ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. জাতীয়

‘দেউলিয়া’ বিদ্যুৎ সেক্টর সামলাতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১২:৩০ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জিতে সরকার গঠন করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তবে, দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল অংকের দেনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে নতুন সরকার বিদ্যুৎ খাতে একটা বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, রমজানের পরপরই সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে পরিকল্পনা থাকলেও সমাধান করতে বেগ পেতে হবে।

বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এ বছর এই চাহিদা সর্বোচ্চ আঠারো হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে ধারণা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে সরকারের নবনিযুক্ত বিদ্যুৎমন্ত্রী বলছেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে চাহিদা পূরণ করতে হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে জানান, অর্থ সংস্থান করে পরিস্থিতি সামাল দিতে তার ভাষায় ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনা আছে। তবে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুতে টোট্যালি ফিনান্সিয়ালি ব্যাংকরাপ্ট করে দিয়েছে আর কি। অনেক বকেয়া, অনেক দেনা-পাওনা। জ্বালানি নাই, জ্বালানি ইমপোর্ট করতে হবে। মোট কথা হলো- ভেরি কমপ্লিকেটেড। কাজ করে এগুলো সমাধান করতে হবে।

বিবিসি বাংলা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে পরিস্থিতি তাতে সংকট কাটাতে সরকারের সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ জ্বালানি আমদানি সরাসরি ডলারের মজুদে প্রভাব ফেলবে।

এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের বিশ্লেষণ এমন- নরমালি আমরা যেটা দেখি, গরম যখন পড়বে তখন দেখা যাবে যে প্রচুর লোডশেডিং হবে।

বাংলাদেশে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানি সক্ষমতা মিলিয়ে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। সারাদেশে বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে ৪ কোটি ৯৪ লাখ। দেশে একদিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে গত বছরের ২৩ জুলাই।

বিপুল পরিমাণ দেনা

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হিসেবে ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে তাদের। বেসরাকারি কোম্পানিগুলো গত সাত-আট মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পায়নি।

এত বকেয়া কীভাবে জমলো এ প্রশ্নে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এটা বেড়েছে। ফ্রম দ্য বিগিনিং, কিউমিলিটিভ হারে হতে হতে এ অবস্থায় এসেছে। আমরা যেটা পাচ্ছি সরকারের থেকে সাবসাইডি সেটা মাইনাস হচ্ছে। এভাবে হতে হতে এ পর্যায়ে আছে। এর মধ্যে আরও কিছু মাইনাস হবে। আমরা সরকার থেকে আরও কিছু টাকা পাবো সাবসাইডি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পিডিবির বকেয়া এক পর্যায়ে তিন মাসে নেমে এসেছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে আর কোনো বিল পরিশোধ করেনি বলেও জানান বেসরকারি উদ্যোক্তারা।

তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি নতুন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে কি না সে সন্দেহের কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

তবে সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেছেন, টাকার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের ওপর নির্ভর করে, এখানে ইচ্ছাকৃত বকেয়া রাখার কোনো ইস্যু নেই। সরকারের শেষ পর্যায়ে ২ হাজার কোটি টাকা ছাড় করার একটা ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, অর্থ পরিশোধ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সক্ষমতা ওপর নির্ভর করে। রেভিনিউ সংকটের কারণেই তারা বিল পরিশোধ করতে পারেনি। কোনো ইনটেনশনাল কিছু নেই। এটা টাকার অ্যাভেইলেবিলিটির ওপর নির্ভর করে। বিপিডিবি যখন টাকা পায় তখন দেয়। ওদের সোর্স হচ্ছে রেভিনিউ এবং অর্থবিভাগ থেকে ভর্তুকি।

সরকার অতিসত্বর বকেয়া পরিশোধ শুরু না করলে গরমে চাহিদা মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন হবে বলে উল্লেখ করেছে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সংগঠন বিপপা। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বলছে, বিলের বকেয়া কমিয়ে চার-পাঁচ মাসে না আনলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়বে। এসব কোম্পানি নিজেরাই অধিকাংশ তেল আমদানি করে। এলসি খোলার পর ৪০-৪৫ দিন লেগে যায় আমদানি করা তেল দেশে আসতে। তাই দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে গরমে লোডশেডিং বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা জানিয়েছেন বেসরকারি উৎপাদনকারীরা।

বিপপার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলসি খুলতে সমস্যার কারণে এরই মধ্যে তেলের নিট মজুদ কমেছে। গত জানুয়ারিতে যে মজুদ এক লাখ মেট্রিক টনের বেশি ছিল, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এসে নিট মজুদ আশি হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, পিডিবি বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে সময়মতো বিদ্যুৎ দিতে না পারায় চুক্তি অনুযায়ী এলডি বা লিকুইডিটি ড্যামেজ ধার্য করেছে। তবে এটি নিয়েও আপত্তি তুলেছে বেসরকরি উৎপাদনকারীরা।

পিডিবির চেয়ারম্যান বিবিসি বাংলাকে অমিমাংসিত এলডি ইস্যুর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, তাদের সঙ্গে আমাদের কিছু ইস্যু আছে। সেগুলি কী হয় দেখি। তারপর এটা ফাইনালি কমেন্ট করা যাবে।

জ্বালানি সংকট

বাংলাদেশে মোট সক্ষমতার ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস, কয়লা এবং তেলের ব্যবহার হয়। এই জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হয়। এছাড়া তেল ও কয়লা প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, এখন থেকে এক মাস পরে মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আমরা যদি মনে করি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করবো, এলএনজি ইমপোর্ট করবো এবং কয়লা আমদানি করবো। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এটার জন্য যতটুক খরচা হবে, যতটা ডলার লাগবে সেটা কি দেওয়া হবে কি না। আমাদের যা লাগবে সব ইমপোর্ট করবো নাকি ডলার সেইভ করার চেষ্টা করবো এটা সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এখন সরকার কীভাবে খেলবে তার ওপর নির্ভর করবে। অর্থ সংস্থানের জন্য বিদেশি দাতা সহায়তাও লাগবে, আবার সরাসরি বিনিয়োগেরও প্রয়োজন হবে।

সমাধান কীভাবে

এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, আমরা হিসেব করে দেখেছি যে, গত বছরে কয়লার যে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো বাৎসরিক ৫৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে চলেছে, কিন্তু এগুলো চলা উচিৎ ৮৫ শতাংশ হারে। তার মানে আরও এতখানি বেশি বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করতে পারতাম কয়লা দিয়ে। বাট কয়লা ইমপোর্ট করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলা হচ্ছে প্রধান।

ইজাজ হোসেন মনে করেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনের ব্যাপারে ভর্তুকির নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতে পারে অর্থ মন্ত্রণালয়।

তার বক্তব্য- আমি মনে করি এটার ব্যাপারেও একটা রেস্ট্রিকশন দেবে ফাইন্যান্স মিনিস্টার। এই রেস্ট্রিকশন কিন্তু আওয়ামী লীগ আমল থেকে আরম্ভ হয়েছে। তখন তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালাতো আবার ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি পিডিবিকে বলে দিতে তোমরা এত বেশি তেলে খরচা করতে পারবে না। আমার ধারণা এটা এবারও আসবে। তা না হলে তো ভর্তুকি সাংঘাতিক হয়ে যাবে। অলরেডি আমাদের প্রতি কিলোওয়াট আওয়ারে সাড়ে চার টাকা করে আমরা সাবসাইডি পাচ্ছি। গত বছরও আমরা দেখেছি যে, প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ছিল। এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকার যেটা করেছে যে, তারা ফুল ইমপোর্ট করেনি। তারা ইন্ডাস্ট্রির এনার্জি ডিমান্ডের কোনো তোয়াক্কাই করেনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভর্তুকির চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বহুমাত্রিক কৌশল নিতে হবে। যার মধ্যে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, তেলভিত্তিক কেন্দ্র কমিয়ে আনা, লোডশেডিং সমন্বয় করার মতো পদক্ষেপ থাকতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতে দেনা পরিশোধ এবং জ্বালানি সংকট নিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলছেন, আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে সরকার।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, এখন প্রায়োরিটি রোজার মধ্যে বিদ্যুৎ চালানো, সেচের সময় বিদ্যুৎ চালানো। মানুষের কষ্ট যেন কম হয় সেটার জন্য চেষ্টা করবো আর কি। কয়লা আনতে হবে। এলপিজি, এলএনজি আনতে হবে। এদিকে পাহাড় পরিমাণে বাকি করে গেছে, বকেয়া করে গেছে। এই সব মিলিয়ে ফিন্যান্সিয়াল একটা চ্যালেঞ্জ আছে বড়।

তিনি আরও জানান, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্ট্যান্ডবাই থাকবে। ইমার্জেন্সি হলে চালাবো। যেগুলো বকেয়া আছে তাদের কিছুটা দিয়ে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো চালু রাখা। তারপরে বসে লংটার্ম চিন্তা-ভাবনা করা। সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মতো হতে পারে। এটার ব্যবস্থা আছে, গ্যাসের শর্ট আছে। ওটা পূরণ করার ব্যবস্থা করছি।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

এএমএ/জেআইএম