ঈদের ঘোরাঘুরি
অচেনা এক বিকেল যেন নেমে আসে জিয়া উদ্যানের সবুজে
ঈদের দ্বিতীয় দিন জিয়া উদ্যান এলাকায় সর্বস্তরের মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে/ছবি: জাগো নিউজ
ঘড়ির কাঁটায় বিকেল তিনটা। রাজধানীর জিয়া উদ্যানের লেকপার ততক্ষণে প্রাণবন্ত। ছোট ছোট শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, বাঁশির সুর, ফুচকাওয়ালার দোকানে টুপটাপ শব্দ আর বিভিন্ন বয়সী মানুষের কথোপকথন ও হাসি-আনন্দ—সব মিলেমিশে উদ্যান আজ মুখর। যেন অদ্ভুত এক সঙ্গীতময় কোলাহল তৈরি হয়েছে চারপাশে। হালকা বাতাসে দুলতে থাকা লেকের পানিও বিকেলের আলোয় চকচক করছে; গাছে গাছে মাখামাখি চলছে নতুন পাতার সবুজাভ হাসিতে।
ঈদের দ্বিতীয় দিন রোববার (২২ মার্চ) বিকেলে জিয়া উদ্যানের লেক এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কিশোর-কিশোরীরা বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছে, কেউ সেলফি তুলছে, কেউবা ভিডিও করছে। প্রাপ্তবয়স্করা লেকপারে বসে বা দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। অনেকের আকর্ষণের মূল কেন্দ্র ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধি। অনেককে সমাধি ঘিরে ছবি তুলতে বা ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। কেউ কেউ সমাধির পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান।
উদ্যান এলাকার হকাররাও ছিলেন ব্যস্ত। ফুচকা, চটপটি এবং বিভিন্ন রঙের মিষ্টির স্টলগুলোতে ক্রেতারা ভিড় করছেন। রহমান আলী নামের একজন হকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজ বিক্রি বেশ ভালো। যারা ঘুরতে এসেছেন, সবাই আনন্দ করছেন, খাওয়া-দাওয়া করছেন। আমরাও খুশি।’

ক্রেতা পেতে হকারদের হাঁকডাক আর গরম গরম ফুচকার গন্ধ পুরো উদ্যানকে যেন আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
উদ্যান এলাকায় আজ নিরাপত্তা কর্মীদেরও বাড়তি সতর্ক থাকতে দেখা যায়। উদ্যানের একজন নিরাপত্তা কর্মী বলেন, ‘আজ ভিড় অনেক। দর্শনার্থীরা যেন নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারেন, আমরা নজর রাখছি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিভাগও নিয়মিত ঝাড়ু দিয়ে উদ্যানকে পরিচ্ছন্ন রাখছে।’
লেকপারের এক কোণে বসে ফুচকা খাচ্ছিলেন একটি পরিবারের সদস্যরা। তাদের পাশেই ছোটরা বাঁশি বাজাচ্ছে, দৌড়ঝাঁপ করছে। কিশোররা চটপটি খাচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-খেলায় মেতে উঠেছে। প্রাপ্তবয়স্করাও শিশুদের সঙ্গ দিচ্ছে।

আতিক রহমান নামের এক শিশু বলেন, ‘আমি এখানে দৌড়েছি, ফুচকা খেয়েছি আর বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলেছি। অনেক মজা হয়েছে!’
প্রবীণ দর্শনার্থী আবদুল কাদের বলেন, ‘ঈদের পর এই সময়ে ঢাকার মানুষ অন্যরকম হয়ে ওঠে। সবাই বাইরে বের হয়, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটায়। নিরাপত্তা কর্মীদের উপস্থিতি থাকায় আমরা আরও নিশ্চিন্তে আনন্দ উপভোগ করতে পারছি।’
দর্শনার্থী সুমাইয়া বেগম বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা খেলছে, সবাই আড্ডা দিচ্ছে। ফুচকা আর চটপটি খেতে খেতে আমরা সবাই আনন্দময় বিকেল পার করছি। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগছে।’

এদিন অনেককে দেখা গেছে মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। তারা ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করার পাশাপাশি ফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রিয়জনদের উদ্যানের দৃশ্য দেখাচ্ছেন। অনেকে একসঙ্গে গ্রুপ ছবি তুলে এমন সুন্দর বিকেলের স্মৃতি ধরে রাখছেন।
লেকের ধারে বসে কয়েকজন যুবক কফি পান করছিলেন। তাদের গল্পগুলো হালকা হাওয়ার সঙ্গে মিশে যেন উদ্যানের পাখিদের সুরেলা কণ্ঠের সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
শিশুদের কাউকে কাউকে লেকের ধারে পায়ে পানি লাগিয়ে খেলতে দেখা গেছে। অভিভাবকরাও তাদের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে। পরিবারের আনন্দ, বন্ধুদের আড্ডা আর শিশুদের খেলা—সব মিলিয়ে নিখুঁত এক বিকেল যেন নেমে এসেছে জিয়া উদ্যানের সবুজ আঙিনায়।

উদ্যানের অন্য এক কোণে কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে ধীর পায়ে হাঁটতে দেখা যায়। তারা ছবিও তুলছিলেন। কথায় ও গল্পে মেতে উঠেছিলেন হাস্যরসে।
ব্যস্ত নগরী ঢাকায় প্রাণ-প্রকৃতির দেখা মেলা বেশ কঠিন। তবে ঈদের ছুটিতে কয়েকটি দিনের জন্য নতুন রূপে ফেরে ঢাকা। ফাঁকা ঢাকায় নগরবাসীর জীবনযাপনেও আসে প্রাণের ছোঁয়া। তাইতো ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে সবাই এ কয়টা দিন প্রকৃতির কাছে ছুটে আসে। প্রাণখোলা একটু বাতাস গায়ে মাখতে প্রিয়জন নিয়ে বেরিয়ে পড়ে পথে। এতে পারিবারিক ও সামাজিক মেলবন্ধনও আরও দৃঢ়তা পায়
কেএইচ/এমকেআর