শুধুই কি উচ্চশিক্ষা আর চাকরি? নাকি ভাষা শেখার আছে অন্য কারণ
আগে মানুষ ভাষা শিখতো শুধু অভিবাসনের জন্য। বর্তমানে মানুষ উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, চাকরির কারণেও ভাষা শিখছে। তবে জানেন কি এর বাহিরেও রয়েছে ভাষা শেখার বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক উপকারিতা?
১. স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে
নতুন একটি ভাষা শেখা মানেই প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ, বাক্যগঠন ও নিয়ম মনে রাখা এবং প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করা। এই ধারাবাহিক মনে রাখা ও মনে পড়ানোর প্রক্রিয়াটি আমাদের মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের শক্তিশালী ব্যায়ামের মতো কাজ করে। ঠিক যেমন শরীরচর্চা শরীরকে সক্রিয় রাখে, তেমনি ভাষা শেখা মস্তিষ্ককে রাখে সচল ও সতেজ—প্রতিনিয়ত যেন একটি মানসিক আপডেট চলতে থাকে।
গবেষণায়ও প্রমাণিত হয়েছে, দ্বিতীয় ভাষা শেখা এপিসোডিক মেমোরি এবং সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা বাড়ায়। যারা নিয়মিত একাধিক ভাষা ব্যবহার করেন, তারা সাধারণত তথ্য আরও ভালোভাবে মনে রাখতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে সক্ষম হন - যা একভাষী মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।
তাই নতুন ভাষা শেখা মোটেও সময় নষ্ট নয়। বরং এটি মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী ও দক্ষ করে তোলে।

২. যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক
প্রাথমিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভাষা শেখা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা বাড়ায়। পরবর্তীতে জানা যায়, এই সহমর্মিতাই নতুন ভাষা শেখার ক্ষেত্রে একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয় ভাষায় কথা বললে মানুষ অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়গুলো ভাবতে শেখে। ফলে যোগাযোগে আসে সংবেদনশীলতা, স্পষ্টতা ও গভীরতা।
এছাড়াও ভাষার মাধ্যমে অন্য দেশের সংস্কৃতি, আচার-আচরণ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়। এতে ভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে ভাষা শেখা যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৩. সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে
গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিভাষিক শিশুরা সমস্যা সমাধান ও চিন্তায় একভাষী শিশুদের তুলনায় বেশি সৃজনশীল ও নমনীয় হয়। একই বিষয় প্রযোজ্য দ্বিতীয় ভাষা শেখা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও।
ভাষা শেখার সময় আমাদের মস্তিষ্কে যে প্রক্রিয়াগুলো সক্রিয় থাকে - যেমন অনুবাদ করা, ভাষা বদলানো, নিয়ম মেনে শেখা এবং নতুন কিছু গ্রহণ করার মানসিকতা - এসবই মূলত মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতাকে উন্মুক্ত করে।

৪. সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে
দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ ভাষায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সাধারণত মাতৃভাষায় নেওয়া সিদ্ধান্তের তুলনায় বেশি যুক্তিনির্ভর হয়। কারণ, যখন আমরা কোনো সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ ভিন্ন ভাষায় ভাবি, তখন আবেগের প্রভাব কিছুটা কমে যায় এবং চিন্তায় এক ধরনের নিরপেক্ষতা তৈরি হয়।
এই মানসিক দূরত্ব আমাদের পরিস্থিতি আরও শান্ত ও স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। আবেগের তাড়নায় তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে তখন আমরা তথ্য, যুক্তি ও সম্ভাব্য ফলাফল ধাপে ধাপে বিবেচনা করতে পারি।
ফলস্বরূপ, সিদ্ধান্তগুলো হয় আরও বাস্তবসম্মত, পরিমিত ও সুচিন্তিত। অর্থাৎ, নতুন ভাষা শেখা শুধু কথা বলার দক্ষতাই বাড়ায় না - এটি আমাদের ভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও আরও গভীর, সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করে তোলে।
তথ্যসূত্র: এসিটিএফএল, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, বে অ্যাটলান্টিক বিশ্ববিদ্যালয়
সানজানা রহমান যুথী/এএমপি/জেআইএম