সবার মাথা ঘোরা কি সমান সিরিয়াস? সতর্ক হবেন কারা
হঠাৎ উঠে দাঁড়াতে গিয়ে চোখে ঝাপসা দেখা, কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথা হালকা লাগা - এ অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। গরমে পানি কম খাওয়া, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, বা অতিরিক্ত ক্লান্তি - এসব সাময়িক কারণে মাথা ঘোরা হতে পারে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ক্ষণস্থায়ী এবং বিশ্রাম বা পানি খেলে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু সব মাথা ঘোরা একই রকম নয়। কখনও এটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণও হতে পারে।
প্রথমেই জানা দরকার, মাথা ঘোরা বলতে আমরা কী বুঝি। কেউ বলেন হালকা লাগছে, কেউ বলেন চারপাশ ঘুরছে, আবার কারও ক্ষেত্রে ভারসাম্য রাখতে কষ্ট হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এগুলোকে আলাদা করা হয় - লাইটহেডেডনেস, ভার্টিগো এবং ব্যালান্স সমস্যা হিসেবে। কারণভেদে ঝুঁকিও আলাদা।
সাময়িক ও কম ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে আছে ডিহাইড্রেশন, রক্তে শর্করা কমে যাওয়া, ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা হঠাৎ ভঙ্গি পরিবর্তন। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর দ্রুত উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে - একে বলা হয় অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন। এতে কয়েক সেকেন্ড মাথা ঘুরে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তবে কিছু ক্ষেত্রে মাথা ঘোরা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। যেমন -
১. উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপ
অনিয়ন্ত্রিত হাইপারটেনশন বা হাইপোটেনশন দুটোই মাথা ঘোরার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যদি সঙ্গে মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড় বা দুর্বলতা থাকে।

২. হৃদ্রোগ
হার্টের অনিয়মিত স্পন্দন (অ্যারিদমিয়া) বা হার্টে রক্ত পাম্পিং কমে গেলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছাতে পারে। এতে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া পর্যন্ত হতে পারে।
৩. স্ট্রোক
হঠাৎ তীব্র মাথা ঘোরা, সঙ্গে কথা জড়ানো, মুখ বেঁকে যাওয়া, এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া - এসব স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। গবেষণা অনুযায়ী, দ্রুত চিকিৎসা স্ট্রোকের ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ডায়াবেটিস
রক্তে শর্করা খুব কমে গেলে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) মাথা ঘোরা, কাঁপুনি, ঘাম হওয়া দেখা দিতে পারে। আবার দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে স্নায়ুর সমস্যার কারণেও ভারসাম্যহীনতা হতে পারে।
৫. কানের ভেতরের সমস্যা
ভেস্টিবুলার সিস্টেমে সমস্যা হলে ভার্টিগো হয় - মনে হয় চারপাশ ঘুরছে। বেনাইন প্যারক্সিসমাল পজিশনাল ভার্টিগো (বিপিপিভি), মেনিয়ের’স ডিজিজ বা ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস এর কারণ হতে পারে।
৬. রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া)
হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, ফলে মাথা হালকা লাগে, ক্লান্তি বাড়ে।

তাহলে সচেতন থাকবেন কীভাবে?
প্রথমত, মাথা ঘোরা কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে এবং কী কী উপসর্গ সঙ্গে আছে, তা খেয়াল করুন। কয়েক সেকেন্ডের হালকা ঘোরাভাব আর হঠাৎ তীব্র ভার্টিগো এক জিনিস নয়। যদি মাথা ঘোরার সঙ্গে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কথা জড়ানো, দৃষ্টিহীনতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকে, তাহলে তা জরুরি অবস্থা হিসেবে ধরতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জীবনযাপনে কিছু নিয়ম মানা জরুরি - পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত খাবার খাওয়া, হঠাৎ করে উঠে না দাঁড়ানো, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা। যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের ক্ষেত্রে মাথা ঘোরা অবহেলা করা উচিত নয়।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, শরীর অনেক সময় আগেভাগেই সংকেত দেয়। সব মাথা ঘোরা বিপজ্জনক নয়, তবে বারবার হলে বা অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। সাময়িক ঘোরাভাব আর গুরুতর অসুস্থতার ইঙ্গিত—দুটোর পার্থক্য বোঝাই সচেতনতার প্রথম ধাপ।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা; আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন; ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারস অ্যান্ড স্ট্রোক; সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন
এএমপি/এএসএম