আপনি কি ক্রাইম থ্রিলার ভক্ত? জেনে নিন বিজ্ঞান আপনার বিষয়ে কী বলছে
রাত বাড়ছে, কিন্তু চোখে ঘুম নেই। একটার পর একটা এপিসোড চলছে - খুনের রহস্য, তদন্তের মোড়, অপরাধীর মনস্তত্ত্ব। অনেকেই বলেন, `শেষটা না দেখা পর্যন্ত ঘুম আসে না।‘
সিরিয়াল কিলার সিরিজ কিংবা ট্রু ক্রাইম শো এখন কেবল বিনোদন নয় - এ যেন আধুনিক দর্শকের এক ধরনের অভ্যাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন বাস্তব অপরাধের গল্প আমাদের এতটা টানে? শুধু কৌতূহল, নাকি মানুষের মস্তিষ্কে এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ? বিজ্ঞান ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের সামনে নতুন কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে।
১. রহস্য সমাধানের আনন্দ ও মস্তিষ্কের খেলা
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের মস্তিষ্ক স্বভাবতই রহস্য ভালোবাসে। একটি অপরাধ, কিছু সূত্র, সন্দেহভাজন চরিত্র — সব মিলিয়ে ট্রু ক্রাইম গল্পগুলো আমাদের কাছে এক ধরনের মানসিক ধাঁধার মতো কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কনটেন্ট দেখার সময় মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের অংশ সক্রিয় হয়। শেষ পর্যন্ত ‘কে অপরাধী’ — এই উত্তরটা বের করার মুহূর্তে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায়।

২. নিয়ন্ত্রিত আতঙ্কের অভিজ্ঞতা
খুন, সহিংসতা বা অন্ধকার বাস্তবতা — সবই ভয়ংকর। কিন্তু স্ক্রিনের ওপাশে বসে এসব দেখলে বাস্তব কোনো ঝুঁকি থাকে না। গবেষকদের মতে, এটি মানুষের জন্য এক ধরনের নিরাপদ ভয়। বাস্তবে বিপদে না পড়েও ভয় অনুভব করা এবং সেই ভয় নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। অনেকের ক্ষেত্রে এটি উদ্বেগ সামলানোর এক অদ্ভুত কিন্তু কার্যকর মানসিক প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে।

৩. `আমি হলে বুঝতে পারতাম’ - নিজেকে প্রস্তুত মনে হওয়া
ট্রু ক্রাইম দর্শকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, এসব কনটেন্ট দেখার ফলে তারা বাস্তব জীবনে বিপদ চিনতে পারবেন। কীভাবে মানুষ প্রতারিত হয়, কোথায় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, বা কোন পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ - এসব তারা আগেভাগেই বুঝতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের কনটেন্ট তাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতির অনুভূতি তৈরি করে।

৪. ন্যায়বিচারের খোঁজ ও নৈতিক তৃপ্তি
বাস্তব অপরাধের গল্পে সাধারণত শেষ পর্যন্ত অপরাধী ধরা পড়ে, বিচার হয়, বা সত্য প্রকাশ পায়। এই কাঠামোটি দর্শকের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা জাগায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি মানুষের নৈতিক বোধকে শক্তিশালী করে - ‘খারাপ কাজের শাস্তি হয়’ - এই বিশ্বাস মানসিকভাবে আশ্বস্ত করে।

তাহলে কি সবাই সিরিয়াল কিলার প্রেমী?
গবেষণা কিন্তু এটাও বলছে, ট্রু ক্রাইম দেখা মানেই কেউ সহিংস বা বিকৃত মানসিকতার মানুষ, এমন নয়। বরং বেশির ভাগ দর্শকই হন কৌতূহলী, বিশ্লেষণপ্রবণ এবং গল্পভিত্তিক কনটেন্টে আগ্রহী। তারা অপরাধকে সমর্থন করেন না; বরং অপরাধের কারণ, মানুষের আচরণ ও মনস্তত্ত্ব বুঝতে চান।
কখন সতর্ক হওয়া দরকার?
তবে বিশেষজ্ঞরা একটি জায়গায় সতর্ক করছেন। যদি এই ধরনের কনটেন্ট দেখার পর দীর্ঘ সময় ধরে ভয়, উদ্বেগ, সন্দেহপ্রবণতা বা বাস্তব জীবন সম্পর্কে অতিরিক্ত অনিরাপত্তা তৈরি হয়, তাহলে বিরতি নেওয়া জরুরি। কারণ তখন এটি আর নিছক বিনোদন থাকে না - মানসিক চাপের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ক্রাইম থ্রিলার বা ট্রু ক্রাইম শো দেখার আকর্ষণ আসলে মানুষের মস্তিষ্কের গভীর প্রবৃত্তির সঙ্গেই জড়িত। রহস্য ভেদ করার তাগিদ, ভয়কে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, আর ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস। তাই আপনি যদি এই ধরনের গল্পে টান অনুভব করেন, সেটি অস্বাভাবিক নয়। শুধু মনে রাখবেন, স্ক্রিনের অপরাধ আর বাস্তব জীবনের শান্তির মাঝে ভারসাম্যটাই সবচেয়ে জরুরি।
সূত্র: ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকোলজি, সাইকোলজি টুডে, ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা, ওয়াইলি অনলাইন লাইব্রেরি
এএমপি/জেআইএম