প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করুন জরায়ুমুখ ক্যানসার, রক্ষা করুন জীবন
বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে যে ধরনের ক্যানসার বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক দেখা যায় জরায়ুমুখ ক্যানসার। প্রতিবছর হাজার হাজার নারী এই রোগে আক্রান্ত হন এবং অনেকেই মারা যান। জরায়ুমুখ ক্যানসার ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়, এক যুগের বেশি সময় ধরে জরায়ুমুখের স্বাভাবিক কোষগুলো পরিবর্তিত হতে থাকে এবং এক সময় ক্যানসারে রূপ নেয়। তাই নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৮ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৫ হাজার জন মারা যান। একইভাবে, স্তন ক্যানসারে নতুনভাবে আক্রান্ত হন প্রায় ১৩ হাজার নারী, যার মধ্যে ৬ হাজারের বেশি নারীর মৃত্যু ঘটে। এই রোগে রোগীর বেঁচে থাকা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও কার্যকরী চিকিৎসার উপর। দেরিতে রোগ সনাক্ত হলে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং মৃত্যু ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই এই রোগের চিকিৎসা সুবিধা সীমিত এবং ব্যয়বহুল। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার সনাক্ত করা গেলে মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব। ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার নারীদের জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের মৃত্যুহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করে আসছে এবং এ পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৫০০টি সেবা কেন্দ্রে বিনামূল্যে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের সেবা চালু করা হয়েছে।
কেন হয় জরায়ুমুখে ক্যানসার?
জরায়ুমুখ ক্যানসারের মূল কারণ হলো হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)। এটি সাধারণত যৌনমিলনের মাধ্যমে ছড়ায়। পুরুষদের শরীরের মাধ্যমে ভাইরাস নারীর দেহে প্রবেশ করে।
ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ক্যানসার হয় না। ক্যানসার হওয়াতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ প্রদর্শন করে না, তাই অনেক সময় সময়মতো শনাক্ত করা যায় না।শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে কেবল ব্যথা, অস্বস্তি বা অন্যান্য গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়।
ক্যানসার পরীক্ষা করার উপায় গুলো হলো-
পেপস টেস্ট
এটি একটি সহজ ও ব্যথাহীন পরীক্ষা। জরায়ুমুখ থেকে সেল সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করা হয়। পেপস টেস্ট ক্যানসার, ক্যানসার হওয়ার পূর্বাবস্থা এবং অন্যান্য প্রদাহজনিত রোগ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। বিবাহিত নারীরা বিয়ের তিন বছর পর থেকে ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি তিন বছর অন্তর একবার পেপস টেস্ট করানো উচিত। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে রুটিন পরিবর্তন হতে পারে।
ভায়া টেস্ট
ভায়া টেস্টে জরায়ুমুখে ৩-৫% অ্যাসিটিক অ্যাসিড প্রয়োগ করা হয়। কিছুক্ষণ পর অস্বাভাবিক বা ক্যানসার-পূর্ব কোষ সাদা হয়ে ওঠে। সাদা দাগ দেখা গেলে কপোস্কোপি এবং বায়োপসি করানো হয়।পেপস বা ভায়া পজিটিভ হলেই ক্যানসার হয়েছে, এমনটা নয়। আরও পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হয়।
কল্পোস্কোপি ও বায়োপসি
সন্দেহজনক কোষ বা স্থান সরাসরি কল্পোস্কোপের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন হলে সেই অংশ থেকে বায়োপসি নেওয়া হয়, যাতে নিশ্চিতভাবে ক্যানসার বা ক্যানসার-পূর্ব অবস্থা নির্ণয় করা হয়।
জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিং
প্রাথমিক পর্যায়ে জরায়ুমুখ ক্যানসারের লক্ষণ থাকে না। অনেক রোগী দ্বিতীয় পর্যায়েও উপসর্গহীন থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে শতভাগ নিরাময় সম্ভব।
স্ক্রিনিং রুটিনের নিয়ম হলো, বয়স ২১ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে পেপস টেস্ট প্রতি তিন বছর অন্তর একবার করানো উচিত। ৩০ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে পেপস টেস্ট প্রতি তিন বছর একবার এবং এইচপিভি টেস্ট প্রতি পাঁচ বছর একবার করানো উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ নারীরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও ঘন স্ক্রিনিং করতে পারেন। বয়স ৬৫-এর বেশি হলে, যদি শেষ ১০ বছরের রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকে, তাহলে আর পেপস টেস্টের প্রয়োজন হয় না।
সতর্কতা ও সচেতনতার জন্য জানা জরুরি যে, নিয়মিত স্ক্রিনিং করানো অত্যন্ত প্রয়োজন। সংক্রমণ প্রতিরোধে যৌন স্বাস্থ্য সচেতনতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসা সহজ হয়।
জরায়ুমুখ ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রতিটি নারীর স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পরীক্ষা এবং সতর্কতা এ রোগকে নিরাময়যোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য করে তোলে।
সূত্র: ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভস (আইদেশি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভাসিটি
আরও পড়ুন:
শরীরের এক নীরব টিউমার থেকে হতে পারে নেট ক্যানসার
পরিবারে বংশগত স্তন ক্যানসার থাকলে কীভাবে সাবধান হবেন
এসএকেওয়াই/