সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার বিকেল: রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা
শেষ বিকেলের অস্তগামী সূর্যের নরম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজাজুড়ে। মঞ্চে তখন নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা একে একে স্ব স্ব পদের এবং গোপনীয়তার শপথ পাঠ করছেন। সব মিলিয়ে এক বিশেষ মুহূর্তের অপেক্ষার প্রহর।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, আমন্ত্রিত দেশি-বিদেশি ভিভিআইপি অতিথি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
এই শপথের মধ্য দিয়ে সংসদের খোলা প্রান্তরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। উপস্থিত সবাই বাংলাদেশের নতুন ইতিহাসের এই বিকেলের সাক্ষী হন।
স্বাধীনোত্তর দেশে রাষ্ট্রীয় শপথ অনুষ্ঠানের প্রচলিত ঠিকানা ছিল বঙ্গভবনের আঙিনা। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় শপথের মঞ্চ উঠে এসেছে জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। এটি যেন কেবল স্থান পরিবর্তন নয়, প্রতীকেরও এক নীরব পুনর্লিখন।
দুপুর গড়াতেই দক্ষিণ প্লাজা ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তার বলয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রবেশপথে কড়া তল্লাশি, সারিবদ্ধ ব্যারিকেড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক উপস্থিতি—সব কিছুই জানান দিচ্ছিল রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের এক আয়োজনের। আমন্ত্রিত অতিথিরা আমন্ত্রণপত্র দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতারা ধীরে ধীরে পূর্ণ করেন নির্ধারিত আসন।
মঞ্চের সামনে সারিবদ্ধ চেয়ারগুলো নিখুঁতভাবে সাজানো। মিডিয়ার জন্য আলাদা কর্নার, ক্যামেরা সেটআপ, লাইভ সম্প্রচারের প্রস্তুতি—প্রতিটি খুঁটিনাটিতে ছিল ব্যস্ততা, তবে কোথাও বিশৃঙ্খলা নয়; বরং সুপরিকল্পিত এক নীরব ছন্দ।
বিকেল ৪টার কিছু সময় পর দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন শপথবাক্য পাঠ করান। এর আগেই সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদ ভবনের ভেতরে শপথ নেন। সেই আনুষ্ঠানিকতার ধারাবাহিকতায় বিকেলের এই আয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের এক চূড়ান্ত মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ প্লাজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষের চোখে কৌতূহল, কারও চোখে প্রত্যাশা। কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ আলোচনা করছেন নতুন সরকারের সম্ভাব্য অগ্রাধিকার নিয়ে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হলেও আবহে ছিল জনমানুষের এক অদৃশ্য অংশগ্রহণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গভবনের পরিবর্তে সংসদ ভবনে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন নতুন সময়ের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার ভৌগোলিক রূপান্তরের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতীকবাদেরও ইঙ্গিত দেয়।
শেষ বিকেলের দক্ষিণ প্লাজা—আলো, ক্যামেরা ও প্রটোকলের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয় শপথের শব্দ, সংবিধানের প্রতি অঙ্গীকারের বাক্য। এই খোলা প্রান্তর, এই মঞ্চ, এই বিকেল—সাক্ষী হয়ে থাকবে রাষ্ট্রের ক্ষমতার আরেকটি নতুন সূচনার।
এমইউ/এমআইএইচএস/