বসন্ত, ভালোবাসা ও কক্সবাজার এক্সপ্রেস
ট্রেনে কক্সবাজার ভ্রমণ করলে এই স্টেশন ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যাবে। ছবি: লেখক
বাইরে থেকে দেখলে কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনকে মনে হয় বিমানবন্দর। চকচকে কাচের ভবনের ওপর বিশাল বাঁকানো ছাউনিটা অনেকগুলো হেলানো কলামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশনের প্রবেশমুখে গোলাকার একটা ঝরনা আর মাঝে সাদা ঝিনুকের ভাস্কর্য, যেটা জানাচ্ছে — আপনি এখন দেশের জনপ্রিয় পর্যটন-নগরে।
ব্যাটারি ও সিএনজিচালিত তিন চাকার বাহনে আসা যাত্রীরা কাচের দরজা পেরিয়ে ছয়তলা ভবনটার ভেতরে ঢুকছে। নিচতলার মেঝে মার্বেল আর গ্রানাইটে তৈরি। দেখলে মনে হবে সমুদ্রসৈকতের বালুর একটা স্তর।
ডান দিকের লাউঞ্জে সারি সারি নীল চেয়ারে বসে আছে অনেক যাত্রী। আর বাম দিকের অর্ধবৃত্তাকার টিকিট কাউন্টারে একাধিক কাচঘেরা বুথ। প্রতিটা বুথের ওপরে একটা ফ্ল্যাট স্ক্রিন টেলিভিশন ঝুলছে।
মাঝখানের খোলা জায়গা থেকে যতটুকু দেখা যায়, ভবনটার ভেতরে তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু আছে। একটা ডিরেক্টরি বোর্ড বলছে ওপরের তলায় দোকান, রেস্তোরাঁ, রাতে থাকার ব্যবস্থা এবং মাল্টিপারপাস হল আছে। অবশ্য সেগুলো এখনও চালু হয়নি। একদম ওপরে ছাদের দিকে ঘাড় বাঁকা করে তাকালে দেখা যায় কাচের প্যানেল ভেদ করে সূর্যের আলো ভেতরে এসে পড়ছে।

স্টেশনটা নিঃসন্দেহে অভিজাত। কিন্তু ব্রিটিশ আমলের সেই পুরোনো স্টেশনগুলোর নস্টালজিক আবেদন আমাকে বরাবরই টানে, যা ঝকঝকে এই আধুনিক স্টেশনে পাওয়া সম্ভব না। এই আধুনিক স্থাপত্যের চেয়ে সান্তাহার বা লালমনিরহাট স্টেশনে লাল ইটের খিলানওয়ালা ভবনগুলো ঘুরে দেখতেই বেশি ভালো লাগে।
তবে আমার ভালো লাগা বা না লাগায় কক্সবাজার স্টেশনের গুরুত্ব কমার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে উদ্বোধনের পর থেকেই এটি দেশের অন্যতম এক দর্শনীয় জায়গা হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যমেও এর ব্যাপক প্রচার হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ‘আইকনিক’ স্টেশন হিসেবে।
স্টেশনের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে টেরাকোটা রঙের নকশা করা প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই দেখলাম অনেক যাত্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গল্প করছেন। লাগেজের সংখ্যা আর পোশাক-আশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, যাত্রীদের অধিকাংশই পর্যটক।

কক্সবাজার এক্সপ্রেসের কোচগুলোর বাইরের দিকটা সবুজ, আর ওপরে-নিচে লাল ও সাদা রঙের স্ট্রাইপ। প্রবেশপথে দাঁড়ানো স্টুয়ার্ডদের পরনে নেভিব্লু ব্লেজার, আকাশী নীল শার্ট, লাল টাই, নেভিব্লু প্যান্ট এবং কালো জুতো। তাদের একজন কোচের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পোজ দেওয়া এক তরুণ যাত্রীর ছবি তুলে দিচ্ছিলেন।
সেদিন ফাল্গুনের প্রথম দিন এবং একই সাথে ভ্যালেন্টাইনস ডে (ভালোবাসা দিবস)। রোদটা উজ্জ্বল কিন্তু সহনীয়। ঘাম হচ্ছে না একেবারেই। বাতাসে শীতের শেষের রেশ আর বসন্তের মৃদু উষ্ণতার এক দারুণ মিশেল।
বাংলাদেশিদের কাছে বসন্ত হল ঋতুরাজ। শীতের শেষে উজ্জ্বল রঙ, বাহারি ফুল, আর গানের মাধ্যমে তারা ঋতুরাজকে স্বাগত জানায়। ঢাকার শাহবাগে থাকলে বড়সড় উৎসবের আমেজ দেখা যেত। নারীদের পরনে হলুদ ও লাল শাড়ি আর খোঁপায় ফুল, পুরুষদের পরনে হলুদ ও মেরুন পাঞ্জাবি, আর ফুলের দোকানে ভিড়। কিন্তু বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের এই রেলস্টেশনে কোনো রঙ, ফুল বা উৎসবের আমেজ নেই; আছে শুধু সমুদ্রের শহর ছেড়ে চলে যাবার এক নীরব অনুভূতি।

ট্রেনের লম্বা হুইসেল বাজতেই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা তাদের কোচের দিকে ছোটে। আমি আমার সিটে গিয়ে বসি। আমার পাশে জানালার ধারে বসেছে হালকা দাড়িওয়ালা এক তরুণ। ৩০২৩ নম্বর লোকোমোটিভ নিয়ে দুপুর ১২টা ৩৩ মিনিটে ট্রেন চলতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চাকায় ঘর্ষণের শব্দ তুলে রামুর দিকে বাঁক নেয়। রামু বৌদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত, যেখানে গৌতম বুদ্ধের ১০০ ফুট একটা মূর্তি আছে।
কক্সবাজার বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম। মধুচন্দ্রিমা কাটাতে আসা নবদম্পতি থেকে শুরু করে পরিবার, সহকর্মী ও সহপাঠীরা ছুটি কাটাতে এখানে ভিড় করে। ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বন্ধুকে নিয়ে বাসে করে আমি প্রথমবার এখানে বেড়াতে এসেছিলাম। সেই ভ্রমণের খরচ দিয়েছিল আমার বাবা-মা। আমরা দুপুরে সৈকতের গরম বালিতে হেঁটেছি, লবণাক্ত পানিতে গোসল করেছি, রূপচাঁদা এবং অন্যান্য সুস্বাদু সামুদ্রিক মাছ খেয়েছি, আর বঙ্গোপসাগরের বুকে সূর্যাস্তের সোনালী আভা দেখেছি।

কেবল পর্যটন খাতকে প্রসারিত করার জন্য কক্সবাজারকে রেলপথে যুক্ত করা হয়নি। এটা ছিল ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটা পদক্ষেপ। ব্রিটিশরা ১৯৩১ সালে চট্টগ্রামের দোহাজারী পর্যন্ত মিটারগেজ লাইন তৈরি করেছিল। এরপর ২০১৮ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ডুয়েল-গেজ লাইনের মাধ্যমে রেল সম্প্রসারণের মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
যাত্রার কয়েক মিনিট যেতেই স্পিকারে এক নারী কণ্ঠের সতর্কবার্তা ভেসে আসে। জানালার পাশে মোবাইল ফোন ব্যবহারে যাত্রীদের সাবধান থাকতে বলা হচ্ছে। চলন্ত ট্রেনের দিকে ঢিল ছোঁড়া দেশের ট্রেনযাত্রীদের জন্য এক বড় আতঙ্কের কারণ ছিল। ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা ও আইনি পদক্ষেপের ফলে সেটা কিছুটা কমানো গেছে।
জানালা দিয়ে গ্রামবাংলার সাধারণ দৃশ্য দেখছি — টিনের চালের ঘর, গাছপালা আর ফসলের খেত। কিছু কিছু গাছে সবুজ আর হলুদ পাতার দারুণ মিশ্রণ। রামু স্টেশন পার হতেই নজরে এলো ইট ভাটা, যার চিমনি দিয়ে বের হওয়া সাদা ধোঁয়া আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।

ফিরোজা রঙের শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা রেলওয়ের এক ক্যাটারিং কর্মী কাপড় দিয়ে বাঁধা একটা বড় বাক্স টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের কামরার মাঝখান দিয়ে। বাক্সটা লাঞ্চবক্স দিয়ে ভর্তি। মেনুতে আজ শুধু মোরগ-পোলাও, দাম ২২০ টাকা। এ রকম ভারী খাবার খাওয়ার ক্ষুধা ওই মুহূর্তে ছিল না বলে নিলাম না।
এই প্রিমিয়াম ট্রেনে হকার উঠতে দেওয়া হয় না, তাই ভেতরটা বেশ পরিষ্কার। আমার নন-এসি কামরার দেয়াল ও ছাদ অফ-হোয়াইট, সিটগুলো ধূসর ও গাঢ় নীল, আর জানালার পর্দাগুলো গাঢ় ধূসর। বাতাসের ঝাপটায় পর্দা উড়ছে। আমার পাশের যাত্রী পর্দাটা রোল করে একদিকে ঠেলে দেয়ালের হুকে আটকে দিলেন।

ট্রেনটা যাত্রাপথে চট্টগ্রাম ছাড়া আর কোথাও থামবে না। তাই জানালা দিয়ে স্টেশনগুলো শুধু একঝলক দেখার সুযোগ পেলাম। আমরা ইতিমধ্যে রামু, ইসলামাবাদ এবং ডুলাহাজারা স্টেশন পার হয়েছি। স্টেশনগুলোর সাদা ফুটব্রিজগুলো বেশ সুন্দর। জিগজ্যাগ স্টাইলের সিঁড়ি ও র্যাম্প আছে। ফুটব্রিজ এবং প্ল্যাটফর্মের ছাউনি দুটোই উজ্জ্বল লাল রঙের।
স্টেশন ভবনগুলো বাদামী। দরজার ওপরে নীল প্লেটে কক্ষগুলোর নাম লেখা। ভবনের মাঝখানে বড় সাদা অক্ষরে বাংলায় স্টেশনগুলোর নাম লেখা আছে। স্টেশনগুলোর চেহারায় আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট।

কক্সবাজার থেকে দোহাজারী পর্যন্ত এই নতুন রেলপথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যতটা মনোরম, এর নির্মাণ কাজও ততটাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অধিকাংশ জায়গা পাহাড়ি ও উপকূলীয় সমভূমি, যা রেললাইন নির্মাণের জন্য বেশ কঠিন। তার ওপর আছে বন। সব মিলিয়ে প্রকৌশলীদের জন্য এটা ছিল একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সংরক্ষিত বনভূমিসহ প্রায় ১ হাজার ৪০০ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছিল লাইনটা বানানোর জন্য। এরপর সংরক্ষিত বনের গাছ কাটার জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হয়েছিল। মাতামুহুরী, সাঙ্গু এবং বাঁকখালী নদীর ওপর ছয়টি বিশেষ সেতুসহ মোট ৩৮টি বড় সেতু এবং ২ শতাধিক কালভার্ট নির্মাণ করতে হয়েছিল।
এই রুটের যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এলিফ্যান্ট ওভারপাস। লোহাগাড়া-হারবাং সেকশনে চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। ১০৩ কিলোমিটার লাইনের প্রায় ২৭ কিলোমিটার গেছে চুনতি, ফাঁসিয়াখালী, এবং মেধাকচ্ছপিয়া সংরক্ষিত বনের মধ্যদিয়ে। এই বনে এমন কয়েকটি করিডোর আছে, যা এশিয়ান হাতির দল চলাচলের জন্য ব্যবহার করে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে হঠাৎ কংক্রিটের নিরাপত্তা বেষ্টনী চোখে পড়ল। দুই পাশে ছোট পাহাড় আর ঘন গাছপালা। আমরা এলিফ্যান্ট ওভারপাসের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। অনেক যাত্রী ফোন হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে মাথা বের করে রেখেছে ওভারপাসের ছবি তোলা ও ভিডিও করার জন্য। কিছু সময় পর ওভারপাসের নিচের ছোট টানেলে ঢুকে ট্রেনটা অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে গেল।
যদিও এই ওভারপাসটা হাতির জন্য তৈরি করা হয়েছে, তবু কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে। গত বছর রাতে একটি হাতি রেললাইনে চলে এসেছিল। ট্রেনচালক জরুরি ব্রেক কষে এবং বারবার হুইসেল বাজিয়ে হাতিটাকে সরে যেতে বাধ্য করেন। এর আগে ২০২৪ সালে একটা অল্পবয়সী হাতি ট্রেনের ধাক্কায় মারা যায়।
ইতিমধ্যে ভ্রমণের দুই ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার পাশের তরুণ ১০ মিনিটও মোবাইল ফোন ব্যবহার করেনি, যা আমাকে অবাক করেছে। এই প্রযুক্তির যুগে দীর্ঘ সময় ফোন না ব্যবহার করাটা একটা বিরল ব্যাপার।
ছেলেটা একবার ঝিমাচ্ছে, একবার বাইরের দৃশ্য দেখছে। আমার বাম পাশে উল্টোদিকে বসা একটা ছোট ছেলে দীর্ঘ সময় ধরে ফোনে গাড়ি প্রতিযোগিতার গেম খেলছে, আর তার মা দুই হাত জড়ো করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
আমরা ব্রিটিশ আমলের কালুরঘাট সেতু পার হচ্ছিলাম। সেতুর নিচে কর্ণফুলী নদী, যেটা চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান নদী। কিছু হালকা যানবাহন এবং পথচারীরাও এই সেতুটা ব্যবহার করে। জানালা দিয়ে সেতুর ছবি তোলার জন্য পাশে বসা তরুণকে একটু জায়গা করে দিতে বললাম। সেখান থেকেই কথোপকথন শুরু হলো। সে নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। আমি নটরডেম কলেজের সাবেক ছাত্র শুনে জড়তা ভেঙে কথা বলতে শুরু করল সে।
বাংলাদেশে ভালোবাসা নিয়ে খোলামেলা কথা বলা খুব সহজ নয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এটা সহজ। কিন্তু এখানে সামাজিক প্রথা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ অনেকাংশেই ব্যক্তিগত ভালোবাসার প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে ...
তার বাড়ি কক্সবাজারে। জাতীয় নির্বাচনের ছুটি আর সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফিরছে। সে ট্রেনভ্রমণ পছন্দ করে, কারণ এতে জ্যাম এড়ানো যায়। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়েও সে সন্তোষ প্রকাশ করল।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ট্রেন চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছে গেল। আমি নেমে প্ল্যাটফর্মের এক দোকান থেকে কলা, মোরব্বা দেওয়া রুটি আর ফ্রুটকেক কিনলাম। পাশের প্ল্যাটফর্মে বড় ঝাড়ু দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করছিলেন ঝাড়ুদার। এই প্ল্যাটফর্মটা পুরোনো স্টেশন ভবনের দিকে চলে গেছে, যেটা ঔপনিবেশিক আমলের এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।
বাংলাদেশের লোকাল ট্রেনগুলো অনেকটা কোলাহলপূর্ণ বাজারের মতো, যেখানে অপরিচিতদের সাথে কথা বলা খুব সহজ। কিন্তু কক্সবাজার এক্সপ্রেসকে মনে হচ্ছে এক শান্ত এলাকা, যেখানে সবাই নিজের জগতে ব্যস্ত। কেউ কারও সাথে কথা বলতে আগ্রহী না। কোরিয়ান কোচগুলোর স্লাইডিং দরজাগুলো বন্ধ থাকায় সেখানে দাঁড়িয়ে কেউ আড্ডা দিচ্ছে না বা বাইরের দৃশ্য দেখছে না।
আমার আড্ডা দিতে ইচ্ছা করছে। তাই গেলাম খাবার গাড়িতে। সেখানে জানালা বরাবর দুই পাশে দুইটা টেবিল। সব মিলিয়ে ছয়জনের বসার জায়গা, যার মধ্যে চারটা সিট দখল হয়ে গেছে। কাউন্টারে গিয়ে একবোতল কোমল পানীয় কিনলাম।
বিক্রেতা আমির হোসেন বয়স্ক লোক। ব্যবসার খবর জানতে চাইলাম। তিনি বললেন জাতীয় নির্বাচনের ছুটির কারণে বিক্রি দেড় লাখ টাকা (আপ এবং ডাউন ট্রিপ মিলিয়ে) থেকে কমে ৩০ হাজারে নেমে এসেছে। রমজানে নাকি আরও কমবে, ২০ হাজারে নেমে যেতে পারে। দীর্ঘ ৩৬ বছর রেলওয়েতে কাজ করছেন তিনি, এবং এখনও কাজটাকে ভালোবাসেন।
চশমাপরা এক যাত্রী চা খাচ্ছেন আর পাশের একজনের সাথে গল্প করছেন। আমি পাশে গিয়ে বসলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম তিনি চট্টগ্রামের কি না। জানালেন তার বাড়ি কক্সবাজার এবং চুপ হয়ে গেলেন। আমি রাজনীতির প্রসঙ্গ তুললাম কারণ বাংলাদেশিদের সাথে আড্ডা জমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় এটা। জিজ্ঞেস করলাম তার এলাকায় ভোট কেমন হলো এবং তিনি ভোট দিয়েছেন কি না। কাজ হলো। তিনি উৎসাহ নিয়ে ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা, এবং বিএনপির জয়ের বিষয়ে তার পূর্বাভাস সত্য হওয়ার গল্প বললেন। জানালেন কয়েক বছর আগে স্নাতক শেষ করেছেন এবং একটা চাকরিও করেছিলেন, কিন্তু এখন বেকার।
আমি আরেকটু গভীরে গেলাম। আজকের ভালোবাসা দিবসে তার ভালোবাসা সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি লাজুক হাসলেন এবং অঙ্গভঙ্গিতে বোঝালেন এ বিষয়ে কথা বলতে চান না। এবার তার পাশের জনের সঙ্গে চেষ্টা করলাম, কিন্তু তিনিও তেমন আগ্রহী হলেন না এ বিষয়ে কথা বলতে।
বাংলাদেশে ভালোবাসা নিয়ে খোলামেলা কথা বলা খুব সহজ নয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এটা সহজ। কিন্তু এখানে সামাজিক প্রথা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ অনেকাংশেই ব্যক্তিগত ভালোবাসার প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। তীব্র প্রেম এখানে দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তার চেয়ে সিনেমা, নাটক বা উপন্যাসেই বেশি দেখা যায়।
তাছাড়া বাংলাদেশের পরিবারকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় এখনো বিয়ের পর প্রেম বা ভালোবাসার বিষয়টাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যদিও নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে, বিশেষ করে শহরে, প্রেমের বিয়ে এখন সাধারণ ঘটনা, তবুও ভালবাসার ধারণাটা এখনও খুব স্পর্শকাতর। আর চলন্ত ট্রেনে অপরিচিত কারো সাথে সেটা নিয়ে আলোচনা করা আরও কঠিন।
আমাদের ট্রেন দ্রুত ফেনীর দিকে ছুটে যাচ্ছে। খাবার গাড়ির বন্ধ জানালার কাচ দিয়ে বিকেলের হলুদ আলো এসে পড়ছে ভেতরে। দূরে সীতাকুণ্ডের উঁচু উঁচু পাহাড় তার সামনের ঘন সবুজ গাছপালা ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কয়েক ঘণ্টা পর আমি এমন এক শহরে গিয়ে পৌঁছব, যেখানে ভালোবাসা দিবসে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলার চেয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য প্রতিদিন পরিশ্রম করে যাওয়াই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ।
লেখক: সাংবাদিক ও রেলভ্রমণ লেখক
এমএইচআই/আরএমডি