ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. লাইফস্টাইল

স্বামীর সাথে ঝগড়া, আলমারি গোছানোই সমাধান!

লাইফস্টাইল ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৬:০১ পিএম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হলেই কি আপনি হঠাৎ করে আলমারি খুলে বসে পড়েন? কাপড় ভাঁজ করতে করতে, পুরোনো জিনিস আলাদা করতে করতে মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে আসে? বাইরে থেকে দেখলে বিষয়টা সামান্য কিংবা অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই আচরণের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। রাগ, অভিমান বা কষ্ট সব অনুভূতি সবসময় মুখে বলা যায় না। তখন অবচেতন মন এমন কাজ বেছে নেয়, যেখানে নিয়ন্ত্রণটা নিজের হাতে থাকে।

আলমারি গোছানো তখন আর শুধু ঘরের কাজ থাকে না, হয়ে ওঠে এক ধরনের নীরব থেরাপি। সম্পর্কের টানাপোড়েনে জমে থাকা অগোছালো অনুভূতিগুলো যেন কাপড়ের ভাঁজের সঙ্গে সঙ্গে একটু করে সোজা হয়ে যায়। তাই স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার পর আলমারি গোছানো অনেক নারীর কাছে সমাধানের ভাষা হয়ে ওঠে শব্দহীন, কিন্তু গভীর।

স্বামীর সাথে ঝগড়া, আলমারি গোছানোই সমাধান!

সম্প্রতি পাকিস্তানি ড্রামা কাফিলের একটি দৃশ্যে ঠিক এমনই একটি মুহূর্ত ধরা পড়ে। জেবার খালা বলেন, স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হলেই তিনি আলমারি গোছাতে বসে পড়েন। কথাটা শুনে জেবা হেসে ওঠে। তার কাছে বিষয়টা অদ্ভুত, প্রায় শিশুসুলভ। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

জীবনের একপর্যায়ে এসে, জামির সঙ্গে মনোমালিন্য হলেই জেবা নিজের অজান্তেই খালার মতো আচরণ করতে শুরু করে। রাগ, অভিমান, না-বলা কষ্ট সবকিছুকে পাশে সরিয়ে রেখে সে আলমারি খুলে বসে পড়ে। তখন আর ব্যাপারটা হাসির থাকে না। বরং ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, এই অভ্যাসের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক সত্য।

এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী নুজহাত রহমান বলেন, জগড়া হলে মনের ভেতর একটা অস্থিরতা তৈরি হয়, যা শরীরেও প্রভাব ফেলে। শারীরিকভাবে দেখা যায়, অনেকেই এই অস্থিরতা দূর করার জন্য কোনো না কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে রাখেন। এর একটি কারণ হলো, যখন আমরা কোনো কাজ করতে থাকি, তখন শরীরে থাকা ফিজিক্যাল টেনশন বা মানসিক চাপ সেই কাজের মাধ্যমে রিলিজ হয়। কাজের মধ্যে মন বিভ্রান্ত হয়ে অস্থিরতা কমে যায়।

 

মনোবিজ্ঞানী নুজহাত রহমানছবি: মনোবিজ্ঞানী নুজহাত রহমান

তিনি আরও বলেন, মন ও শরীরকে এই ধরনের অস্থিরতা থেকে মুক্ত করার জন্য মানুষ বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন। উদাহরণস্বরূপ কেউ আলমারি গোছাতে পারে, ঘরের ভেতরে ছোটখাটো অন্য কাজ করতে পারে বা চলাফেরা করতে করতে মনকে ব্যস্ত রাখে। কেউ হয়তো বারবার হাঁটাচলা করেন, ঘরে ঘোরাঘুরি করেন সবকিছুই এক ধরনের কার্যকলাপ যা মনের অশান্তি কমাতে সাহায্য করে এবং শরীরের ভেতরের টেনশনকে মুক্ত করে।

এ বিষয়ে সতর্ক করে নুজহাত রহমান বলেন, এ ধরনের কার্যকলাপে সাবধান হওয়াটাও জরুরি। যদি খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান বা হঠাৎ কোনো আকস্মিক পরিস্থিতির মুখে পড়েন, তবে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। তাই এই ধরনের কাজ করা ভাল, কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে করা উচিত।

জাপানিজ দর্শনে একটি ধারণা আছে ‘সেইরি সেইটন’। ‘সেইরি’ মানে অপ্রয়োজনীয় জিনিস আলাদা করা, আর ‘সেইটন’ মানে প্রয়োজনীয় জিনিসকে গুছিয়ে ঠিক জায়গায় রাখা। এই দর্শন শুধু ঘর পরিষ্কারের নিয়ম নয়; এটা আসলে জীবনকে দেখার এক ধরনের পদ্ধতি।

মানুষ যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে, তখন তার ভেতরের জগৎ হয়ে ওঠে বিশৃঙ্খল। কিন্তু সেই বিশৃঙ্খল মনকে সরাসরি গুছিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। অনুভূতির কোনো সুইচ নেই, যেটা টিপে শান্ত হওয়া যায়। তখন মানুষ অবচেতনে এমন কিছু কাজ বেছে নেয়, যেগুলোর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আছে। যেমন-আলমারি গোছানো, ঘর পরিষ্কার করা, জিনিসপত্র সাজানো। বাইরের জিনিস গুছাতে গুছাতে মন একটা বার্তা পায়; সবকিছু পুরোপুরি এলোমেলো নয়, কিছু অন্তত আমার আয়ত্তে আছে।

আরও পড়ুন: 

‘আঙ্কেল’ নয়, কেন ‘ভাইয়া’ ডাকলে খুশি হয় পুরুষেরা

টানা কাজের ফাঁকে ছোট বিরতি কেন জরুরি

দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে ভাইরাল বিতর্কের আইনি সত্য

কথা বলা যায় না, হাত চলে

সব ঝগড়া ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সব কষ্টের নাম দেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় রাগটা এতটাই জট পাকায় যে, মুখ খুললে সেটা আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। তখন মানুষ চুপ করে যায়। কিন্তু চুপ মানেই নিষ্ক্রিয় নয়। হাত তখন কাজ খোঁজে।

আলমারির ভাঁজে ভাঁজে কাপড় সাজানো, পুরোনো জিনিস আলাদা করে রাখা, অপ্রয়োজনীয় বোঝা ফেলে দেওয়া এই সবকিছু আসলে প্রতীকী। যেন মন বলছে, আমিও আমার ভেতরের অপ্রয়োজনীয় কষ্টগুলো আলাদা করতে চাই, শুধু ভাষাটা জানি না। এই কারণেই অনেকের কাছে রান্না করা, পরিষ্কার করা, গাছের যত্ন নেওয়া বা লেখালেখিও এক ধরনের থেরাপি হয়ে ওঠে। এগুলো নীরব ভাষা যেখানে শব্দ নেই, কিন্তু অনুভূতি আছে।

খালার আলমারি আর জেবার উপলব্ধি

জেবার খালার আলমারি গোছানোটা আসলে কখনোই হাস্যকর ছিল না। সেটা ছিল নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ের এক নিঃশব্দ কৌশল। জীবনের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, নিজের আবেগ সবকিছুর ভিড়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন একটি কাজ, যেটা তাকে সাময়িক হলেও স্থির রাখে।

জেবা প্রথমে সেটা উপহাস করেছিল, কারণ তখনও তার জীবনে সেই গভীর চাপ এসে পৌঁছায়নি। কিন্তু অভিজ্ঞতা বদলালে দৃষ্টিভঙ্গিও বদলায়। যে সত্য একসময় অদ্ভুত লাগে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটাই হয়ে ওঠে বাঁচার অবলম্বন।

সব থেরাপি কাউন্সেলিং রুমে হয় না। সব আরোগ্যের জন্য শব্দ লাগে না। কখনো কখনো একটা আলমারি, কয়েকটা ভাঁজ করা কাপড় আর নিঃশব্দে নিজের সঙ্গে থাকা এই সামান্য ব্যাপারগুলোই মানুষকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই পরেরবার কাউকে ঝগড়ার পর ঘর গুছাতে দেখলে হাসবেন না। হয়তো সে তখন নিজের অগোছালো মনটাকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করছে। কারণ কিছু সত্য আগে উপহাস মনে হয়, পরে ঠিক আশ্রয় হয়ে ওঠে।

জেএস/

আরও পড়ুন