ঋণের ফাঁদ থেকে বাঁচতে ইএমআই নিয়ে যা জানা জরুরি
বলা হয় শখের তোলা আশি টাকা। সেই শখ পূরণ করতে নিজের সামর্থ্যের বাইরে অনেক কিছু কিনতেও ইচ্ছে করে। অনেক সময় আবার শখে নয়, প্রয়োজনীয় জিনিসটা কেনার সমান টাকাও হাতে থাকেনা। এমন সময় ক্রেতাকে সহায়তা করে ইএমআই সিস্টেম।
ইএমআই হলো - ইকুয়েটেড মান্থলি ইনস্টলমেন্ট অথবা সমান মাসিক কিস্তি। যে জিনিস আপনি একসঙ্গে সম্পূর্ণ টাকা দিয়ে কিনতে পারছেন না, ইএমআইয়ের মাধ্যমে আপনি সেই জিনিস তাৎক্ষণিক কিনতে পারছেন।
কিন্তু বিনিময়ে এর বিপরীতে আপনাকে মোট মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হয়। এই অর্থ আস্তে আস্তে পরিশোধ করা হয় বলে অনেকের কাছে এই অতিরিক্ত টাকা চোখে পড়ে না। কিন্তু যৌক্তিক অর্থে আপনি একটি পণ্য কিনতে বেশি অর্থ খরচ করছেন।
আবার, সাধারণত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা ইএমআই সিস্টেম বেশি ব্যবহার করে থাকেন। সকল প্রকার ইলেকট্রনিক পণ্য, আসবাবপত্র, বাড়ি , জমি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্তমানে ইএমআই সিস্টেম চালু রয়েছে। ভোগপণ্য উৎপাদনকারীরাও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে মার্কেটে ইএমআই পদ্ধতিকে সহজলভ্য করে তুলেছেন।
ফলে মানুষ এখন অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেও ইএমআই সিস্টেম ব্যবহার করছে। এখন অনেকেই ইএমআইয়ের মাধ্যমে এখন একাধিক পণ্য কিনতে মাসে অনেকগুলো কিস্তি চালিয়ে যান। একসময় দেখা যায় অনেকেই ইএমআইয়ের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না, ফলে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ইএমআই করতে হয় বলে কিস্তি বাদ পড়লেই সুদের পরিমাণ চক্রবৃদ্ধিতে বাড়তে শুরু করে। আর এভাবেই মানুষ ঋণের ফাঁদে পড়ে যায়। যা ক্রেতাকে অর্থনৈতিকভাবে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে।
তাই ইএমআই মূলত একটি কাজের জিনিস হলেও এর কারণে ঋণের ফাঁদ থেকে বাঁচতে কিছু বিষয় জানা প্রয়োজন -
১. ইএমআই-এর আসল খরচ বুঝে নিন
ইএমআই নেওয়ার আগে এর প্রকৃত খরচ বোঝা খুবই জরুরি। অনেক সময় দোকান বা প্রতিষ্ঠান ‘নো-কস্ট ইএমআই’ বলে প্রচার করলেও বাস্তবে এর ভেতরে লুকানো কিছু খরচ থাকে। যেমন -প্রসেসিং ফি যোগ করা হতে পারে, অথবা সুদের টাকা পুষিয়ে নিতে পণ্যের দাম আগেই বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
তাই শুধু মাসিক কিস্তির অঙ্ক দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। আপনাকে দেখতে হবে পুরো মেয়াদ শেষে মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, এর মধ্যে সুদ, চার্জ ও অতিরিক্ত ফি সবই অন্তর্ভুক্ত আছে কি না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ‘শূণ্য সুদের’ ইএমআই শেষ পর্যন্ত এককালীন নগদে দাম পরিশোধ করার চেয়েও বেশি খরচের হয়ে দাঁড়ায়।
সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে ইএমআইয়ের মোট খরচ হিসাব করে তা সরাসরি পুরো টাকা একসঙ্গে দেওয়ার খরচের সঙ্গে তুলনা করুন। তবেই বুঝতে পারবেন, ইএমআই সত্যিই আপনার জন্য লাভজনক কি না।
২. হঠাৎ করে কেনাকাটা করা থেকে বিরত থাকুন
ইএমআইয়ের সুবিধা অনেক সময় আমাদের অজান্তেই হঠাৎ সিদ্ধান্তে কেনাকাটার দিকে ঠেলে দেয়। মাসিক কিস্তির অঙ্কটা ছোট দেখালে মনে হতে পারে, ‘এটা তো সহজেই নেওয়া যায়।’ কিন্তু এই ভাবনাই অনেক সময় এমন পণ্য কিনতে বাধ্য করে, যেটা আসলে আপনার প্রয়োজন নেই বা এই মুহূর্তে বহন করার মতো সামর্থ্যও নেই।
ইএমআইতে কিছু কেনার আগে নিজেকে কয়েকটা প্রশ্ন করুন — এই জিনিসটা কি এখন আমার সত্যিই দরকার? আমি কি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে পারব?
আবেগের বশে নয়, বাস্তব আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিন। প্রয়োজন ও সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ইএমআই নিলে সাময়িক আনন্দের বদলে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

৩. ইএমআইয়ের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট ঠিক করুন
ইএমআইয়ের ফাঁদে পড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো সঠিক বাজেট না থাকা। তাই শুরুতেই ঠিক করে নেওয়া দরকার, আপনার মাসিক আয়ের কতটা অংশ ইএমআই পরিশোধে ব্যয় করবেন। সাধারণ নিয়ম হিসেবে, মোট মাসিক আয়ের ৩০–৪০ শতাংশের মধ্যে ইএমআই সীমাবদ্ধ রাখা সবচেয়ে নিরাপদ।
ইএমআইয়ের চাপ বেশি হলে সঞ্চয় কমে যায় এবং অপ্রত্যাশিত খরচ এলেই আর্থিক সংকট তৈরি হয়। তাই নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে বেশি ইএমআই নেওয়া উচিত নয়, বরং আয়–ব্যয়ের ভারসাম্য রেখে পরিকল্পিতভাবে ইএমআই নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে আপনি ঋণের ভারে চাপে না পড়ে স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারবেন।
৪. লাইফস্টাইল ঋণের চেয়ে প্রয়োজনীয় ঋণকে অগ্রাধিকার দিন
সব ঋণ একরকম নয়। কিছু ঋণ সত্যিই প্রয়োজনীয় এবং দীর্ঘমেয়াদে আপনার আর্থিক অবস্থাকে শক্তিশালী করে। যেমন — বাড়ির ঋণ, শিক্ষা ঋণ বা চিকিৎসা ঋণ। এসব ঋণ ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগের মতো কাজ করে। শিক্ষা দক্ষতা বাড়ায়, বাড়ি স্থায়ী সম্পদ তৈরি করে, আর চিকিৎসা সুস্থ জীবন নিশ্চিত করে।
অন্যদিকে, লাইফস্টাইল ঋণ হলো নতুন মোবাইল, টিভি, গ্যাজেট বা ভ্রমণের জন্য নেওয়া ঋণ। এসব সাধারণত স্বল্পমেয়াদি আনন্দ দেয়। কিন্তু এই আনন্দ দ্রুত ফুরিয়ে গেলেও ইএমআইয়ের চাপ দীর্ঘদিন থেকে যায়, যা ভবিষ্যতের আর্থিক স্থিতিশীলতায় বাধা সৃষ্টি করে।
তাই ঋণ নেওয়ার আগে ভেবে দেখুন, এটি কি আপনার ভবিষ্যৎকে শক্ত ভিত দেবে, নাকি শুধু সাময়িক চাহিদা পূরণ করবে। তাৎক্ষণিক ইচ্ছা পূরণের ঋণের বদলে ভবিষ্যতে মূল্য তৈরি করে এমন প্রয়োজনীয় ঋণকে অগ্রাধিকার দিলেই আপনি আর্থিকভাবে বেশি নিরাপদ ও স্থিতিশীল থাকতে পারবেন।

৫. সময়মতো ইএমআই পরিশোধ করুন
সময়মতো ইএমআই পরিশোধ করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। কিস্তি পরিশোধ না করতে পারলে অতিরিক্ত জরিমানা ফি জমা হয় । তাই সময়তো ইএমআই পরিশোধের চেষ্টা করবেন। নিয়মিত ও সময়মতো পরিশোধ করলে ঋণের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, আর মানসিক চাপও কম থাকে।
৭. বেশি সুদের ঋণ আগে পরিশোধ করুন
যদি আপনি একাধিক ঋণ নিয়ে থাকেন তাহলে যে ঋণের সুদের পরিমাণ বেশি। সেই ঋণ আগে পরিশোধ করুন। কারণ, যে ঋণের সুধের পরিমাণ বেশি, সেটি যদি দেরিতে পরিশোধ করেন তাহলে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই একাধিক ঋণ থাকলে সুধের পরিমাণ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করুন।
৮. জরুরি তহবিল গড়ে তুলুন
জরুরি তহবিল হলো আপনার আর্থিক নিরাপত্তার ঢাল। হঠাৎ কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি — যেমন চাকরি চলে যাওয়া, বড় ধরনের অসুস্থতা বা জরুরি চিকিৎসা ব্যয় — এলে এই তহবিলই আপনাকে ইএমআই পরিশোধে সহায়তা করবে। তখন মাসিক আয়ে ধাক্কা লাগলেও ঋণের কিস্তি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
জরুরি তহবিলে অন্তত ৬ থেকে ১২ মাসের মোট খরচ জমা থাকা উচিত। এই খরচের মধ্যে দৈনন্দিন ব্যয়ের পাশাপাশি সব ইএমআইও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এমন একটি তহবিল থাকলে কঠিন সময়ে আপনাকে কিস্তি মিস করতে হবে না, কিংবা পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনও পড়বে না।
তথ্যসূত্র: মিডিয়াম ডট কম
সানজানা রহমান যুথী/এএমপি/জেআইএম