জানুয়ারিতে দেশে ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে: আসক
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্ত সহিংসতা এবং সাংবাদিক হেনস্থাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জানুয়ারিতে ৩১টি পারিবারিক পরিবেশে চালানো সহিংসতা, ৩৫টি ধর্ষণের, ২টি যৌন হেনস্থার এবং ৬টি কন্যা বিবাহ ও দাম্পত্য বিষয়ক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ‘বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি: জানুয়ারি ২০২৬’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদনটিতে নারী নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী দেখা গেছে, গৃহহিংসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (৩১), যা পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার প্রমাণ। ধর্ষণের ৩৫টি ঘটনা এবং যৌন হেনস্থার ২টি ঘটনা নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি, যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতার ঘটনা ৬টি এবং গৃহকর্মী নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনা ১টি। আশার কথা হলো, অ্যাসিড হামলার কোনো ঘটনা জানুয়ারি মাসে ঘটেনি।
শিশু নির্যাতনেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। জানুয়ারি মাসে শিশুদের ওপর সহিংসতার ৩৫টি ঘটনা ঘটেছে এবং শিশু হত্যার ঘটনা ২৫টি হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। এটি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের নিরাপত্তা সংকটে থাকার চিত্র তুলে ধরে।
সীমান্তে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। সীমান্তে বিএসএফের সহিংসতায় ১ জন নিহত হয়েছেন। জেল হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ১৬টি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে মৃত্যুর ঘটনা ৪টি নথিভুক্ত হয়েছে। তবে জানুয়ারি মাসে বলা হয়েছে কোনো অনৈতিকভাবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
সংবাদকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হেনস্থা ১৬টি ঘটনার মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রকাশের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। মব লিঞ্চিং বা গণরোষের ফলে ১৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় ১১টি মৃত্যু এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার ঘটনা ১৪টি নথিভুক্ত হয়েছে, যা দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার গভীরতা প্রমাণ করে।
যোগাযোগ করা হলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ডকুমেন্টেশন ইউনিট জাগো নিউজকে বলেন, এই পরিসংখ্যানগুলি দেশের শীর্ষ দশটি জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং সংস্থার নিজস্ব উৎসের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। সংস্থা এই তথ্য ব্যবহার করে সরকারের কাছে সুপারিশ করছে, যেন নারীর নিরাপত্তা, শিশুর সুরক্ষা এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা যায়।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, সাধারণ জনগণ ও সংস্থা-মাধ্যমগুলোকে এই বিষয়ে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। যে কোনো ধরনের হিংসা, নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দ্রুত প্রতিরোধ ও বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
নারী ও শিশু ধর্ষণের পরিসংখ্যান ও বাস্তবচিত্র
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে মোট ৩৫ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন । এই পরিসংখ্যানটি ১০টি প্রধান জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, তাদের ই-পেপার এবং বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে সংগ্রহ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। মোট আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ জন একক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ১০ জন দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ বছর বা তার কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে; যেখানে ৬ বছরের নিচে ২ জন এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ১১ জন শিশু এই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৩ জন, ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২ জন, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২ জন এবং ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে ২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
আর ১৩ জন ভুক্তভোগীর বয়স সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই সহিংসতার পরিণতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। তথ্যানুযায়ী, ধর্ষণের পর ২ জন ভুক্তভোগীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ১ জন ভুক্তভোগী ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন । এছাড়া আরও ৮ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মোট ৩৫টি ঘটনার মধ্যে ২৮টি ঘটনায় মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়েছে, তবে ৫টি ঘটনার ক্ষেত্রে মামলা দায়ের সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংস্থাটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, এই তথ্যগুলো নির্দেশ করেছে সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বিচারহীনতা বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেক তথ্য অগোচরেই থেকে যাচ্ছে।
এমডিএএ/এএমএ