ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. আইন-আদালত

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ: সংসদে উঠলে ভাগ্যে কী আছে?

মুহাম্মদ ফজলুল হক | প্রকাশিত: ০৫:৪৬ পিএম, ১১ মার্চ ২০২৬

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতন ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে যাওয়ার পর দেশে প্রথম নির্বাচিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশন বসছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ)। বাংলাদেশের টেকসই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে কি না, তার অনেকটাই নির্ভর করবে সদ্যনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর।

এরমধ্যে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে জারি করা স্পর্শকাতর বেশ কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিএনপি সরকারের। তবে নবনির্বাচিত এই সরকার দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বহাল রেখে এর আইনি ভিত্তি দিতে পারে। তাদের আপত্তি আছে আলোচিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আদেশসহ বেশ কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে। এগুলোর ভাগ্যে কী রয়েছে—চলছে এমন আলোচনা।

আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া ও বিধান নিয়ে কথা বলেন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে আমরা এসব উপস্থাপন করতে বাধ্য। কিন্তু সেই ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনটা কীভাবে গৃহীত হবে, তা সংসদের এখতিয়ার।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন, এর বাইরে আরও একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। সেই আদেশটার নাম হলো জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ। এটা কোন ধরনের আদেশ আমি জানি না। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে আদেশ জারির এখতিয়ার ছিল। যার ভিত্তি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর অর্ডিন্যান্স জারির ক্ষমতা পেলেন রাষ্ট্রপতি। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর অর্ডারের জমানা শেষ। এখন কীভাবে রাষ্ট্রপতি অর্ডার জারি করলেন? আমরা তখন প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, আমরা এই সমস্ত আরোপিত জবরদস্তিমূলক কোনো আদেশের বলে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের ক্ষমতা খর্ব হতে দেব না। কারণ জাতীয় সংসদের যে নির্বাচন, সেটা সংবিধানিক নির্বাচন।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের তথ্যমতে রাষ্ট্রপতি ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছেন বলে আমরা জানি সংবিধানের বিধান মোতাবেক যে সময় পার্লামেন্ট না থাকত, সে সময় আইন তৈরির একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে অধ্যাদেশ এবং রাষ্ট্রপতি সেটি আমাদের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী করেন।

তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানের ৯৩-এর (২) উপধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কর্তৃক এই অধ্যাদেশগুলো পরবর্তী সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপন করতে হবে। উপস্থাপনের পর থেকে আল্টিমেটলি এই অধ্যাদেশগুলোর জীবন হচ্ছে ৩০ দিন পর্যন্ত। এই ৩০ দিনের মধ্যে এটা পাস করতে হবে অথবা যদি পাস না করে, ৩০ দিনের আগেও বাতিল করা হতে পারে কিংবা পাস করা যেতে পারে।

যদি কোনো কারণে উত্থাপিত অধ্যাদেশগুলো ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ কর্তৃক পাস না হয়, তাহলে ৩০ দিন হওয়ার পরেই এটা আল্টিমেটলি বাতিল হবে।

রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এটা হচ্ছে আমাদের সাংবিধানিক বিধান। আমরা যতটুকু জেনেছি যে বর্তমান নির্বাচিত নতুন সরকার সংবিধানের এই বিধান মেনে অর্থাৎ ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৩৩টি অধ্যাদেশকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপন করবে।

সিনিয়র আইনজীবী কাজল বলেন, আমি যে কথা বললাম, উপস্থাপনের পর উত্থাপনের পরে যে সাংবিধানিক বিধান ৩০ দিনের মধ্যে আল্টিমেটলি এগুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হতে পারে। এখানে একটি কথা বুঝে রাখা ভালো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাদেশগুলো জারি হলেও একই বিষয়ে সরকারের নতুন করে আইন প্রণয়ন করতে কোনো ধরনের বাধা নেই। কিংবা বিদ্যমান অধ্যাদেশগুলোর মধ্যেও ইচ্ছা করলে সরকার সংশোধনী আনতে পারেন।

তিনি বলেন, আমার কাছে যেটা সবচেয়ে বড় মনে হয়, তা হলো এই অধ্যাদেশগুলোর একটা ইফেক্ট আছে। কারণ অনেকগুলো অধ্যাদেশ আছে, যেগুলো জারি করার পরে সেই অধ্যাদেশের অধীনে অনেক কার্যসম্পাদন হয়েছে। সুতরাং কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য এবং আইনের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য এই অধ্যাদেশগুলোর মাধ্যমে হয়ে যাওয়া কার্যক্রমগুলো আল্টিমেটলি অনুমোদন করতে হবে।

কাজল জানান, চূড়ান্ত বিবেচনায় অনুমোদন করতে গেলে সেটা অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে আইন আকারে হোক, পরে হোক না কেন—এই সময়কালে কিংবা পূর্বের অধ্যাদেশের অধীনে সব কিছুর একটা অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে। এবং আমি মনে করি বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার যারা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন, তারা অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন এবং সেভাবে সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

এর মধ্যে কিছু কিছু সংখ্যক অধ্যাদেশ আছে, যেগুলো আসলে খুবই মাইনর, খুব বড় কিছু বিষয়বস্তু নয়। আবার কিছু কিছু অধ্যাদেশ আছে, যেগুলো খুব মেজর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যেমন পাঁচটা ব্যাংক অধিগ্রহণ করার যে বিষয়, সেটা কিন্তু একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে হয়েছে। বড় ধরনের ফাইন্যান্সিয়াল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তারপর যদি রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করি, তাহলে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার—ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ—এসবের নির্বাচিত প্রতিনিধি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের অপসারণের যে ক্ষমতা সরকার অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে সচল করেছিল, সেটি বড় ধরনের আইনি বিধান।

তিনি বলেন, এছাড়া আরও অনেক কিছু আছে। তার মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনী আছে। দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধনী আছে। এছাড়া আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আছিয়ার মামলাটি আইন সংশোধন করার কারণে ধর্ষণের শাস্তিতে শ্রেণিবিভাগ করে ফেলা হয়েছে।

সুতরাং বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের শাস্তি কমিয়ে সাত বছর করা হয়েছে। যেটা আগে সবসময় যাবজ্জীবন ছিল কিংবা মৃত্যুদণ্ড ছিল। এরকম অনেক মেজর সংস্কার ও সংশোধনী করা হয়েছে। তাই এই সংশোধনীগুলো পার্লামেন্টের সদস্যরা পাস করবেন।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির জাগো নিউজকে বলেন, যতটুকু আমরা জানতে পেরেছি, ১৩৩টি অর্ডিন্যান্সকেই তারা প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন আইনের রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী পার্লামেন্টের সামনে উপস্থাপন করবেন। এর মধ্যে কতগুলো শেষ পর্যন্ত অ্যাপ্রুভ হবে—এই মর্মে কোনো খবর আমরা পাইনি। আমরা আশা করবো অন্তর্বর্তী সরকার যে সব সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন, অর্ডিন্যান্স আকারে সবগুলোই যেন পাস করা যায়।

এখানে আইন কী, বিধান যদি কোনোটা পার্লামেন্ট এগ্রি না করে, সেই ক্ষেত্রে কিন্তু এর মধ্যে তো সেগুলো ফাংশন করে দিয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আসলে কী হবে? আইনের বিধানগুলো বাংলাদেশ সংবিধানের আর্টিকেল ৯৩ অনুযায়ী যদি পার্লামেন্ট অ্যাপ্রুভ না করে, তাহলে এগুলো আর অর্ডিন্যান্স থাকবে না। এগুলো বাতিল হয়ে যাবে। আর যেগুলোকে অ্যাপ্রুভ করবে, সংসদের সামনে যেগুলো উপস্থাপন করা হবে এবং অনুমোদিত হবে, এগুলো অ্যাক্ট করতে হবে। এগুলো আর অর্ডিন্যান্স থাকবে না।

তিনি বলেন, আমরা আশা করবো কন্টিনিউয়েশন করতে গেলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্স রয়েছে সেখানে। যেমন বিচার বিভাগ আলাদা করা, গুম-খুনের অর্ডিন্যান্স। এছাড়া অনেকগুলো মামলায় সংশোধন হয়েছে, বিশেষ করে সিআরপিসিতে সংশোধন হয়েছে, সিপিসিতে সংশোধন হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন হয়েছে। এগুলো যদি অ্যাপ্রুভ না করে, তাহলে এক ধরনের ক্যাওস দেখা দিতে পারে। এজন্য উচিত হবে এই অর্ডিন্যান্সগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের অংশ হিসেবে যেভাবে গ্রহণ করেছে, সেগুলোকে আইনে রূপান্তর করা।

আর এটার নিয়ম হচ্ছে প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন উপস্থাপন করতে হবে। তার জন্য বিল আনতে হবে কত দিনের মধ্যে—জবাবে তিনি বলেন, ৩০ দিনের মধ্যে। প্রথম দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যেই এটা শুরু করতে হবে। সবই ৩০ দিনের মধ্যে।

শিশির মনির বলেন, নতুন করে আইন করতে কোনো বাধা নেই। যেহেতু বিএনপি সরকারের টু-থার্ড মেজরিটি আছে। ওদিকে বিরোধী দলও আছে। নতুন করে আইন করতে কোনো আপত্তি নেই, কোনো অসুবিধা নেই।

এফএইচ/এসএইচএস