ভিডিও EN
  1. Home/
  2. সাহিত্য

শেষ পর্ব

সমুদ্র দর্শন: পাঠে ও ভ্রমণে

সাহিত্য ডেস্ক | প্রকাশিত: ০১:৩০ পিএম, ১৮ এপ্রিল ২০২৪

আমিনুল ইসলাম

আমি বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, তুরস্ক প্রভৃতি দেশের সৈকতে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের রূপ দেখেছি। তার জলে নেমে লোনা পরশ ও ঢেউয়ের ব্যঞ্জনা অনুভব করার চেষ্টা করেছি। সবক্ষেত্রেই সমুদ্রের বিশালত্ব আমাকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছে। ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা, নিউ সাউথ ওয়েলস এবং ভিক্টোরিয়া স্টেট ভ্রমণ করি। সে সময় আমি সেখানকার সমুদ্র দেখি। নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজধানী সিডনি অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জনবহুল শহর। অনেকক্ষণ যাবত আমরা সিডনির হারবার ন্যাশনাল পার্ক দেখি। প্রাকৃতিক ভাবে অপরূপ সুন্দর এই পার্ক। তাসমানিয়া সাগরের তীরে অবস্থিত এই বন্দর পার্ক। এখানে সমুদ্রের পানি অতুলনীয় ভাবে স্বচ্ছ ও নীল। আমি এমন গভীর-নীল জলরাশি একসঙ্গে এতটা এর আগে কখনো দেখিনি। প্রচুর খোলা বাতাস। বাতাস নাকি অক্সিজেনের সমুদ্র! মহাসমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে কূলে। পাথরের উঁচু পাড় তা বুক পেতে সহ্য করছে। আমার বারবার মনে পড়ছিল মান্না দের গাওয়া ‘আমি সাগরের বেলা, তুমি দুরন্ত ঢেউ বারে বারে শুধু আঘাত করিয়া যাও’ গানটি। স্বভাবতই সেখানে আমরা অনেকগুলো ছবি তুলি।

ভিক্টোরিয়া স্টেটে ভ্রমণের সময় আমরা ছিলাম মেলবোর্নে। একদিন আমরা বের হই। গ্রেট ওশান রোড। ভারত মহাসমুদ্রের পাড় ঘেঁষে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্য। তার রাজধানী মেলবোর্ন। প্রবাসী বাঙালি খন্দকার একরাম আমাদের সঙ্গী ছিলেন। মেলবোর্ন থেকে সকাল ১০টায় রওয়ানা দিই। মহাসমুদ্রের তট ঘেঁষে পাথর কেটে রোড বানানো হয়েছে। অজস্র মোড়, অসংখ্য বাঁক। একপাশে মহাসমুদ্র, অন্যপাশে পাহাড়। খাড়া পাহাড়, গাছপালায় ভরা। অন্যদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু নীল জলরাশি। হাওয়া ছিল। টেউগুলো আছড়ে পড়ছিল তীরে ও তটে। আর অজস্র শুভ্র ফেনার কারুকাজ। ড্রাইভের মাঝামাঝি গিয়ে পৌঁছি Worne নামক শহরে। তট ঘেঁষে বানানো শহর। অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অত্যন্ত বিলাসিতাপূর্ণ। প্রায় ৫ ঘণ্টার চলার পর আমাদের গাড়ি গিয়ে পৌঁছায় Twelve Apostles Marine National Park। দেবতাদের মাটির মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্র তট ঘেঁষে পাথরের কাটা অস্তিত্ব। দেবতাদের এসব মূর্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে উঠেছিল বলে লোকজনের বিশ্বাস এবং সেটাই বিস্ময়। ১২টি মূর্তি ছিল; কয়েকটি ভেঙে গেছে। ছবি তুলেছিলাম অনেক। আমরা কিছুদূরে গিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় হাঙরের মাংস ও বিফ স্টিক খাই। সেটাই ছিল দুপুরের লাঞ্চ আমাদের। এরপর সমুদ্রতীরে থান্ডার কেভ দর্শন করি। বজ্রপাতের আঘাতে পাথরের পাহাড় ভেঙে গুহার সৃষ্টি হয়েছে। এর নাম থান্ডার কেভ বা বজ্র গুহা। সেটি দেখতে ভয়ংকর সুন্দর। বিস্ময়কর তো বটেই।

ফেরার পথে ক্যাসেটে শুনেছিলাম বাংলা আধুনিক গান। সৈকতে ঘোরাঘুরি করছিলাম আর বাতাস ও ঢেউয়ের মাতামাতি অভাবনীয় সুন্দর দৃশ্য রচনা করে যাচ্ছিল আমার মুগ্ধ-বিস্মিত চোখের সামনে। আমি একসময় গেয়ে উঠেছিলাম ‘সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে তোমার কপালে ছোঁয়াবো গো, ভাবি মনে মনে’। বাংলাদেশে বসে আমার সে গান সেলফোনে কান লাগিয়ে শুনেছিল আমার ভালোবাসার মানুষ। প্রসঙ্গত একটি কথা না বললেই নয়, দেশপ্রেম, আধুনিক প্রযুক্তি, দূরদর্শিতা দিয়ে তারা সমুদ্রতটের পাহার কেটে ওশান রোডওয়ে বানিয়েছে, এটি পর্যটকদের জন্য মহা আকর্ষণের বিষয়। আর আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করতে পারিনি।

ফিলিপাইনসের বিভিন্ন রাজ্য ভ্রমণ করেছি। দেখেছি তার সমুদ্রসৈকতও। থাইল্যান্ডে পাতায়া সমুদ্রসৈকত দেখেছি। পাতায়া একটি অতি স্বল্পায়তন সমুদ্রসৈকত। এটি অনেকটা নদী বন্দরের মতো। অথচ যথাযথ পরিকল্পনার সাহায্যে থাইল্যান্ড সরকার এটিকে বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত ও উন্নীত করেছে। মালয়েশিয়া ভ্রমণের সময় সমুদ্রের জলে নেমেছি। সেটি সৈকতের জল। গভীর সমুদ্রে নৌভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ ঘটেনি। বঙ্গোপসাগর দেখেছি একাধিকবার কিন্তু প্রতিবারই সৈকতে দাঁড়িয়ে দেখেছি, জাহাজে করে গভীর সমুদ্রে যাওয়া হয়নি। আমাদের কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। প্রাকৃতিকভাবে এটি অতুলনীয় সুন্দর। যদি সেভাবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা থাকতো, তবে কক্সবাজার হতে পারতো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সমুদ্রসৈকত এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ পর্যটন কেন্দ্র। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে নিয়ে বেশ কয়েকজনের কবিতা পড়েছি আমি। কিন্তু সেগুলো সংগ্রহে নেই, মনেও নেই। আমি নিজেও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত নিয়ে একাধিক কবিতা লিখেছি।

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়েও সমুদ্র দর্শন করেছি। আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে কুয়াকাটা গিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের মনোরম শোভা দেখেছি। দেখেছি বিকেলের অলোয় ঝলমল সমুদ্রকে। রাতে সৈকতের রেস্ট হাউজে রাত্রিযাপন করেছি। জোয়ারের শব্দ, স্রােতের ছলছলানি আর ঢেউয়ের তাণ্ডবনৃত্যের গর্জন। মনে হচ্ছিল সেই গর্জনে কেঁপে উঠছে বাতাস, কেঁপে উঠছে আকাশ, কেঁপে উঠছে আমার বিছানা। সেই হুংকার শুনে মনে হচ্ছিল, সমুদ্র গ্রাস করে সব জনপদ। হয়তোবা এমন শব্দ শুনেই নজরুল লিখেছিলেন, ‘তিনভাগ গ্রাসিয়াছো, একভাগ বাকী/ সুরা নাই পাত্র হাতে কাঁপিতেছে সাকী!’

ফজরের আজান দেওয়ার সাথে সাথে বিছানা ছেড়ে সৈকতের গঙ্গামতির মোড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সমুদ্রের পানির ভেতর থেকে ধরে ধরে প্রকৃতির স্লো মোশনে উঠেছিল লাল টুকুটকে সূর্য, যেন লাল সোনার বল। সৈকতের বালুকণার ওপর সেই লাল রশ্মি পড়ে সোনার মার্বেলের মতো দেখাচ্ছিল। দৌড় দিয়েছিলাম। নেচে ছিলাম। গলা ছেড়ে গেয়েছিলাম মোহাম্মদ আবদুল জাব্বারের গাওয়া বিখ্যাত সেই ‘ও রে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’ গানটি। ভালোবাসার নারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে আনন্দ ভাগাভাগি করেছি। কিছু সময় পর জোয়ার শুরু হতে থাকে। আমি ওইদিনই ‘ভোরের কুয়াকাটায়’ শিরোনামে ৬৮ লাইনের একটি কবিতা রচনা করি। কবিতাটি পরে আমার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’তে ঠাঁই লাভ করে। কবিতাটির শেষাংশ উদ্ধৃত করছি:
‘সমুদ্রের বুক নিয়ে খেলছিল জোয়ার
বাতাস খেলছিল গাঙচিলের ডানায়
ভোরকে নিয়ে খেলছিল সোনলি গোলক;
আর এই মনটা নিয়ে জাগলারের মতো
লোফালুফি করছিল সময়।
আমার ঘাড়ে লম্বা টাওয়েল-
তবু পারলাম না বেঁধে রাখতে মনটা।

ভোরের সোনালি সূর্য, ইথারের নেটওয়ার্ক
আর জোয়ারে দুলে ওঠা সমুদ্রকে শুনিয়ে
গেয়ে উঠলাম রাঙাপৃথিবীর প্রভাতসংগীত—
ভালোবাসি-ভালোবাসি-ভালোবসি...’

সমুদ্র আমাকে মুগ্ধ করেছে নিবিড় ভাবে, বিস্মিত করেছে অনেক, তার চেয়ে বেশি দিয়েছে বৈশ্বিক ভাবনা। সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে দেখেছি—সীমাহীন দিগন্ত, বিস্তারিত জলরাশি, বিস্তৃত আকাশ। মনে হয়েছে তাদের তুলনায় কত ক্ষুদ্র আমি। কত অসহায় আমার অস্তিত্ব এদের বিশালত্ব ও শক্তির কাছে। মানুষ বিজ্ঞানের সাহায্যে আকাশ-বাতাস-সমুদ্র-পর্বত-পাহাড় জয় করেছে বটে কিন্তু সে-জয় আংশিক মাত্র। সমুদ্রের জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসকে ঠেকানোর মতো কিছুই করতে পারেনি বিজ্ঞান। মানুষ কোনোভাবেই নিজেকে আকাশের মতো বিরাট, সমুদ্রের মতো গভীর করে, পর্বতের মতো উঁচু কিংবা পাহাড়ের মতো অটল করে তুলতে পারেনি। এদের কারুর মতো উদার, দানশীল ও পরোপকারী হতে পারেনি মানুষ। এরা মহাবিশ্বে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করেছে, এদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। আর মানুষ রচে চলেছে বিভেদ ও অনৈক্য। আকাশ-বাতাস-সমুদ্র-পাহাড়-পর্বত এদের বুকে ধারণ করতে হলে মন বড় করতে হবে, বাড়াতে হবে হৃদয়ের প্রসার। বুকের ভেতর থেকে আত্মকেন্দ্রিকতার স্তুপ ও স্বার্থপরতার জঞ্জাল সরিয়ে ফেললে সেখানে হয়তোবা স্থান হয়ে যাবে আকাশ-বাতাস-সমুদ্র-পর্বত-পাহাড়-মহাবিশ্বের সবার এবং সবকিছুর।

আরেকটি কথা এই—সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণকালে হাওয়া আর ঢেউয়ের পিঠে চড়ে এসে আমার হৃদয়ে নক করেছে নবায়িত ভালোবাসা। আমি তাৎক্ষণিক ভাবে কণ্ঠে নিয়েছি ভালোবাসার গান। সমুদ্রের স্রোত আর ঢেউয়ের চূড়া স্পর্শ করে সে-গান গিয়ে পৌঁছেছে ভালোবাসার মানুষের কানে। সে-ও শুনিয়েছে ভালোবাসায় ভরা উচ্চারণ। সেই সুখকর অভিজ্ঞতা স্থায়ী আবেদনে বাঁধা পড়েছে আমার একাধিক কবিতায়। সমুদ্র আমাকে বেশি করে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, আমাকে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিয়েছে। জয়তু সমুদ্র! জয়তু ভালোবাসা! জয়তু কবিতা! অবশ্যই জয়তু জীবন!

অন্য পর্ব পড়ুন

সমুদ্র দর্শন: পাঠে ও ভ্রমণে 
পর্ব- দুই, সমুদ্র দর্শন: পাঠে ও ভ্রমণে 

এসইউ/জিকেএস

আরও পড়ুন