ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. আইন-আদালত

শতাধিক গুম-খুন

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন সাবেক সেনাপ্রধান

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৫:০৬ পিএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।

তিনি তার জবানবন্দিতে বলেছেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা মনে করতেন দুর্বল সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। প্রথম দিনের সাক্ষ্য শেষে মামলার কার্যক্রম সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।

জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, বাহিনীপ্রধানের কোনো ভূমিকা ছাড়াই তাদের অধস্তন জিয়াউল আহসানের মতো অফিসারদের তৎপরতা ছিল ব্যাপক।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নেতৃত্বে সব অপকর্ম হতো এবং চিফের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করা হতো। এক-এগারোর পর থেকেই সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ল্যাশ বাড়তে শুরু করেছে।

ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক আকার ধারণ করে। পেশাদার অফিসারদের সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয়। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের স্বার্থে সেনাবাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছেন বলেও জানান তিনি।

গুম, খুনে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের নিষ্ঠুরতা প্রসঙ্গে ইকবাল করিম বলেন, তার (জিয়াউল আহসান) মাথা ইট-পাথরের টুকরো দিয়ে ঠাসা। সে ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তার সেনানিবাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলাম।

ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, তিনি ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে বেড়ে উঠেছে, সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে আদালতে এসনছেন তিনি। তার দাবি, সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল। গুমের সংস্কৃতি পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, আমরা যদি ধরে নেই যে, ২০০৮ সাল থেকে খুন শুরু হয়েছে তবে সেটা ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনাক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে। এতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, তবে সংখ্যা ছিলো সীমিত। পরবর্তীতে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে এবং আইন প্রয়োগ করে সেগুলোকে নিয়মিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে বেশ কিছু মৃত্যু হয়েছে।যেগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে, সেগুলোকে ধর্তব্যে নিয়ে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শান্তি দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাদের সাহায্যে সামরিক বাহিনীকে কখনো কখনো মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া দুর্যোগের সময়েও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এমনকি নির্বাচনকালীনও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা, সেনাবাহিনী মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, অধিনায়কদের মনে সার্বক্ষণিক চাপ থাকে; তাদের কত তাড়াতাড়ি সেনানিবাসে ফেরত আনা হবে। কারণ, তাদের প্রত্যেকের কাছে প্রাণঘাতি অস্ত্র থাকে এবং তাদের প্রশিক্ষণ ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। বস্তুত এটি না হলে সেনাবাহিনী কখনো যুদ্ধ করতে পারবে না। এ জন্য প্রশিক্ষণকালে সেনা সদস্যদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়, মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে।

শেখ হাসিনার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা আরোহন প্রসঙ্গে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের শাসন আমলের দুর্বল দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও প্রশাসনের ওপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন। এ জন্য তিনি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি শান্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন।

জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান আরও বলেন, শেখ হাসিনা তার আত্মীয় মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহম্মেদ সিদ্দিকীকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তার মাধ্যমে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হন। মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিকী অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব, এনটিএমসি, আনসার, বিজিবিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।

র‍্যাব প্রসঙ্গে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, সেনাপ্রধান হওয়ার আগেই র‍্যাব সদস্যদের অবৈধ ও বিচার বহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। সেনাপ্রধান হওয়ার পর র‍্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তীতে লে. জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র‍্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন, আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরবর্তী কিছুদিন আমি পত্রিকায় ক্রস ফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারি ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে।

এফএইচ/বিএ/এমএমকে