অনলাইনে মানুষের কঙ্কাল বিক্রি, জড়িত ডেন্টালের দুই ছাত্র: ডিএমপি
কঙ্কাল বিক্রি চক্রের সঙ্গে জড়িত গ্রেফতার চারজন
রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে মানুষের ৪৭টি মাথার খুলি ও বিপুল পরিমাণ হাড়-কঙ্কাল উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগ। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, গ্রেফতার চারজনের মধ্যে দুজন সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্র। গ্রেফতারের সময় ক্যাম্পাসের হোস্টেলের একটি নম্বর রুম থেকে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় ও বিভিন্ন ব্যাগ-বস্তা থেকে ৪৪টি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। মূলত কঙ্কালগুলো তারা ক্রেতাদের কাছ অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করতেন বলেও পুলিশ জানায়।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান এসব তথ্য জানান।
গ্রেফতাররা হলেন- কাজী জহরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক (২৫), মো. আবুল কালাম (৩৯), আসাদুল মুন্সী ওরফে জসিম ওরফে এরশাদ (৩২), মো. ফয়সাল আহম্মেদ (২৬)। তাদের হেফাজত থেকে বিভিন্ন প্লাস্টিকের বাজারের ব্যাগের মধ্যে রক্ষিত অবস্থায় ৪৭টি মাথার খুলিসহ মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে কাজী জহরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক ও মো. ফয়সাল আহম্মেদ ওই ডেন্টাল কলেজের ছাত্র।
ইবনে মিজান বলেন, আমাদের তেজগাঁও থানার অভিযানিক দল ৯ মার্চ রাতে বিশেষ অভিযানের প্রস্তুতিকালে জানতে পারে মনিপুরী পাড়ার একটি জায়গায় যেখানে অবৈধভাবে উত্তোলিত প্রসেস করা কঙ্কাল বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে। পরে আমাদের অভিযানিক দল সেখানে যায় এবং একজন ব্যক্তির সন্দেহজনক আচরণ পরিলক্ষিত হয়। তারপর সেই ব্যক্তিকে যখন চ্যালেঞ্জ করে তার কাছ থেকে আমরা একটি মানব কঙ্কালের ফুল বডি খুঁজে পাই। পরে আটকের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন তিনি প্রাথমিকভাবে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।

‘তার সঙ্গে অনেকেই জড়িত। তিনি জানান, তাদের আরও দুজন তেজগাঁও কলেজের সামনে মানব কঙ্কালসহ অবস্থান করছেন। তখন আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আরেকটি টিমকে ওখানে পাঠাই। সেখানে আমরা আরও দুজনকে পাই। প্রথম ব্যক্তি যাকে পেলাম তার নাম কাজী জহুর ইসলাম ওরফে সৌমিক। উনি সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্র। এরপর যে দুজনকে পাই ওনারা স্টুডেন্ট না। একজনের নাম আবুল কালাম আজাদ (৩৯), আরেকজনের নাম হচ্ছে আসাদুল মুন্সি (৩২)। এই দুজনের কাছেও আমরা দুটি কঙ্কাল পেয়েছি। এই তিনজনকে আমরা থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি। আমরা তখন বুঝলাম যে, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র এবং তারা এটি দেশব্যাপী পরিচালনা করে আসছে।’
আরও পড়ুন
ঢাকায় ৪৭টি মাথার খুলি, হাড়-কঙ্কাল উদ্ধার, গ্রেফতার ৪
লঞ্চের কেবিনে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেফতার ২
ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, আমরা থানায় ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করার পর একপর্যায়ে তারা স্বীকার করেন যে এই তিনটি কঙ্কালের বাইরেও তাদের কাছে আরও অনেক কঙ্কাল রয়েছে একটি জায়গায়। সেটি হচ্ছে উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের হোস্টেল।
তিনি বলেন, আমরা তাৎক্ষণিক রাতেই টিম পাঠাই। সেখানে গিয়ে আমাদের টিম একটি রুমে আরও ৪৪টি বডি পায়। ক্যাম্পাসের হোস্টেলের ৪০২ নম্বর রুমে ছড়ানো-ছিটানে অবস্থায় ও বিভিন্ন ব্যাগ, বস্তা ভর্তি করে কঙ্কালগুলো রাখা হয়েছিল। আমরা টোটাল ৪৭টি কঙ্কাল জব্দ করি। পরে আমরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করি।
জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, তাদের যে মূলহোতা ফয়সাল তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। অনলাইনে তার ‘বোন সেলিং’ নামে একটি গ্রুপ আছে। এই গ্রুপে তার ৭০০ জন কর্মী কাজ করে এবং গ্রুপ মেম্বার ২০ হাজারের মতো। আমরা তেজগাঁও কলেজের সামনে থেকে যে আবুল কালাম আজাদকে পেয়েছিলাম তার নামে ২১টি মামলা রয়েছে। ২০০৯ সালে তার নামে প্রথম যে মামলাটি হয়েছিল সেটা আজ তার নামে কবর থেকে সন্তান চুরির যে ধারায় মামলা হয়েছে, এই একই অভিযোগে অভিযুক্ত। এই কঙ্কাল চুরি, ডাকাতির প্রস্তুতি, মাদকসহ আরও অন্যান্য ধারায় তার নামে মোট ২১টি মামলা রয়েছে। আর তেজগাঁও কলেজের সামনে আসাদুলকে পেয়েছিলাম, তার নামে আমরা দুটি মামলা পেয়েছি, ডাকাতির প্রস্তুতি এবং চুরির মামলা। তাছাড়া যে স্টুডেন্ট দুজনকে আমরা পেলাম তারা আমাদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, মানবদেহের কঙ্কাল বিক্রির এই কাজের সঙ্গে তারা যুক্ত। তারা আমাদের কাছে স্বীকার করেছেন কেউ ৫০টি, কেউ ২০-২৫টি কঙ্কাল এ পর্যন্ত বিক্রি করেছেন।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা আমাদের কাছে স্বীকার করেছেন যে তাদের সঙ্গে আরও অনেকেই রয়েছে, যারা কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে। মূলত চক্রটি গাজীপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর এই বেল্টে কাজ করে। আমরা রিমান্ডে নিয়ে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করবো এবং এই চক্রে আরও যারা রয়েছে তাদের আইন আনার চেষ্টা করবো।
গ্রেফতার মেডিকেল শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা প্রাথমিকভাবে এই কঙ্কালগুলো ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় কিনে পরে ১৫-২০ হাজার টাকায় বিক্রি করের। তারা যে কঙ্কাল বিক্রি করেন এটা তাদের ক্যাম্পাসের অনেকেই জানে। যখন কেউ কঙ্কাল কিনতে আসে বা অনলাইনে বুকিং দেয়, তাদের নির্দিষ্ট সময় দেয় এবং তাদের কাছে কঙ্কাল বিক্রি করে। তাদের কাস্টমার হচ্ছে বেশিরভাগ মেডিকেল স্টুডেন্ট। আরও অন্যান্য চক্র আছে যারা কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে। এই প্রসেসের সঙ্গে গ্রেফতার চারজনই ইনভলভ।
মানব কঙ্কাল সংগ্রহ ও প্রসেস সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি লাশ কবরস্থ হওয়ার পর এরা অবজার্ভ করে। আর এক বছর পর এটা উত্তোলনের চেষ্টা করে। তবে আমাদের যে কবরস্থানগুলো বেশি সুরক্ষিত সেখানে কিন্তু তারা এই কাজগুলো করতে পারে না। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কবরস্থান দেখা যায়, ১০-২০টি থেকে ৫০টি কবর থাকে, যেটা অরক্ষিত, পাহারাদার থাকে না, সিসি ক্যামেরা থাকে না, লোকজনের যাতায়াত কম, সেসব জায়গায় তারা টার্গেট করে। পরে তাদের যে এজেন্ট আছে অথবা তাদের যে লোক বলা আছে, তাদের দিয়ে কঙ্কালগুলো সংগ্রহ করে। সেটা কেমিক্যালের মাধ্যমে প্রসেস করে তারপর তারা ফিটিং করে।
তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের আদালতে প্রেরণ করা হবে বলেও জানান ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান।
কেআর/ইএ
সর্বশেষ - জাতীয়
- ১ চুয়াডাঙ্গা ও হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারকে বদলি
- ২ নারীর সম্পত্তির পূর্ণ অংশ নিশ্চিতে বিকল্প আইনি পথ খোঁজার আহ্বান
- ৩ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় পরিকল্পনা প্রণয়নে ৭ মন্ত্রীকে নিয়ে কমিটি
- ৪ অনলাইনে মানুষের কঙ্কাল বিক্রি, জড়িত ডেন্টালের দুই ছাত্র: ডিএমপি
- ৫ জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বেগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যাবে: প্রতিমন্ত্রী