ইতিহাস ও রহস্যে ঘেরা ‘ঢোল সমুদ্র দীঘি’
প্রতিদিন বিকেলে এখানে ভিড় জমে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের/ছবি: জাগো নিউজ
ঝিনাইদহ জেলার বুকে ইতিহাস, লোককথা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মেলবন্ধন ‘ঢোল সমুদ্র দীঘি’। প্রাচীন এই দীঘিটি শুধু একটি জলাশয় নয়; এটি স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের এক জীবন্ত নিদর্শন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার অদূরে অবস্থিত এই দীঘিটি আয়তনে বেশ বড় এবং চারপাশে সবুজ গাছপালায় ঘেরা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন প্রকৃতির কোলে সাজানো এক শান্ত জলাধার। প্রতিদিন বিকেলে এখানে ভিড় জমে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের। কেউ আসে বিশ্রাম নিতে, কেউবা ইতিহাসের ছোঁয়া অনুভব করতে।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক রাশেদ মাহমুদ বলেন, ছবিতে দেখেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে এর সৌন্দর্য আরও বেশি ভালো লাগছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এমন নিরিবিলি পরিবেশ সত্যিই মন ভরে দেয়।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী নুসরাত জাহান বলেন, জায়গাটা খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বিকেলের সময়টা সবচেয়ে সুন্দর লাগে। এখানে বসে সূর্যাস্ত দেখা সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা।
ঝিনাইদহ শহর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা সাকিব হাসান জানান, আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে এখানে এসেছি। চারপাশের সবুজ আর পানির শান্ত পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করে। এটি আরও উন্নত করা হলে ভালো পর্যটন স্পট হতে পারে।
কুষ্টিয়া থেকে আসা পর্যটক তানভীর আহমেদ বলেন, এই জায়গার একটা আলাদা রহস্যময়তা আছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে এর গল্প শুনে আরও আগ্রহ বেড়েছে। তাই ঘুরতে এসেছি।
ইতিহাস ও নামকরণের পেছনের গল্প
স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত আছে, বহু বছর আগে কোনো এক রাজা বা জমিদার এই দীঘি খনন করান। ‘ঢোল সমুদ্র’ নামটি নিয়েও রয়েছে নানা কাহিনি। কেউ বলেন, দীঘির গভীরতা এত বেশি যে ঢোল বাজালেও তার শব্দ তলদেশে পৌঁছাত না, সেখান থেকেই ‘ঢোল সমুদ্র’। আবার কেউ মনে করেন, কোনো উৎসব বা আচার-অনুষ্ঠানে ঢোল বাজানোর সঙ্গে এর নামের সম্পর্ক রয়েছে।

যদিও এই গল্পগুলোর ঐতিহাসিক প্রমাণ খুব একটা মেলে না, তবুও এসব লোককথাই দীঘিটিকে দিয়েছে আলাদা এক রহস্যময়তা।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষণ
ঢোল সমুদ্র দীঘির চারপাশে রয়েছে ঘন সবুজ বৃক্ষরাজি, যা স্থানটিকে করেছে আরও মনোরম। সকালে সূর্যের আলো যখন পানির ওপর পড়ে, তখন এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আবার সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্যের প্রতিফলনে দীঘির পানি রঙ বদলায়, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
শীত মৌসুমে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির আগমন ঘটে। ফলে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান হয়ে ওঠে।
স্থানীয় মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতে প্রভাব
এই দীঘিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। অনেকেই এখানে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনেও দীঘি প্রাঙ্গণ ব্যবহৃত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, এই দীঘি আমাদের গর্ব। ছোটবেলা থেকে এখানে বড় হয়েছি। এখনো প্রতিদিন বিকেলে এখানে না এলে যেন দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগে।
আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুন জানান, আগে এখানে অনেক বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ছিল। এখন কিছুটা অবহেলার কারণে সমস্যা হচ্ছে। যদি ঠিকমতো দেখভাল করা হয়, তাহলে এটি আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।

সংরক্ষণ ও উন্নয়নের প্রয়োজন
যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক সময় দীঘির সৌন্দর্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে এই ঐতিহ্যবাহী দীঘির সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর বাড়ানো জরুরি।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
ইতিহাস, প্রকৃতি ও লোককথার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ঢোল সমুদ্র দীঘি শুধু ঝিনাইদহ নয়, পুরো দেশের জন্যই একটি মূল্যবান ঐতিহ্য। সঠিক পরিচর্যা ও প্রচারের মাধ্যমে এটি পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
সঘন সবুজের প্রকৃতিঘেরা ঝিনাইদহের এই নীরব জলরাশি যেন আজও অতীতের গল্প শোনায়, শুধু দরকার তা শুনে নেওয়ার মতো প্রকৃত মন।
এমএএস/এমকেআর
সর্বশেষ - জাতীয়
- ১ গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব করেছে সরকারি দল, দাবি জামায়াতের
- ২ জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতিকে ভারতীয় হাইকমিশনের শুভেচ্ছা
- ৩ পাচার অর্থ ফেরাতে সুইজারল্যান্ডের সহযোগিতা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- ৪ মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর
- ৫ শিক্ষানবিশ চার সহকারী পুলিশ সুপারকে চাকরি থেকে অপসারণ