ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. জাতীয়

তফসিলের পর যেভাবে চলছে প্রশাসন

মাসুদ রানা | প্রকাশিত: ১১:০১ এএম, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শেষ দিকের প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। তফসিলের পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও ফিরছে স্থিতিশীলতা। সরকার বা প্রশাসনও চলছে প্রায় আগের মতোই। দু-একটি ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন এলেও মোটামুটি সব ধরনের কার্যক্রমই স্বাভাবিক। যদিও তফসিলের পর প্রশাসন কীভাবে চলবে- সেটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে ছিল প্রশ্ন।

তফসিলের পরও উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক, একনেক সভা, সরকারি ক্রয় ও অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা হচ্ছে। আগের আইন সংশোধন করা ছাড়াও নতুন অধ্যাদেশের কাজও থেমে নেই। প্রশাসনে প্রয়োজনীয় বদলি-পদোন্নতিও চলছে। তবে নির্বাচনি বিধি-বিধান অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা ছাড়া বদলি ও নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সরকার অন্য নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নয়। আবার আওয়ামী লীগের সময়ের মতো নির্বাচনকালীন দলীয় কোনো সরকারও নয়। ভোটে অংশ নেবেন উপদেষ্টা পরিষদের এমন সদস্যরাও ইতোমধ্যে সরে গেছেন। তাই জনকল্যাণে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে এ সরকারের কোনো বাধা নেই। তবে সরাসরি নির্বাচনকে প্রভাবিত করে বা নির্বাচনি এলাকায় সুবিধা দেওয়া সংক্রান্ত কোনো কাজ এ সরকার করবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা দেখছেন না জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারাও।

কর্মকর্তারা জানান, উন্নয়নমূলক কিছু কাজের ক্ষেত্রে কোনো কোনো কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সংশয়ে পড়ে যাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে শীর্ষ নির্বাহীদের কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন।

গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও হবে।

এখন মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দাখিল করছেন প্রার্থীরা। গত ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে এ কার্যক্রম চলবে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত।

তফসিলের পর সরকারের কার্যক্রমের বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ সরকার তফসিলের পর অধ্যাদেশ জারি, একনেক মিটিং, প্রকল্প অনুমোদনসহ সব কাজই করতে পারবে। এ সরকার তো আর দলীয় সরকার নয়। এগুলো রুটিন কাজের মধ্যেই পড়ে। দলীয় সরকার যদি হতো তাহলে হয়তো তারা প্রকল্প পাস বা এমন কাজগুলো করতে পারতো না।’

এ সরকার দুর্বল এটা কিছু মানুষ মনে করে, আমি মনে করি না তা নয়। একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে তারা হেলছে। তারপরও আমি মনে করে নির্বাচনটা সুন্দরভাবে হবে, খুব একটা অসুবিধা হবে না।- সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার

তিনি বলেন, ‘এ সরকার তো নির্দলীয়, তাই রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য কোনো দিকে পক্ষপাত না করে তারা সবকিছুই করতে পারবে বলে আমি মনে করি।’

ভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থানের বিষয়ে আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ এর তুলনায় এবার চ্যালেঞ্জটা একটু বেশি নানা কারণে। যেহেতু একটা বড় দল নির্বাচনে থাকছে না, তারা হয়তো সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করবে।’

‘এ সরকার দুর্বল এটা কিছু মানুষ মনে করে, আমি মনে করি না তা নয়। একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে তারা হেলছে। তারপরও আমি মনে করে নির্বাচনটা সুন্দরভাবে হবে, খুব একটা অসুবিধা হবে না।’ বলেন এ সাবেক সচিব।

আরও পড়ুন
তফসিলের পর মাঠপ্রশাসনে বড় রদবদলে উদ্যোগ নেবে ইসি
মাঠ প্রশাসন দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন করতে পারে দেখিয়ে দেবো
তফসিলের পর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব কার্য ইসির অধীনে রাখার দাবি
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে কতটা প্রস্তুত প্রশাসন

তফসিলের পরও নিয়মিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর গত ৩০ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠক হয়। এছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবারের নিয়মিত বৈঠক তো চলছেই। বৈঠকে অধ্যাদেশ অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। অনুমোদনের পর সেগুলোর গেজেটও জারি হচ্ছে।’

তফসিলের পর ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’, সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫, ‘বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬’ ‘বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’, ‘রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকও হচ্ছে। গত ২৩ ডিসেম্বর একনেক সভা হয়। সভায় ৪৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকার ২২ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২২টি প্রকল্পের মধ্যে নতুন প্রকল্প ১৪টি। এছাড়া সংশোধিত প্রকল্প আছে পাঁচটি এবং মেয়াদ বৃদ্ধি প্রকল্প তিনটি।

তবে কোনো নির্বাচনি এলাকার ভোটারদের সুবিধা দিতে পারে, এমন কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে—এ ধরনের কাজ ছাড়া সরকার সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে বলে আগেই জানিয়েছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, আমাদের অনেকের ধারণা- নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা হলে সব বন্ধ হয়ে যাবে—এটা হয় না, এটা ভুল ধারণা। নির্বাচন প্রত্যক্ষভাবে ইনফ্লুয়েন্স (প্রভাবিত করে), শুধু সেসব কাজ আমরা করতে পারবো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে সরকার শুধু এমন কাজগুলো করতে পারবে না। তফসিল হলেই কি আমাদের বাজেট বন্ধ থাকবে? বেতন বন্ধ থাকবে? সব প্রজেক্ট কি বন্ধ থাকবে? আসলে নির্বাচনের সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।’

আগে যেভাবে চলছিল এখনো প্রশাসন সেভাবেই চলছে। তফসিল ঘোষণার পরও মোটামুটি সব ধরনের কার্যক্রমই অব্যাহত রয়েছে। তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। তবে ভোটকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে, এমন কোনো কার্যক্রম করছি না। এ বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি।- মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে যেভাবে চলছিল এখনো প্রশাসন সেভাবেই চলছে। তফসিল ঘোষণার পরও মোটামুটি সব ধরনের কার্যক্রমই অব্যাহত রয়েছে। তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। তবে ভোটকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে, এমন কোনো কার্যক্রম করছি না। এ বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি।’

যা আছে আরপিওতে
তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন চাইলে প্রশাসনে রদবদল আনতে পারে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) বলা হয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনের ফল ঘোষণা করার ১৫ দিন পার না হওয়া পর্যন্ত বিভাগীয় কমিশনার, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) এবং তাদের অধস্তন কর্মকর্তাদের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া বদলি করা যাবে না।

নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে যদি নির্বাচন কমিশন মনে করে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বদলি করা প্রয়োজন, তারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এজন্য কমিশন লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব সে বদলি কার্যকর করতে হবে বলে আরপিওতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তফসিলের পর থেকে বিভাগীয় কমিশনার, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, ডিসি, এসপি পদে বদলি বন্ধ। নির্বাচন কমিশনও কাউকে বদলির নির্দেশনা দেয়নি।

তবে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ নির্বাহী সচিবের পদ থেকে অনেক কর্মকর্তা অবসরে যাচ্ছেন। কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে এসব পদ পূরণ করা হচ্ছে।

গত ৪ জানুয়ারি তিন কর্মকর্তা সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। পদোন্নতির পর তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস একাডেমির রেক্টর (সচিব) নিয়োগ দেওয়া হয়।

উপদেষ্টা পরিষদ
তফসিল ঘোষণার একদিন আগে গত ১০ ডিসেম্বর ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রধান উপদেষ্টার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরের দিন (১১ ডিসেম্বর) তফসিল ঘোষণার পর তাদের পদত্যাগ কার্যকর হয়।

ওইদিনই ফাঁকা হওয়া তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। বাড়তি হিসেবে এ তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও আসিফ নজরুল।

বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদে প্রধান উপদেষ্টা ছাড়া উপদেষ্টা রয়েছেন ২০ জন। প্রধান উপদেষ্টা পাঁচ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। দশজন ছাড়া বাকি সব উপদেষ্টা একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

সবশেষ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) খোদা বকশ চৌধুরী পদত্যাগ করেন।

আরএমএম/এএসএ/এমএফএ/এমএস