শিল্পকলা একাডেমিতে স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ দাবি
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয় শুক্রবার (৬ মার্চ)
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ অন্তর্ভুক্তির দাবিতে প্রতিবাদী আবৃত্তি ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন আবৃত্তিশিল্পীরা। তারা বলেন, সম্প্রতি সংশোধিত অধ্যাদেশে শিল্পকলা একাডেমির বিভাগ সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আবৃত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যমকে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য হতাশাজনক।
শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের এস রহমান হলে ‘বাংলাদেশ আবৃত্তিশিল্প রক্ষা কণ্ঠ সংগঠনের’ ব্যানারে শিল্পকলা একাডেমিতে স্বতন্ত্র ‘আবৃত্তি বিভাগ’ অর্ন্তভুক্তির দাবিতে প্রতিবাদী আবৃত্তি ও সংবাদ সম্মেলন করেন আবৃত্তিশিল্পীরা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সম্প্রতি জারি হওয়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬–এ একাডেমির বিভাগ সংখ্যা ৬ থেকে বাড়িয়ে ৯টি করা হয়েছে। নতুন করে আলোকচিত্র, পারফর্মিং আর্টস, নিউ মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডিংসহ বিভিন্ন বিভাগ যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগকে আলাদা করে দুটি বিভাগ করা হয়েছে এবং ‘সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগ’ ভেঙে সংগীত ও নৃত্যভিত্তিক পৃথক বিভাগ গঠন করা হয়েছে। তবে পুরো অধ্যাদেশে কোথাও ‘আবৃত্তি’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় আবৃত্তিশিল্পীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, আবৃত্তি কেবল কবিতা পাঠ নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র বাচিক শিল্প, যা সাহিত্যকে শ্রুতিমাধুর্যের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। প্রাচীন গ্রিস ও রোমান সভ্যতায় বাগ্মিতা ও কবিতা আবৃত্তি ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলা সংস্কৃতিতেও পুঁথিপাঠ, কবিগান ও লোকজ ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে আবৃত্তির চর্চা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আবৃত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে প্রতিবাদ, চেতনা ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মধ্যে। আবৃত্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রমিত ও শুদ্ধ উচ্চারণ, যা বাংলা ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, বর্তমানে দেশে পাঁচ শতাধিক আবৃত্তি সংগঠন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এসব সংগঠন নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করে এবং প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক নতুন শিক্ষার্থী আবৃত্তি চর্চায় যুক্ত হচ্ছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলোতেও আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। ফলে দেশে আবৃত্তিশিল্পী ও আবৃত্তিপ্রেমীর সংখ্যা কয়েক কোটি বলে দাবি করেন বক্তারা।
বক্তাদের মতে, ডিজিটাল যুগে আবৃত্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। অডিও বুক, পডকাস্ট ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কণ্ঠনির্ভর কনটেন্টের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে আবৃত্তিশিল্পীরা নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র পাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পাবলিক স্পিকিং ও রিসাইটেশন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সংশোধিত অধ্যাদেশের ৭ ধারায় জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও নতুন সাংস্কৃতিক ধারাকে ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ৮ ধারায় সরকারের অনুমোদনক্রমে নতুন বিভাগ সৃষ্টির সুযোগও রয়েছে। তাই আবৃত্তিশিল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় শিল্পকলা একাডেমিতে স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ গঠন আইনগতভাবেও সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে আবৃত্তিশিল্পীরা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে একাডেমিতে স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে এ দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংস্কৃতি মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আবৃত্তিপ্রেমীদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়েন বাংলাদেশ আবৃত্তিশিল্প রক্ষা কণ্ঠ সংগঠনের পক্ষে জেরিন মিলি। তিনি বলেন, স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ গঠন করা হলে দেশের লক্ষ লক্ষ আবৃত্তিশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে এবং জাতীয় সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হবে। এ সময় আবৃত্তিশিল্পীদের সাথে সংহতি জানিয়েছেন কবি- প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, প্রকাশক, নাট্য শিল্পী, সংগীত শিল্পী ও নৃত্য শিল্পীসহ একাধিক পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। বিশিষ্টজনদের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে নাট্যশিল্পীদের পক্ষে চট্টগ্রাম গ্রুপ থিয়েটার ফোরামের সভাপতি খালেদ হেলাল বলেন, নাট্যশিল্প ও অভিনয়ে সঠিক উচ্চারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার দক্ষতা একজন শিল্পীকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায়, আর সেই ভাষা ও উচ্চারণের চর্চায় আবৃত্তিশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শিল্পকলা একাডেমিতে স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ গঠনের দাবি যৌক্তিক বলে উল্লেখ করে তিনি দ্রুত এ বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। কবি ও সাহিত্যিকদের পক্ষে কবি ইউসুফ মুহাম্মদ বলেন, কবিতা ও সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো আবৃত্তি। তাই আবৃত্তিশিল্পের যথাযথ বিকাশের জন্য শিল্পকলা একাডেমিতে স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ চালু করা সময়ের দাবি। বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশনা পরিষদের সভাপতি মো. সাহাব উদ্দিন বাবু বলেন, আবৃত্তি বিভাগকে বাদ দেওয়া বাংলা ভাষার চর্চা ও বিকাশের জন্য উদ্বেগজনক। যে শিল্প ভাষা ও উচ্চারণকে কেন্দ্র করে কাজ করে, সেই শিল্পের নামটিই যদি শিল্পকলা একাডেমির অধ্যাদেশে না থাকে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি দ্রুত সংশোধনের মাধ্যমে আবৃত্তি বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। সংগীতশিল্পীদের পক্ষে বাংলাদেশ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সংস্থার সভাপতি লাকী দাশ বলেন, প্রতিটি শিল্পই একে অপরের পরিপূরক। আবৃত্তি একটি বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। তাই এটিকে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবির সঙ্গে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করেন। এ সময় আবৃত্তি সংগঠক মিশফাক রাসেলও বক্তব্য রাখেন।
সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন আবৃত্তিশিল্পী নাজমুল আলিম সাদেকী। অনুষ্ঠানে প্রতিবাদী আবৃত্তি পরিবেশন করেন নতুন কুঁড়ি চ্যাম্পিয়ন সাবিলা সুলতান বানী ও আবৃত্তিশিল্পী এটিএম সাইফুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন আবৃত্তিশিল্পী দেবাশীষ রুদ্র, সেলিম রেজা সাগর, বিশ্বজিৎ পালসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন আবৃত্তি সংগঠনের দলপ্রধান ও শিল্পীরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আবৃত্তিশিল্প রক্ষা কণ্ঠের অন্যতম সংগঠক সাইদুর রহমান সবুজ ও শারমীন রীমা। উপস্থিত সবাই আবৃত্তিশিল্পকে শিল্পকলা একাডেমিতে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
এমডিআইএইচ/এসএনআর