ছবি দেখে এআই মনে হলেও ‘সানরে প্যাটার্ন’ হাড়ের এক ভয়ংকর ক্যানসার
এটি সাধারণত আক্রমণাত্মক বা দ্রুত বাড়তে থাকা টিউমারের ইঙ্গিত দেয়। ছবি/সংগৃহীত
অনেক সময় দীর্ঘদিনের হাড়ের ব্যথাকে আমরা সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাই। বিশেষ করে শিশু-কিশোর বা তরুণদের ক্ষেত্রে এই ব্যথাকে গুরুত্বেই দেওয়া হয় না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সহনীয় ব্যথার পেছনেও লুকিয়ে থাকতে পারে হাড়ের ক্যানসার।
চিকিৎসকেরা এক্স-রে প্লেটে একটি বিশেষ লক্ষণ দেখে এ ধরনের রোগ সম্পর্কে সতর্ক হন, যাকে বলা হয় সানরে প্যাটার্ন, সানরে অ্যাপেয়ারেন্স বা সূর্যের কিরণের মতো ছড়ানো।
সানরে প্যাটার্ন আসলে কী?
সহজভাবে বললে, এটি এক ধরনের এক্স-রে বা রেডিওলজিক্যাল চিত্র, যেখানে হাড়ের একটি অংশ থেকে সূর্যের কিরণের মতো সরু সরু রেখা চারদিকে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এটি সাধারণত অস্টিওসারকোমা নামে পরিচিত একটি ক্যানসারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যা হাড়ের সবচেয়ে সাধারণ ম্যালিগন্যান্ট (ক্যানসারজনিত) টিউমার।
কীভাবে তৈরি হয় এই প্যাটার্ন?
এই চিহ্ন তৈরি হওয়ার পেছনে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া কাজ করে। অস্টিওসারকোমা খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। এত দ্রুত যে হাড়ের বাইরের আবরণ (পেরিওস্টিয়াম) স্বাভাবিকভাবে নতুন হাড় তৈরি করতে পারে না। ফলে পেরিওস্টিয়াম উপরে উঠে যায় এবং এর সঙ্গে যুক্ত সূক্ষ্ম তন্তুগুলো বাইরের দিকে ঠেলে বের হয়ে আসে। পরে এই তন্তুগুলো শক্ত হয়ে হাড়ের মতো গঠন তৈরি করে, যা এক্স-রেতে সূর্যের কিরণের মতো দেখা যায়।
চিকিৎসকদের জন্য এই প্যাটার্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এটি সাধারণত আক্রমণাত্মক বা দ্রুত বাড়তে থাকা টিউমারের ইঙ্গিত দেয়। তবে শুধু অস্টিওসারকোমাতেই নয়, কিছু ক্ষেত্রে অন্য রোগেও এটি দেখা যেতে পারে। যেমন - ইউইং সারকোমা, কিছু ধরনের ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া (মেটাস্টাসিস) বা বিরল কোনো গুরুতর সংক্রমণেও এমন চিত্র দেখা সম্ভব।
এই রোগের লক্ষণ কী?
- একটি নির্দিষ্ট হাড়ে দীর্ঘদিন ব্যথা, যা অনেক সময় রাতে বেশি হয়।
- ব্যথা স্থানে ফোলা বা শক্ত হয়ে যাওয়া।
- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাঁটুর কাছাকাছি বা কাঁধের হাড়ে এই টিউমার বেশি দেখা যায়।
- খুব বিরল ক্ষেত্রে চোয়ালের হাড়েও এটি হতে পারে, যা ডেন্টাল এক্স-রেতে ধরা পড়ে।

এক্স-রে প্রাথমিকভাবে এই সানরে প্যাটার্ন দেখাতে পারলেও রোগ কতদূর ছড়িয়েছে তা বুঝতে এমআরআই করা জরুরি। এতে হাড়ের ভেতর এবং আশপাশের নরম টিস্যুতে টিউমারের বিস্তার নির্ণয় করা যায়।
কখন সতর্ক হবেন?
হাড়ের ব্যথাকে অনেক সময় আমরা অবহেলা করি। মনে করি – এমনিই সেরে যাবে, হয়তো বাতের ব্যথা, কিংবা কোথাও বাড়ি লেগে ব্যথা হয়েছে। কিন্তু হাড়ের ব্যথা যদি দীর্ঘদিন থাকে, বিশেষ করে যদি তা ক্রমশ বাড়ে বা সঙ্গে ফোলা দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ শুরুতেই রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
নির্ণয় ও চিকিৎসা
অস্টিওসারকোমার চিকিৎসা রয়েছে, এবং যত দ্রুত ধরা পড়ে, তত ভালো ফল পাওয়া যায়। শুরুতে রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা এক্স-রে করে সন্দেহ হলে এমআরআই বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে টিউমারের বিস্তার দেখেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য বায়োপসি করা হয়, যেখানে টিস্যুর নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসায় সাধারণত কেমোথেরাপি ও অস্ত্রোপচার একসঙ্গে করা হয়। প্রথমে টিউমার ছোট করতে ওষুধ দেওয়া হয়, এরপর অপারেশনের মাধ্যমে আক্রান্ত অংশ অপসারণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অঙ্গ সংরক্ষণ করেই চিকিৎসা সম্ভব। নিয়মিত ফলোআপ ও চিকিৎসা চালিয়ে গেলে অনেক রোগীই সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।
তবে দুঃখজনক হলো, রোগী সাধারণত এই রোগ চেপে রাখতে রাখতে এমন সময় চিকিৎসকের কাছে যান, যখন আর চিকিৎসা কাজ করে না। তাই সময় এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
হাড়ের ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। ছোট একটি লক্ষণ অবহেলা না করে সময়মতো পরীক্ষা করানোই হতে পারে জীবন বাঁচানোর প্রধান পদক্ষেপ।
সূত্র: রেডিওপিডিয়া, জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক রিসার্চ, রেডিওগায়ান
এএমপি/এমএস