ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. আইন-আদালত

ঘোড়ামারা আজিজসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৫:৫০ এএম, ২২ নভেম্বর ২০১৭

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা ও গাইবান্ধার সাবেক সংসদ সদস্য আবু সালেহ মুহাম্মদ আব্দুল আজিজ মিয়া ওরফে ঘোড়ামারা আজিজসহ ছয় জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতি অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই ছয় আসামির মধ্যে পাঁচজনই পলাতক।

আব্দুল আজিজ ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন- মো. রুহুল আমিন ওরফে মঞ্জু (৬১), মো. আব্দুল লতিফ (৬১), আবু মুসলিম মোহাম্মদ আলী (৫৯), মো. নাজমুল হুদা (৬০) ও মো. আব্দুর রহিম মিঞা (৬২)। এদের মধ্যে কারাগারে আছেন কেবল মো. আব্দুল লতিফ। রায় ঘোষণার সময় তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল।

রায়ের পর লতিফের আইনজীবী খন্দকার রেজাউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। তাই আপিল আবেদন করব।

রায়ে বলা হয়, প্রসিকিউশনের আনা তিন অভিযোগের সবগুলোই প্রমাণিত হয়েছে। একাত্তরে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা প্রথম অভিযোগে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ২ ও ৩ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কার্যকর করতে হবে।

সাজা কার্যকর করতে পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন ট্রাইব্যুনাল।

বুধবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি আমির হোসেন ও মো. আবু আহমেদ জমাদার।

রায় ঘোষণার সময় চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সিমন, মো. মোখলেসুর রহমান বাদল, আবুল কালাম, সাবিনা ইয়াসমিন খান মুন্নি, তুরিন আফরোজ, তাপস কান্তি বল, শেখ মোসফেক কবীরসহ প্রসিকিউশনের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

তিন অভিযোগের মধ্যে কোনটিতে কী সাজা বা দণ্ড
গাইবান্ধার মৌজামালি বাড়ি গ্রামে গিয়ে লুটপাট, স্বাধীনতার পক্ষের লোকজনকে আটক, অপহরণ ও নির্যাতন এবং পরে দাড়িয়াপুর ব্রিজে নিয়ে একজনকে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে হত্যার ঘটনায় আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

সুন্দরগঞ্জ থেকে ছাত্রলীগ নেতা মো. বয়েজ উদ্দিনকে ধরে থানা সদরে পাকিস্তানি ও রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন এবং পরে গুলি করে হত্যা করে তার লাশ মাটির নিচে চাপা দেয়ার ঘটনায় ছয় আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জ থানার পাঁচটি ইউনিয়নে স্বাধীনতার পক্ষের ১৩ জন চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে আটক করে আটকে রেখে নির্যাতন এবং পরে নদীর তীরে নিয়ে গুলি করে হত্যার ঘটনাতেও আসামিদের সবার মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন।

এর আগে ২১ নভেম্বর এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য বুধবার দিন ঠিক করেন আদালত। তার আগে এই আদালত রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৩ অক্টোবর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছিলেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন, সৈয়দ হায়দার আলী ও শেখ মোশফেক কবির। আসামিদের মধ্যে লতিফের পক্ষে আইনজীবী খন্দকার রেজাউল এবং পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম।

ট্রাইব্যুনালের এ রায়ে প্রসিকিউশন সন্তুষ্ট বলে জানান প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রায় সকল অপরাধের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো বুদ্ধিজীবী হত্যার পরে এই প্রথম একটি এলাকাকে পুরা নেতৃত্ব শূন্য করার জন্য ১৩ জন সাবেক এবং রানিং চেয়ারম্যান, মেম্বারকে ডেকে নিয়ে ক্যাম্পে আটক রেখে এক সঙ্গে হত্যার অভিযোগ। আদালত এসব অভিযোগ গ্রহণ করে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে দেয়া একটি বিষয় তুলে ধরে প্রসিকিউটর সুমন বলেন, ‘এসব আসামিদের অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান থাকতে পারে। কিন্তু এটি যদি একটি পরিকল্পনা মাফিক কাজ হয় তাহলে অপরাধের মাত্রা সবার উপরে সমানভাবে বর্তাবে। এ কারণে সকলেরই সমান সাজা দেয়া হয়েছে।’

এ রায়ে আব্দুল আজিজকে কুখ্যাত রাজাকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী গাজী তামিম সাংবাদিকদের বলেন, এই মামলায় তিনটি অভিযোগ ছিল। রাষ্ট্রপক্ষ তিনটি অভিযোগ প্রমাণে যে সাক্ষীদের হাজির করেছে তার অধিকাংশেরই বয়স ছিল ১৩/১৪ বছর। একাত্তর সালে এ সাক্ষীরা ছিল নাবালক। একজন নাবালক বা ১৩/১৪ বছরের সাক্ষীর পক্ষে এ ধরনের ঘটনা বর্ণনা করা অবিশ্বাস্য।

আসামিপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, আমি মনে করি রাষ্ট্রপক্ষ মাত্র দুটি ডকুমেন্ট জমা দিয়েছে। এ অপরাধ প্রমাণে তা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।

জানা যায়, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুল আজিজ মিয়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চার দলীয় জোটের অধীনে জামায়াত থেকে গাইবান্ধা সুন্দরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ ১৩টি মামলা হয়। সুন্দরগঞ্জ থানা শাখার জামায়াতের সক্রিয় সদস্য রুহুল আমিন ওরফে মঞ্জুর বিরুদ্ধে দু’টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা জামায়াত নেতা আব্দুল লতিফের বিরুদ্ধে সুন্দরগঞ্জ থানায় মানবতাবিরোধী অপরাধসহ তিনটি মামলা রয়েছে।

আবু মুসলিম মোহাম্মদ আলী মুক্তিযুদ্ধের আগে ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা ছিলেন। পরে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তার বিরুদ্ধে দু’টি মামলা হয়। ১৯৭০ সাল থেকে জামায়াতের কর্মকাণ্ডে জড়িত নাজমুল হুদার বিরুদ্ধেও দু’টি মামলা রয়েছে। আব্দুর রহিম মিঞা মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের কর্মী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে।

আসামি আজিজসহ গাইবান্ধার ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ওই বছরের ২৩ নভেম্বর প্রসিকিউশনের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এ মামলায় মাত্র একজন আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরে ঘোড়ামারা আজিজসহ সব আসামিকে পলাতক দেখিয়েই আদালতে মামলার বিচারিক কাজ শুরু হয়।

এফএইচ/এআরএস/এনএফ/এমএস

আরও পড়ুন