শোডাউন নয়, সমাধানের রাজনীতি: ১৬ বছর পর ভোটের মাঠে নতুন বাস্তবতা
দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশে আবার বড় পরিসরে ভোটের আবহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও মানুষের মানসিকতায় যে পরিবর্তন এসেছে, তা অনেক প্রার্থী এখনো ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। তারা পুরোনো কৌশল, পুরোনো ধারা আর পুরোনো প্রচারণা নিয়েই মাঠে নামছেন। অথচ বাস্তবতা হলো, ১৬ বছর আগের ভোটের রাজনীতি আর আজকের রাজনীতি এক নয়। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, তাই প্রচারণার ধরনও বদলাতে হবে।
প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি, গ্রাম আর শহরের প্রচারণা কখনোই এক রকম হতে পারে না। গ্রামীণ জনপদে এখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সরাসরি যোগাযোগ, উঠান বৈঠক, হাট-বাজারে আলাপ, মসজিদ-মাদ্রাসা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি বেশি কার্যকর। সেখানে মানুষ প্রার্থীকে দেখতে চায়, চিনতে চায়, সরাসরি কথা বলতে চায়। অন্যদিকে শহরে মানুষের জীবন দ্রুতগতির; সময় কম, ব্যস্ততা বেশি। সেখানে ডিজিটাল প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট পরিসরের মতবিনিময় সভা, পরিকল্পনাভিত্তিক বক্তব্য, এসব বেশি প্রভাব ফেলে। তাই এলাকার বাস্তবতা না বুঝে এক ধরনের শোডাউন দিয়ে সব জায়গায় ভোট পাওয়ার আশা করা এক ধরনের রাজনৈতিক সরলতা।
একসময় রাজনৈতিক মিছিল, শোডাউন, মাইকিং, ব্যানার-ফেস্টুন কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন সাধারণ মানুষের কাছে ছিল এক ধরনের বিনোদন। তখন টেলিভিশন সীমিত, ইন্টারনেট প্রায় ছিল না বললেই চলে। একঘেয়ে জীবনে এসব কর্মসূচি ছিল আলাদা আকর্ষণ। মানুষ কৌতূহল নিয়ে দেখতো, অংশ নিতো, আনন্দ পেতো। রাজনৈতিক কর্মসূচি তখন অনেকটাই উৎসবের আবহ তৈরি করতো।
কিন্তু গত দেড় দশকে প্রযুক্তির বিপ্লব মানুষের জীবনযাত্রা পুরো পাল্টে দিয়েছে। এখন প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সহজলভ্য। মানুষ খবর দেখে ফেসবুকে, ইউটিউবে বিনোদন পায়, লাইভ অনুষ্ঠান দেখে, মতামত দেয়। অর্থাৎ বিনোদন ও তথ্যের জন্য আর রাস্তায় নামার প্রয়োজন নেই। ফলে রাজনৈতিক শোডাউনের প্রতি আগের সেই আগ্রহ আর নেই। বরং মানুষ এখন এগুলোকে বাড়তি ঝামেলা হিসেবেই দেখে।
বিশেষ করে রাস্তা বন্ধ করে মিছিল বা শক্তি প্রদর্শনের সংস্কৃতি এখন উল্টো ফল দিচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার জন্য শহরের ট্রাফিক অচল হয়ে গেলে অফিসগামী মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি করে, শিক্ষার্থী পরীক্ষা মিস করে, ছোট ব্যবসায়ীর বিক্রি কমে যায়। প্রার্থীর কাছে এটি হয়তো শক্তি দেখানোর মুহূর্ত, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এটি হয় ক্ষমতার জাহির ও অসহিষ্ণুতার প্রকাশ। এই অভিজ্ঞতা ভোটারের মনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে না; বরং ক্ষোভ, বিরক্তি ও অনাস্থা তৈরি করে।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে, ভোটার এখন অনেক বেশি সচেতন ও তথ্যসমৃদ্ধ। তারা শুধু স্লোগান বা আবেগে ভাসে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের কারণে তারা দ্রুত তথ্য পায়, তুলনা করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে। ফলে ফাঁকা প্রতিশ্রুতি বা চমকদার শোডাউন দিয়ে সহজে তাদের মন জয় করা যায় না। তারা জানতে চায়, আপনি কী করবেন, কিভাবে করবেন, কত সময়ে করবেন।
একজন ভোটার এখন এলাকার বাস্তব সমস্যার সমাধান শুনতে চায়। ভাঙা রাস্তা কবে ঠিক হবে, জলাবদ্ধতা কমবে কীভাবে, বন্যা বা খাল-নদী দখল সমস্যার সমাধান কী, হাসপাতালের সেবা বাড়বে কিনা, স্কুল-কলেজের মান উন্নত হবে কীভাবে, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান কোথায়?, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত উত্তর তারা চায়। অর্থাৎ এখন রাজনীতি মানে শুধু মিছিল নয়; পরিকল্পনা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতাও।
তাই সময়ের দাবি হলোপ্রচারণার ধরণে মৌলিক পরিবর্তন আনা। বড় বড় শোডাউন কমিয়ে ছোট ছোট মতবিনিময় সভা বাড়ানো, ঘরে ঘরে গিয়ে কথা বলা, মানুষের অভিযোগ শোনা, সামাজিক মাধ্যমে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার বার্তা দেওয়া। এসবই এখন বেশি কার্যকর। মানুষকে বিরক্ত করে নয়, বরং তাদের সময় ও স্বার্থের প্রতি সম্মান দেখিয়েই আস্থা অর্জন করতে হবে।
সবশেষে কথা একটাই রাজনীতি এখন আর শক্তি প্রদর্শনের খেলা নয়, আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতা। যে প্রার্থী মানুষের কষ্ট বোঝে, সমস্যার বাস্তব সমাধান দেয় এবং দায়িত্বশীল আচরণ করে, তার পক্ষেই জনমত যাবে। তাই শোডাউনের রাজনীতি নয়, সমাধানের রাজনীতিই হোক আগামী দিনের পথ।
লেখক:
ড. মো: হাছান উদ্দীন
অধ্যাপক
ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী
[email protected]
জেএইচ/জেআইএম
সর্বশেষ - বিবিধ
- ১ শোডাউন নয়, সমাধানের রাজনীতি: ১৬ বছর পর ভোটের মাঠে নতুন বাস্তবতা
- ২ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত
- ৩ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশেষ কমিশন গঠনের প্রস্তাব
- ৪ বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশনের নতুন কমিটি
- ৫ দৌলতখানের অসহায়-দুস্থ মানুষের পাশে করিম-বানু ফাউন্ডেশন