বাংলাদেশে দারিদ্র্যমোচনে জাকাত হতে পারে প্রধানতম হাতিয়ার
আবুবকর সিদ্দীক
মো. আবুবকর সিদ্দীক
মহান আল্লাহ যেভাবে চান পৃথিবীতে সবকিছু সেভাবেই ঘটে। একজন মানব শিশু ছেলে না মেয়ে হবে, সে কেমন পরিবারে জন্ম নেবে, তার দৈহিক গঠন, সৌন্দর্য প্রভৃতি সৃষ্টিকর্তাই নির্ধারণ করেন। এসব বিষয়ে কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, হাত নেই। মানুষের মেধা, বুদ্ধি, স্বাস্থ্য, ধনসম্পদ -সবকিছুই স্রষ্টার দান। এগুলো মহান আল্লাহ যাকে খুশি তাকে দান করেন, আবার ক্ষণিকের মধ্যে কেড়েও নিতে পারেন। দারিদ্র্য বা প্রাচুর্য, ধনী বা গরিব, সুখ বা দুঃখ এরূপ সব বৈপরীত্যই মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। প্রাপ্তি বা পূর্ণতায় আল্লাহর শোকর করা এবং অপ্রাপ্তি বা অপূর্ণতায় সহিষ্ণু হওয়ায় মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
মহান আল্লাহ যাদের ধনসম্পদ দিয়েছেন তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন। কোরআন মজিদে বহু স্থানে সালাত-জাকাতের আদেশ করা হয়েছে এবং আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য অশেষ ছওয়াব, রহমত ও মাগফিরাতের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধিরও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- ‘তোমরা সালাত আদায় কর এবং জাকাত প্রদান কর। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য অগ্রে প্রেরণ করবে তা আল্লাহর নিকটে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখছেন। (সূরা বাকারা: ১১০)
কোরআন মজিদে বিভিন্ন আয়াতে জাকাত দেওয়ার নির্দেশ প্রদানের পাশাপাশি জাকাতের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। সালাত-জাকাত প্রসঙ্গে কোরআন মজিদে এতো অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে, এ দুটি ছাড়া দ্বীন ও ঈমানের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না। সালাত-জাকাতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং তার সালাত-জাকাতের বিধান প্রতিপালন ব্যতীত কোনোভাবেই মুমিন হওয়া সম্ভব নয়। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রাহ.) বলেন, ‘জাকাত শরীয়তের এমন এক অকাট্য বিধান, যে সম্পর্কে দলীল-প্রমাণের আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। জাকাত সংক্রান্ত কিছু কিছু মাসআলায় ইমামদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও মূল বিষয়ে অর্থাৎ জাকাত ফরজ হওয়া সম্পর্কে কোনো মতভেদ নেই। জাকাতের আবশ্যক হওয়ার বিধানকে যে অস্বীকার করে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়।’ (ফাতহুল বারী ৩/৩০৯)
জাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যারা তা আদায় করবে না তাদের মর্মন্তুদ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এ বিষয়ে কোরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে- ‘আর আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যা তোমাদের দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তারা যেন কিছুতেই মনে না করে যে, এটা তাদের জন্য মঙ্গল। না, এটা তাদের জন্য অমঙ্গল। যে সম্পদে তারা কৃপণতা করেছে কিয়ামতের দিন তা-ই তাদের গলায় বেড়ি হবে। আসমান ও যমীনের স্বত্ত্বাধিকার একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যা কর আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবগত। (সূরা আল ইমরান : ১৮০)
মহান আল্লাহ বিভিন্নভাবে মুমিনদের পরীক্ষা নেন। কখনও ধন দিয়ে, আবারও কখনও তা কেড়ে নিয়ে। এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। আমাদের চারপাশে এরূপ অসংখ্য নজির রয়েছে। অঢেল ধন-সম্পত্তির মালিক পথের ভিখারিতে পরিণত হয়েছে। আবার দরিদ্র-সহায় সম্বলহীন মানুষের আল্লাহর অনুগ্রহে ধনী হয়েছে। দুটি অবস্থাই আল্লাহর বরকতময় সৃষ্টি। সম্ভবত ইবাদতের দুটি বিপরীতমুখী ধারা সৃষ্টিই এর মূল রহস্য। একটি সবর অন্যটি শুকর। এ দুটির মধ্যে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উত্তম পন্থা।
দারিদ্র্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কষ্টসাধ্য। প্রকৃত মুমিন না হলে এই পরীক্ষায় সফলকাম হওয়া যায় না, বরং চরম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে মানুষ বিপদগামী হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। দারিদ্রের কারণে অনেকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করে, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয় এবং অনেক শিশু শিক্ষার আলো পায় না। অনেকে নানারূপ অশোভন কাজ ও অনৈতিক পেশায় জড়াতে বাধ্য হয়। সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সুদ, ঘুষ, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি প্রভৃতি বেড়ে গিয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। সর্বোপরি, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে ইসলামে দরিদ্র, অসহায়, গরিব, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি প্রভৃতি মানুষের দিকে সহায়তার হাত সম্প্রসারণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার স্বীকৃতি দান করা হয়েছে। জাকাতকে ফরজ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশ। এদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ বেশি মুসলমান। এদেশে জাকাত দেওয়ার মতো নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নেহায়েতই কম নয়। জাকাত নিয়ে কাজ করেন এরূপ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ কর্তৃক ২০২৩ সালে আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত একটি গবেষণা প্রবন্ধ বলছে বাংলাদেশে ২০২২ সালে যাকাত সংগ্রহের সম্ভাব্য পরিমাণ হতে পারতো ৮৪ হাজার কোটি টাকা। কোনো কোনো গবেষক এটাকে লাখ কোটি টাকা বলেও উল্লেখ করেছেন। জাকাতের এই বিশাল সম্ভাবনাকে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংগ্রহ ও বিতরণ করা সম্ভব হলো বাংলাদেশ হতে দারিদ্র্যমোচন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সম্প্রতি বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দারিদ্র্যমোচনে জাকাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা ও ধর্মমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তিনি জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
আমাদের দেশে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে আদায় করলেও সেটা পরিকল্পিত ও শরিয়তসম্মতভাবে আদায় না হওয়ায় সেই যাকাত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দারিদ্র্যমোচনে তেমন কোনো প্রভাবই রাখতে পারে না। অনেকে শাড়ি কিংবা লুঙ্গি বিতরণের মাধ্যমেই জাকাত আদায় করে থাকেন। অনেক ব্যবসায়ী জাকাতের শাড়ি বা লুঙ্গির দোকানও খুলে বসেন। কোনো কোনো সময় এই জাকাতে শাড়ি-কাপড় আনতে গিয়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটে থাকে। এভাবে জাকাত আদায় কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বাংলাদেশে সরকারিভাবে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনে একটি জাকাত তহবিল রয়েছে। এ তহবিল পরিচালনার জন্য ধর্ম বিষয়কমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, দেশের খ্যাতনামা আলেম-ওলামা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি সমন্বয়ে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি রয়েছে। এই ১৩ সদস্যের পাঁচজন আলেম-ওলামা। ১৯৮২ সালের একটি অধ্যাদেশ অনুযায়ী এই বোর্ডটি গঠিত হলেও এই বোর্ডের পরিচিতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে সমাজের একটি বড়ো অংশ এখনও সম্যক অবহিত নন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন পরিচালকের নেতৃত্বে এ জাকাত বোর্ডের প্রশাসনিক ও সাচিবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। মাঠ পর্যায়ে জাকাত তহবিলে জাকাত প্রদানে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করা কিংবা এই তহবিলের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার জন্য এই তহবিলের নিজস্ব কোনো জনবল নেই।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাঠ পর্যায়ের অফিসসমূহ একমাত্র ভরসা। এরূপ বহুবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ ৪৩ বছরেও এই তহবিলে জাকাত সংগ্রহের পরিমাণ ১০-১২ কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। অথচ দেশে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় শতকোটি টাকা জাকাত সংগ্রহ করে থাকে। সরকারি জাকাত তহবিলকে শক্তিশালী করে মাঠ পর্যায়ে বিস্তৃত করার পাশাপাশি তহবিলের কার্যক্রম, এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জনসাধারণের আস্থা অর্জন করার মাধ্যমে এ তহবিলে জাকাত সংগ্রহের পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। অধিকন্তু, দেশে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ নিয়ে কাজ করেন তাদের একটি রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের সুষ্ঠু ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থাপনা করা গেলে আগামী ৮-১০ কিংবা সর্বোচ্চ ১৫ বছরের মধ্যে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়
আরএমএম/জেএইচ