ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. জাতীয়

হালিশহরে বিস্ফোরণ

চট্টগ্রামের অগ্নিনিরাপত্তা ও দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন

মো. রফিক হায়দার | প্রকাশিত: ০৯:১৬ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের একটি বাসায় গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে। আহত বাকি চারজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। তবে বিস্ফোরণের কারণ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এদিকে এ ঘটনার পর নগরীর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিস্ফোরণের কারণ এখনো অজানা

ঘটনার পর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটির চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, প্রথমে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের সন্দেহ করা হলেও বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

jagonews24.com/mediaগ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় পুড়ে যাওয়া আসবাব/ছবি: জাগো নিউজ

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা গেছে, রান্নাঘর ও গ্যাসের চুলা প্রায় অক্ষত রয়েছে। ডাইনিং টেবিলের থালাবাসনও নড়েনি। তবে শোয়ার ঘর ও পাশের বারান্দা আগুনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা শামিমা তমা বলেন, গ্যাস বিস্ফোরণ হলে রান্নাঘরের ক্ষতি বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে অন্য কক্ষগুলো বেশি পুড়ে গেছে। বিষয়টি বিস্তারিত তদন্ত হওয়া উচিত।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের ভবন কেঁপে ওঠে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

ভবনে ছিল না অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা

বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবনটিতে কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। একই ভবনে দুই মাস আগে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শামিমা তমা বলেন, বিস্ফোরণের পর বাসিন্দারা নিজেদের মতো করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ভবনে কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল না। মানুষ আতঙ্কে দৌড়াচ্ছিল।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত কোনো সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি। ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

jagonews24.comগ্যাস বিস্ফোরণে ক্ষয়ক্ষতি/ছবি: জাগো নিউজ

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক জসিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আগুন লাগলে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে গড়িয়ে পড়লে ক্ষয়ক্ষতি কম হতে পারে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

চট্টগ্রামে বার্ন চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা

হালিশহরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি চট্টগ্রামে বার্ন চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে। দগ্ধদের প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫০ শয্যার বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা সুবিধা না থাকায় গুরুতর আহতদের ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যাপক রফিকুল মাওলা বলেন, শরীরের ৪০ শতাংশের বেশি দগ্ধ হলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। গুরুতর রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অন্য শহরে নেওয়া হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।

চট্টগ্রামে ১৫০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট নির্মাণাধীন রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এটি চালু হতে পারে।

পুড়ে যাওয়া ভবনে সরেজমিনে ঘুরে যা দেখা গেলো

পুড়ে যাওয়া ফ্ল্যাটে ঢুকতেই চোখে পড়ে ধ্বংসস্তূপের স্তব্ধতা। লাখ টাকা দামের খাটটি আর খাট নেই, শুধু কালচে অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই ড্রেসিং টেবিলটি আগুনে ঝলসে বিকৃত হয়ে গেছে। রান্নাঘরের আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, সবই পোড়া ও এলোমেলো।

jagonews24.comগ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় পুড়ে যাওয়া আসবাব/ছবি: জাগো নিউজ

ডাইনিং রুমে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটি ফ্রিজ। বাইরের কাঠামো টিকে থাকলেও ভেতরের অংশ পুড়ে গেছে। পানির ফিল্টারটিও পুড়ে গেছে। তবে পড়ার টেবিলের ওপর রাখা কিছু বই প্রায় অক্ষত অবস্থায় দেখা গেছে।

ড্রয়িংরুমে সোফার শুধু কাঠামো আছে, কুশন ও কাপড় ছাই হয়ে গেছে। বেডরুমের বিছানা সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই। কোণায় পড়ে আছে আগুনে পুড়ে যাওয়া শিশুর স্কুলে যাওয়ার সাইকেল। ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকলে মনে হয়, যেন কোনো পোড়া শহরের ধ্বংসাবশেষ।

ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৪টার দিকে হালিশহরের এইচ ব্লকের এসি মসজিদের কাছে ছয়তলা হালিমা মঞ্জিল ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একই পরিবারের নারী ও শিশুসহ মোট নয়জন দগ্ধ হন।

দগ্ধদের মধ্যে পাখি বেগম উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান। শিশু জান্নাতুল ফেরদৌস শরীরের প্রায় পুরো অংশ দগ্ধ হয়ে মারা যায়। সমীর আহমেদ সুমন (৪০) রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) মারা যান। পরে আরও দুজনের মৃত্যু হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচে দাঁড়িয়েছে।

jagonews24.comগ্যাস বিস্ফোরণে ক্ষয়ক্ষতি/ছবি: জাগো নিউজ

চিকিৎসকরা জানান, আহতদের মধ্যে দুজনের শরীরের ১০০ শতাংশ, একজনের ৮০ শতাংশ, একজনের ৪৫ শতাংশ এবং অন্যদের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

আহতদের দেখতে মন্ত্রীদের পরিদর্শন

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে গিয়ে আহতদের খোঁজ নেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। গ্যাস লিকেজ ও ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহারের মতো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

এমআরএএইচ/এমএমকে