শবে বরাতে পুরান ঢাকায় হালুয়া-রুটির চাহিদা বেশি
শবে বরাতে পুরান ঢাকায় হালুয়া-রুটির চাহিদা সবসময় বেশি থাকে/ছবি জাগো নিউজ
ঢাকার আদালতপাড়ার পাশে রায়সাহেব বাজার মোড়ে অন্যদিনের তুলনায় আজ অস্থায়ী দোকানের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিদিন সাধারণ কিছু নাশতা থাকলেও আজ চোখে পড়লো বাহারি নকশার রুটি আর সুগন্ধি হালুয়ার সমাহার।
বিকেলে ক্লাস শেষ করে বাসায় ফেরার পথে সেখানে থেমেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আল-আমিন ইসলাম। জাগো নিউজের এই প্রতিবেদককে বললেন, পবিত্র শবে বরাতকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসবে মেতেছে পুরান ঢাকা। ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি এই দিনটিকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে চলে আসা খাবারের ঐতিহ্য বজায় রাখতে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
শিক্ষার্থী আল-আমিন বলেন, এই উৎসবের আনন্দ বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে কিছু খাবার সংগ্রহ করেই বাসায় ফিরছি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশেষ করে শবে বরাতের বিকেলে পুরান ঢাকার অলিগলিতে বসে বাহারি সব হালুয়া-রুটি ও পিঠার মেলা।
বাহারি নকশা ও ভিন্ন স্বাদে পুরান ঢাকার শবে বরাত মানেই শোল মাছ বা কুমিরের নকশা করা বিশেষ বড় রুটি। তবে এর পাশাপাশি অলিগলিতে মিলছে বুটের ডাল, মুগডাল, গাজর ও সুজির নেসেস্তা হালুয়া। সঙ্গে আছে সেমাই, পায়েস ও ফিরনি।

আছে ঐতিহ্যবাহী নাশতার মধ্যে নারিকেল নাড়ু, মোয়া, তিলের খাজা এবং বিভিন্ন পদের পিঠা। আর ঝাল ও মুখরোচক খাবারের মধ্যে আছে হালিম, নান রুটি, ছোলা-ঘুগনি, ফালুদা এবং লাচ্ছি।
স্থানীয়রা বলছেন, মূলত দুপুরের পর থেকে কেনাবেচা শুরু হয়ে এই ধুম চলে গভীর রাত পর্যন্ত।
রায়সাহেব বাজারের এক দোকানি জানান, শবে বরাতের রুটি ও হালুয়ার চাহিদা সবসময় তুঙ্গে থাকে। মানুষ বিকেলে যেমন বাড়ির জন্য কিনে নিয়ে যায়, তেমনি এশার নামাজ ও বিশেষ ইবাদত শেষ করে রাত অবধি বন্ধুবান্ধব নিয়ে দোকানে বসে খাওয়ার ভিড়ও থাকে প্রচুর।
ঢাকা আদালতের সামনে স্টার হোটেলের বেকারি বিভাগেও পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন দেখা যায়। সেখানে 'বুটের হালুয়া'য় বেশি আগ্রহ সবার।
লক্ষ্মীবাজারের অস্থায়ী রুটি বিক্রেতা সোলায়মান বলেন, আমরা বছরে এই দু-একদিনই বড় বড় নকশা করা রুটি বানাই। একেকটা রুটি ৫০০ গ্রাম থেকে দুই কেজি পর্যন্ত হয়। দামও নাগালের মধ্যে ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। মানুষ শখ করে এগুলো কেনে।
পাশের আরেক দোকানের স্বত্বাধিকারী কালু মিয়া বলেন, সকাল থেকে কারিগররা একমুহূর্ত জিরোতে পারেনি। আমাদের স্পেশাল হলো গাজরের হালুয়া আর মাসকাট হালুয়া। বিকেলের মধ্যেই অর্ধেক শেষ। এখন মানুষ ইবাদতের বিরতিতে বা পরে এসে ভিড় করবে, তখন সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।
সড়কের অপরপাশেই পুরান ঢাকার পরিচিত বিউটি লাচ্চি ও ফালুদার একটি শাখা রয়েছে। সেখানে বিক্রেতা আব্দুল আজিজ বলেন, রাতে নামাজ শেষে এক বাটি গরম হালিম আর ঠান্ডা লাচ্ছির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। সারারাত দোকান খোলা থাকবে। আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি যেন কেউ খালি হাতে ফিরে না যায়।

লক্ষ্মীবাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী ফারহানা রহমানের সঙ্গে৷ তিনি জাগো নিউজকে বলেন, অফিস শেষ করে ফিরতে দেরি হয়ে গেল। ভাবলাম এখান থেকেই কিছু ফিরনি আর জিলাপি নিয়ে যাই। পুরান ঢাকার খাবারের স্বাদই আলাদা, বিশেষ করে এই উৎসবের দিনগুলোতে এখানকার ব্যস্ততা দেখতেও ভালো লাগে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদমান সাকিব বলেন, আমরা মেসে থাকি, তাই নিজেরা বানানোর সুযোগ নেই। তবে শবে বরাতের রাতে পুরান ঢাকার এই খাবারের আমেজ না নিলে অসম্পূর্ণ মনে হয়।
পরে ইসলামপুর, বংশাল, নারিন্দা, সূত্রাপুর এবং নাজিমুদ্দিন রোডের সরু গলিগুলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানে দেখা যায় অনেক স্থায়ী রেস্তোরাঁর সামনে প্যান্ডেল করে অস্থায়ী চুলা বসিয়ে তৈরি হচ্ছে গরম গরম জিলাপি ও নান।
পুরান ঢাকার নারিন্দার স্থানীয় বাসিন্দা হাজি মো. জামিল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বাপ-দাদাদের আমল থেকে দেখে আসছি, শবে বরাত মানেই বাসায় রুটি-হালুয়ার ঘ্রাণ। এখন বয়স হয়েছে, বাসায় আগের মতো সব তৈরি হয় না। তাই বংশাল থেকে বড় সাইজের মাছের নকশা করা রুটি আর বুটের ডালের হালুয়া নিতে এসেছি। নাতি-নাতনিরা এই নকশা করা রুটি দেখলে খুব খুশি হয়।
এই প্রবীণ বাসিন্দা আরও বলেন, খাবারের কেনার পাশাপাশি এই দিনে খাবার বিনিময় আমাদের একটি সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খাবার পাঠানোর রীতিও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
এমডিএএ/বিএ