মার্চ ২১
জুলফিকার ভুট্টো ঢাকায়, বিক্ষোভ ও সেনা তৎপরতায় উত্তপ্ত
১৯৭১ সালের ২১ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের ২০তম দিনে। এদিন বিকেলে ধানমন্ডির বাসভবনে শেখ মুজিবুর রহমান জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘বুলেট-বেয়োনেট দ্বারা কখনো সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির দাবিকে স্তব্ধ করা যাবে না।’ তিনি আন্দোলন চলাকালীন গুজব ও বিভেদ সৃষ্টিকারীদের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
সকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটি অনির্ধারিত বৈঠক হয়। ৭০ মিনিটের ওই বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি কোনো বিস্তারিত জানাননি। তার বক্তব্য ছিল, এটি আগের আলোচনার কিছু বিষয় ব্যাখ্যার জন্য অনুষ্ঠিত বৈঠক।
এর আগে ধানমন্ডির বাসভবনে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম কৌঁসুলি এ কে ব্রোহির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বসেন শেখ মুজিবুর রহমান।
একই দিনে পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো সেনা পাহারায় প্রেসিডেন্ট ভবনে পৌঁছে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ভুট্টোকে নিয়ে যাওয়ার পথে পথচারীরা ভুট্টোবিরোধী স্লোগান দেন।
সেনাবাহিনীর লোকেরা হোটেল কর্মচারীদের জামায় কালোব্যাজ ও বাংলার পতাকা খুলে ফেলার জন্য চাপ দেয়, তবে বাঙালি কর্মীরা পাল্টা হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি সামলান। হোটেল লাউঞ্জে সাংবাদিকরা ভুট্টোকে দেখা পাননি, প্রহরীরা অস্ত্র উঁচিয়ে তাদের লিফটে উঠতে বাধা দেন। পরের দিন দৈনিক ইত্তেফাক ভুট্টোর ঢাকা সফর বর্ণনা করে শিরোনাম দেয়, ‘হঠ যাও-সব কুছ ঠিক হো যায়ে গা।’
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চকে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনও এই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। মগবাজারে মহিলা সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশে সেনাবাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠনের আহ্বান করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ পশ্চিম পাকিস্তানি পণ্য বর্জনের সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দেয়।
এদিকে ন্যাপ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী চট্টগ্রামের পলো গ্রাউন্ডে এক জনসভায় বলেন, ‘আলোচনায় ফল হবে না। এ দেশের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে চাপরাশি পর্যন্ত যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে মানে না, তখন শাসন ক্ষমতা শেখ মুজিবের হাতে দেওয়া উচিত।’
সেনাবাহিনীর গুলিতে ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার পর কারফিউ জারি করা হয়েছিল। ২১ মার্চ দুপুর ১২টায় তা ছয় ঘণ্টার জন্য প্রত্যাহার করা হয়। পরে সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আবার কারফিউ জারি হয়।
তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১ এর দশমাস’, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র
এমএএস/জেএইচ