আকাশপথে যাত্রায় স্বস্তি, খরচে ‘অস্বস্তি’
টিকিটের দামে কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও যাত্রায় স্বস্তি
লম্বা ছুটি নিয়ে শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। সড়ক, রেলপথের পাশাপাশি আকাশপথেও যাত্রীর চাপ। ঈদের আগে এয়ারলাইন্সগুলোর অভ্যন্তরীণ রুট সৈয়দপুর, যশোর ও রাজশাহীর টিকিটের চাহিদা বেশি, কম কক্সবাজারের। তবে ঈদের পর টানা এক সপ্তাহ কক্সবাজারে টিকিটের চাহিদা কয়েকগুণ বেশি। যাত্রায় স্বস্তি থাকলেও টিকিটের দামে রয়েছে কিছুটা অস্বস্তি।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২১ মার্চ দেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হতে পারে। সম্ভাব্য এই তারিখ ধরে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) পবিত্র শবে কদরের ছুটি মিলিয়ে এবারের ঈদে টানা সাতদিনের ছুটি পেয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। একইভাবে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও শুরু হয়েছে ছুটি।
লম্বা ছুটি হওয়ায় এবার ঈদযাত্রা তুলনামূলক স্বস্তির। টিকিটের দাম, প্রাপ্তি প্রভৃতি নিয়ে ভোগান্তি থাকলেও যানজট এবার এখনো কম। ভোগান্তি এড়াতে ক্রমেই আকাশপথে বাড়ি ফেরার প্রবণতা বাড়ছে বাংলাদেশে। এজন্য অনেক যাত্রী মাসখানেক আগেই টিকিট কেটে রাখেন। যদিও এখন অধিকাংশ এয়ারলাইন্স ঈদযাত্রার প্রায় শতভাগ টিকিট বিক্রি শেষ করেছে। অর্থাৎ, মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) থেকে আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোতে আসন ফাঁকা নেই বললেই চলে। অতিরিক্ত চাপ থাকায় ভাড়াও বেড়েছে কয়েকগুণ।
এখন রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজ সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এয়ারলাইন্সগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, সৈয়দপুর, রাজশাহী, যশোর, বরিশালে দিনে প্রায় সাত হাজার যাত্রী বহন করে।
রমজানের আগ থেকেই সৈয়দপুর, যশোর ও রাজশাহীর টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। ঈদের সপ্তাহখানেক আগেই সৈয়দপুর, যশোর ও রাজশাহীগামী সব ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি প্রায় শেষ। আবার ঈদের পর কক্সবাজার ভ্রমণে যাত্রী চাহিদা বেড়েছে।-ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম
এয়ারলাইন্স সংস্থাগুলো জানায়, ঈদের ছুটিতে সড়কে যানজট থাকলে গন্তব্যে পৌঁছানোর নির্দিষ্ট সময় থাকে না। অনেক সময় পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে ১৫ ঘণ্টাও লেগে যায়। ফলে এ ধরনের সীমাহীন ভোগান্তি এড়াতে আকাশপথে ঝুঁকছেন যাত্রীরা। তবে জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় টিকিটের দাম ক্রমেই বাড়ছে। সরকার জেট ফুয়েলের দাম কমালে ফ্লাইটে যাতায়াত আরও জনপ্রিয় হবে।
এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আগে সবচেয়ে বেশি চাহিদা নীলফামারীর সৈয়দপুর রুটে। ১৮ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত ভাড়া কয়েক হাজার টাকা বেশি ফ্লাইটের সময়ভেদে। ৫ হাজার থেকে ১১ হাজার পর্যন্ত ভাড়া দেখাচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলোর ওয়েবসাইটে। কোনো কোনো ফ্লাইটে দ্বিগুণ। তবে আগে যারা কেটে রেখেছেন তারা কিছুটা কম পেয়েছেন।
সিলেট-চট্টগ্রাম রুটের ভাড়াও কয়েক হাজার টাকা বেশি দেখাচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলোর ওয়েবসাইটে। ওয়ানওয়ে ৫-৭ হাজার টাকার নিচে মিলছে না।
ঈদ পরবর্তীসময়ে ২২ মার্চ কক্সবাজার রুটে এয়ারলাইন্সভেদে ওয়ানওয়ে টিকেটের মূল্য শুরু হচ্ছে ৬ হাজার ৭৪৯ থেকে ১১ হাজার ২৪৯ টাকা পর্যন্ত।
আরও পড়ুন
ঈদযাত্রার আরেক নাম ‘মৃত্যুর মিছিল’
যাত্রীর চাপহীন নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা
ঝুঁকি জেনেও মোটরসাইকেলে ২০ লাখ পরিবারের ঈদযাত্রা
বুধবার (১৮ মার্চ) বিকালের ফ্লাইটে সপরিবারে ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে গ্রামের বাড়ি ঈদ করতে যাবেন বনশ্রীর ব্যবসায়ী ময়নুল হোসেন। এজন্য তিনি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি টিকিট কেটে রেখেছেন। ময়নুল হোসেন বলেন, আগে বাসে করে সৈয়দপুর যেতাম। কিন্তু যাতায়াতে যে ভোগান্তি তা থেকে মুক্তি পেতেই আকাশপথ বেছে নিয়েছি। এতে সময় কম লাগে। আগে টিকিট কেটে রাখলে ভাড়াও তুলনামূলক কমে যাতায়াত করা যায়।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী জামিরুল জাহিদ ১৯ মার্চ যাবেন চট্টগ্রাম। ছুটির সিদ্ধান্তে টিকিট কাটতে দেরি হওয়ায় সাড়ে চার হাজার টাকার টিকিট তাকে কাটতে হয়েছে আট হাজার টাকায়। তিনি বলেন, আকাশপথে যাত্রার সমস্যা ভাড়া। হঠাৎ করে দ্বিগুণ হয়ে যায়। ঈদের সুযোগে এয়ারলাইন্সগুলো চাহিদা থাক না থাক ভাড়া বাড়ায়। যেটা আমাদের জন্য অস্বস্তির।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ। যেগুলো দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটের চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, যশোর, সৈয়দপুর, বরিশাল ও রাজশাহী গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। এর বাইরে আন্তর্জাতিক রুটের লন্ডন, রোম, টরন্টো, রিয়াদ, জেদ্দা, মদিনা, দাম্মাম, দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, কুয়েত, দোহা, মাস্কাট, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, ক্যান্টন (গুয়াংজু), কলকাতা, দিল্লি ও কাঠমান্ডুতে যাত্রী পরিবহন করছে।
আগামী ২১ মার্চ সম্ভাব্য ঈদ ধরে যাত্রীদের সুবিধার্থে অভ্যন্তরীণ রুটে বেশ কিছু রুটে বিশেষ ফ্লাইট বাড়িয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে ঢাকা-রাজশাহী-ঢাকা, ঢাকা-সৈয়দপুর-ঢাকা রুটে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে বিমান।
বিমানের পরিচালক (বিপণন ও বিক্রয়) আশরাফুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদের আগে যাত্রীর চাপ থাকে। এজন্য বিশেষ ফ্লাইট ব্যবস্থা করা হয়। এবারও কয়েকটি ফ্লাইট বাড়ানো হয়েছে। তবে বিগত বছরের তুলনায় এবার ঈদে লম্বা ছুটি পেয়েছেন চাকরিজীবীরা। তাই ফ্লাইটে খুব বেশি চাপ নেই।’
বিমানের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ঢাকা থেকে সৈয়দপুর, যশোর, রাজশাহী রুটে ঈদযাত্রার ছুটিতে ফ্লাইটগুলোতে আসন ফাঁকা নেই। কিছু ফ্লাইটে তিন-চারটি করে আসন ফাঁকা দেখা গেছে। বিমানের যে কোনো সেলস সেন্টার, বিমান ওয়েবসাইট, বিমান কল সেন্টার ১৩৬৩৬ ও বিমান অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সি থেকে এসব রুটের টিকিট কিনতে পারছেন যাত্রীরা।
ইউএস-বাংলা
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই দুটি উড়োজাহাজ দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। এখন এয়ারলাইন্সটির বহরে ২৪টি উড়োজাহাজ। সাতটি অভ্যন্তরীণ ও নয়টি দেশের ১১টি আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহন করছে ইউএস-বাংলা।
আসন্ন ঈদুল ফিতরে নীলফামারীর সৈয়দপুর, যশোর ও রাজশাহীর টিকিটের চাহিদা বেশি। আর ঈদের পর টানা এক সপ্তাহ কক্সবাজারে টিকিটের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে ইউএস-বাংলা।
জানতে চাইলে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘রমজানের আগ থেকেই সৈয়দপুর, যশোর ও রাজশাহীর টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। ঈদের সপ্তাহখানেক আগেই সৈয়দপুর, যশোর ও রাজশাহীগামী সব ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি প্রায় শেষ। আবার ঈদের পর কক্সবাজার ভ্রমণে যাত্রী চাহিদা বেড়েছে।’
ইউএস-বাংলা ৯টি দেশের ১১টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে। ঈদের ছুটিতে এসব রুটে পর্যটকদের টিকিট চাহিদা কেমন, জানতে চাইলে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর বেশ কিছু ফ্লাইট বাতিল হয়েছিল। এখন কাতারের দোহা ছাড়া বাকি সব রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করেছে ইউএস-বাংলা। ফলে ঈদের ছুটিতে দেশে ফিরতে পারছেন প্রবাসীরা।’
নভোএয়ার
দেশের বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা নভোএয়ার ২০১৩ সাল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। গত ১১ বছরে ধারাবাহিকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে নভোএয়ার। এবার ঈদে নভোএয়ারেরও সৈয়দপুর, যশোর, রাজশাহীর টিকিটের চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন নভোএয়ারের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, প্রতি বছরই ঈদে আকাশপথে ঘরমুখো যাত্রী বাড়ছে। সে অনুযায়ী কয়েক মাস আগ থেকেই টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ঈদযাত্রার আগের টিকিট বিক্রি প্রায় শেষ।
এয়ার অ্যাস্ট্রা
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর দুটি এয়ারক্র্যাফট দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে এয়ার অ্যাস্ট্রা। এখন কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং সৈয়দপুর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি গন্তব্যেই যাত্রীর চাপ রয়েছে বলে জানা যায়।
এমএমএ/এএসএ