সেলে আসেন। আমি আবার তাদের কাছে কোরআন শরিফের জন্য অনুরোধ করি। এরপর আমাকে কোরআন শরিফ দেওয়া হয়। তখন আমার ঘরে একটি লাইট লাগিয়ে দেওয়া হয় আর নির্দেশ দেওয়া হয় দেওয়ালের দিকে ফিরে চোখের বাঁধন হালকা লুজ করে কোরআন শরীফ পড়তে দিতে। যখনই প্রহরী আসার শব্দ পেতাম তখনি চোখের বাঁধন লাগিয়ে ফেলার কথা ছিল। পরবর্তীতে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে তাফসির গ্রন্থ দেওয়ার অনুমতি দেন। কখনোই আমাকে ঘড়ি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এফএইচ/এএমএ/এমএস