ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ভ্রমণ

ঈদে ঘোরাঘুরি

ঢাকার কাছেই গ্রামের ছোঁয়া পেতে দাশেরকান্দি-কায়েতপাড়ায়

বুলবুল আহমেদ | প্রকাশিত: ১১:১০ এএম, ২৩ মার্চ ২০২৬

ব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তি কাটাতে অনেকেই দূরে কোথাও ছুটে যেতে চান। তবে সময় আর সুযোগ সবসময় মেলে না। অথচ ঢাকার কাছেই রয়েছে এমন কিছু জায়গা, যেখানে খুব অল্প সময়েই পাওয়া যায় প্রকৃতির ছোঁয়া আর গ্রামীণ আবহ। তেমনই একটি গন্তব্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া, যার পথে রয়েছে দাশেরকান্দি।

যাত্রা শুরু করা যায় আফতারনগর গেট থেকে। এখান থেকে অটোরিকশাই প্রধান বাহন, যদিও ছোট বাসও পাওয়া যায়। রিকশায় দাশেরকান্দি যেতে ভাড়া লাগে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আর কায়েতপাড়া পর্যন্ত অটোরিকশা ভাড়া সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মতো। তবে একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে ত্রিমোহনী ঘাট থেকে নৌকায় যাওয়া যায়- ভাড়া মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকা।

অফিস শেষে এক বিকেলে আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়েছিলাম কায়েতপাড়ার উদ্দেশ্যে। বাড্ডা থেকে অটোরিকশায় প্রথমে পৌঁছাই দাশেরকান্দি ব্রিজে। সেখান থেকে কিছুটা হেঁটে ত্রিমোহনী ঘাট। তারপর ছোট নৌকায় চেপে যাত্রা কায়েতপাড়ার দিকে। সাধারণ সময়ে ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা, তবে ঈদের সময় তা বেড়ে ৩০ টাকা পর্যন্ত হয়।

ঢাকার কাছেই গ্রামের ছোঁয়া পেতে দাশেরকান্দি-কায়েতপাড়ায়

নৌকায় বসে ধীরে ধীরে এগোতে থাকলে শহরের কোলাহল যেন মিলিয়ে যেতে থাকে। চারপাশে সবুজ, খাল আর নদীর শান্ত জল- সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি। কায়েতপাড়ায় পৌঁছে চোখে পড়ে গ্রামীণ জীবনের সরল ছবি। খালের ওপর বাঁশের সাঁকো, তার পাশেই ঘরবাড়ি, আর সবুজের ছোঁয়া- সবকিছু মিলিয়ে যেন শহরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা এক টুকরো গ্রাম।

কায়েতপাড়ায় পৌঁছালেই চোখে পড়ে বালু নদীর দুই পাড়ে দুটি ভিন্ন জগৎ। এক পাশে ঢাকা জেলা, অন্য পাশে নারায়ণগঞ্জ। দুই পাশের পরিবেশ ও অনুভূতিতেও রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য। এই এলাকায় প্রচুর বাঁশের সাঁকো রয়েছে, যা হাঁটার সময় বাড়তি রোমাঞ্চ যোগ করে।

ঢাকার কাছেই গ্রামের ছোঁয়া পেতে দাশেরকান্দি-কায়েতপাড়ায়

নারায়ণগঞ্জ অংশে পৌঁছে আমরা কিছুটা সময় হাঁটাহাঁটি করি। হাঁটতে হাঁটতে একটি ছোট দোকানে চোখ আটকে যায়, সেখানে গরম গরম মিষ্টি বানানো হচ্ছে। লোভ সামলাতে না পেরে বসেই পড়লাম। তিনজন একটি করে মিষ্টি নিলাম। স্বাদে ছিল একেবারে ঘরোয়া ছোঁয়া, আর দামও অবাক করার মতো কম, প্রতিটি মাত্র ২০ টাকা, যা ঢাকার তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী।

এই দোকানের মালিক আব্দুল কাদের বলেন, ‘আমাদের এখানে ছানা দিয়ে মিষ্টি বানানো হয়। প্রতিদিনই তৈরি করি। ঢাকার মতো বেশি লাভ না রেখে কম দামেই বিক্রি করি, যাতে সবাই খেতে পারে।’

ঢাকার কাছেই গ্রামের ছোঁয়া পেতে দাশেরকান্দি-কায়েতপাড়ায়

কায়েতপাড়ায় গ্রামীণ পরিবেশে নদীর ধারে আমরা বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করি। এরপর খেয়াপারে এসে নৌকা দিয়ে ঢাকার প্রান্তে আসি। এরপর ফেরার জন্য তিনজন অটোরিকশায় চেপে বসি। ফেরার পথে আমরা কিছুক্ষণ দাশেরকান্দি ব্রিজে দাঁড়াই। নিচে খালের স্বচ্ছ পানি, চারপাশে খোলা বাতাস- সব মিলিয়ে শহরের ভেতরেই এক প্রশান্ত পরিবেশ।

এখানে নিয়মিত ঘুরতে আসেন সহকর্মী মাহফুজ আহমেদ মাহফি। তিনি বলেন, ‘অফিস শেষে প্রায়ই এখানে চলে আসি। ঢাকার মধ্যে এমন গ্রামীণ পরিবেশ খুব কম জায়গায় পাওয়া যায়। এখানে এলেই মনটা তরতাজা হয়ে যায়, নির্মল বাতাসটা সত্যিই আলাদা অনুভূতি দেয়।’

ঢাকার কাছেই গ্রামের ছোঁয়া পেতে দাশেরকান্দি-কায়েতপাড়ায়

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বনশ্রী থাকার সুবাদে মাঝেমধ্যেই এখানে আসা হয়। বলতে গেলে একদম গ্রামের আমেজ পাওয়া যায় এই জায়গাটায়। শহরের মধ্যেই এমন নির্মল বাতাস আর গ্রামীণ পরিবেশ পাওয়া কঠিন। তাছাড়া কম সময়ের মধ্যে আসা যায় বলে অনেকেই পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে আসেন এখানে।’

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান আরেক দর্শনার্থী সাব্বির হোসেন। তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে হালকা ঘোরাঘুরির জন্য জায়গাটা একদম সুন্দর। খুব বেশি খরচও লাগে না, আবার শহরের বাইরে যাওয়ার মতো সময়ও লাগে না। তাই প্রায়ই আসা হয়।’

ঢাকার কাছেই গ্রামের ছোঁয়া পেতে দাশেরকান্দি-কায়েতপাড়ায়

ব্রিজের পাশেই দাশেরকান্দি সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। অবাক করার মতো বিষয়, গত কয়েক মাসে এই এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট। এখানে দেশি-বিদেশি নানা খাবার পাওয়া যায়, বিশেষ করে ফিশ ফ্রাই বেশ জনপ্রিয়। খোলা আকাশের নিচে বসে খাওয়া আর আশপাশের পরিবেশ উপভোগ- দিনশেষে সেটাই হয়ে ওঠে ভ্রমণের বাড়তি আকর্ষণ।

দাশেরকান্দি এলাকার রেস্টুরেন্ট নিয়ে কথা বলেন ভ্রমণসঙ্গী এম এরশাদ আলী। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাসে এখানে ছোট ছোট রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটা এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ফিশ ফ্রাইসহ দেশি-বিদেশি নানা খাবার এখানে পাওয়া যায়, যা ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।’

ঢাকার কাছেই গ্রামের ছোঁয়া পেতে দাশেরকান্দি-কায়েতপাড়ায়

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা জানালেন আরেক সঙ্গী সহকর্মী মুজাহিদুল ইসলাম টিটু। তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে রাজধানী ঢাকায় উন্মুক্ত জায়গায় কোথাও বসে একটু আড্ডা দেবো- এমন পরিসর খুবই কম। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গাকেন্দ্রিক পার্কের সংখ্যা খুবই কম, অনেক জায়গায় নেই বললেই চলে। আর ঈদে সেসব জায়গায় গেলে প্রচণ্ড ভিড়ের মুখোমুখিও হতে হয়। যেহেতু বাড্ডায় থাকি, আফতাবনগর, দাশেরকান্দি এবং কায়েতপাড়া- এই জায়গাগুলো আমার জন্য কাছেই হয়, তাই একটু সময় পেলে ওদিকটায় যাই। ওইদিকে গ্রামীণ পরিবেশ, প্রচুর গাছপালা, খাল সবমিলিয়ে ভালোই লাগে।

প্রতিদিনই এখানে মানুষের ভিড় থাকে, আর ঈদের ছুটিতে সেই ভিড় আরও বাড়ে। স্বল্প খরচে, অল্প সময়েই যদি একটু ভিন্ন স্বাদের ভ্রমণ চান, তাহলে দাশেরকান্দি হয়ে কায়েতপাড়া হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য।

বিএ