ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. জাতীয়

হিটওয়েভ থেকেও সুরক্ষা দেবে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশিত: ০৫:৪১ পিএম, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশে এই প্রথম একটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে, যা শুধু ঝড়–জলোচ্ছ্বাস নয়, বরং তীব্র তাপপ্রবাহ থেকেও মানুষকে সুরক্ষা দেবে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল আফতাব উদ্দিন কলেজিয়েট স্কুলে এই ‘অ্যাডাপটেশন ফোর্ট্রেস’-এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এটি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা।

ব্র্যাকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ব্র্যাকের অংশীদারত্বে এই অ্যাডাপটেশন ফোর্ট্রেসটি নির্মাণ করছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) ও কমিউনিটি জামিলের যৌথ উদ্যোগে গঠিত জামিল অবজারভেটরি ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম নেটওয়ার্ক (জামিল অবজারভেটরি ক্রুজনেট)।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাপপ্রবাহের তীব্রতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই অ্যাডাপটেশন ফোর্ট্রেসের মাধ্যমে বিদ্যমান স্কুল ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রকে রূপান্তর করা হচ্ছে, যেন তীব্র তাপপ্রবাহের সময় এটি নিরাপদ ও শীতল আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুৎ চলে গেলেও সৌরবিদ্যুৎ ও বিকল্প ব্যাটারির মাধ্যমে শীতলীকরণ ব্যবস্থা সচল থাকবে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যাবে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্রটি জলবায়ু সহনশীলতার স্থানীয় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

এই পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে পুরো অঞ্চলে এক হাজার ২৫০টি অ্যাডাপটেশন ফোর্ট্রেস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। যা প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জন্য তাপপ্রবাহে আশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এরই মধ্যে যশোর জেলার সাতবাড়িয়া হাইস্কুলে দ্বিতীয় পাইলট প্রকল্পের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। পাইলট আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে স্থানীয় জনগণের মতামত, জ্বালানি ব্যবস্থার তথ্য এবং আবহাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও অন্যান্য অঞ্চলে এই উদ্যোগ সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।

কমিউনিটি জামিলের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল লতিফ জামিল কেবিই বলেন, ‘জামিল অবজারভেটরি ক্রুজনেটের প্রথম পাইলট অ্যাডাপটেশন ফোর্ট্রেস নির্মাণ বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ভবিষ্যতে তাপজনিত দুর্যোগ আরও ঘনঘন ঘটবে এবং লাখো মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলবে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ঘূর্ণিঝড় ও তাপজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ফোর্টেসটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এখন অবকাঠামোকে অভিযোজিত করার মাধ্যমে আগামী দিনের জন্য প্রয়োজনীয় সহনশীলতা গড়ে তোলা হচ্ছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী তিন কোটিরও বেশি মানুষ ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে একাধিক ঘূর্ণিঝড়ে এসব এলাকার ঘরবাড়ি ও জীবিকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাপপ্রবাহ, যা শিক্ষা কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করছে। অ্যাডাপটেশন ফোর্ট্রেস উদ্যোগের লক্ষ্য ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র তাপ উভয় ঝুঁকি থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

জামিল অবজারভেটরি ক্রুজনেটের প্রধান গবেষক অধ্যাপক আলফাতিহ আলতাহির বলেন, ‘বাংলাদেশে গড়ে ওঠা বিস্তৃত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নেটওয়ার্ক ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রথম দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি তাপপ্রবাহ থেকে আশ্রয়ের ধারণা চালু করা হচ্ছে। এই সমন্বিত ও আগাম উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা একটি অঞ্চলের সহনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।’

জামিল অবজারভেটরি ক্রুজনেটের নির্বাহী পরিচালক ড. ডেবোরাহ ক্যাম্পবেল বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রমেই আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে এবং তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। এতে বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তীব্র তাপজনিত ঝুঁকিতে পড়ছে, যাদের অভিযোজনের সক্ষমতা সীমিত। অ্যাডাপটেশন ফোর্ট্রেস উদ্যোগটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের জন্য আশ্রয় নিশ্চিত করবে। এটি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে।’

ব্র্যাকে জামিল অবজারভেটরি ক্রুজনেটের প্রধান গবেষক ড. মো. লিয়াকত আলী বলেন, ‘বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ক্রমবর্ধমান তাপঝুঁকি মোকাবিলায় অ্যাডাপটেশন ফোর্ট্রেস উদ্যোগে জামিল অবজারভেটরি ক্রুজনেটের অংশীদার হতে পেরে ব্র্যাক গর্বিত। বিদ্যমান ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রকে বহুমুখী ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোতে রূপান্তর করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় বাস্তবতাকে মাথায় রেখে উদ্ভাবনী সমাধানের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে। এই উদ্যোগ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান শুধু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণকে সহায়তা করবে না, পাশাপাশি দেশজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ঝুঁকি নিরসন পরিকল্পনার জন্য দেওয়া হবে।’

আইএইচও/এমএমএআর/এমএস