‘কেটামিন’ তৈরির ল্যাব
ডার্ক ওয়েবে মাদক কেনাবেচা-ক্রিপ্টোতে লেনদেন করতেন চীনের তিন নাগরিক
চীনা নাগরিক ইয়াং চুংসেন, লি বিন ও ইউ জি, ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার একটি ল্যাবে অবৈধভাবে ‘কেটামিন’ তৈরি করার অভিযোগে চীনের তিন নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার নেওয়া এবং একই মাধ্যমে মাদক সংগ্রহ করতো। লেনদেন করা হতো ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। তিনি জানান, রাজধানীর একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের পারসেল থেকে ৫০ গ্রাম কেটামিন উদ্ধার করা হয়েছে।
হাসান মারুফ বলেন, ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচারের বিষয়ে নজরদারি করছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৫ মার্চ অভিযান চালিয়ে একটি সন্দেহজনক পারসেল জব্দ করা হয়। তল্লাশিতে ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো মাদক পাওয়া যায় এবং তাৎক্ষণিক রাসায়নিক পরীক্ষায় কেটামিনের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
আরও পড়ুন
ঢাকায় ভয়ানক মাদক ‘কিটামিন’ তৈরির ল্যাব, ৩ চীনা নাগরিক গ্রেফতার
উদ্ধার কা পারসেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থানরত একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একই দিন রাতে উত্তরা পশ্চিম থানার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিনজন চীনা নাগরিককে আটক করা হয়।
ডিএনসির মহাপরিচালক বলেন, অভিযানে রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটের অস্থায়ী ল্যাবে ৬ দশমিক ৩০০ কেজি কেটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য (সালফিউরিক এসিড, ইথানল, অ্যালকোহল), বিভিন্ন ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা জব্দ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব আলামত থেকে প্রতীয়মান হয়, চক্রটি সুসংগঠিতভাবে মাদক প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করেছে দাবি করে হাসান মারুফ বলেন, তারা তরল কেটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করত এবং পরবর্তীতে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করত।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার আসামিরা স্বীকার করেছে যে তারা তরল কেটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করতো। পরে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করতো।
তদন্তের অগ্রগতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে জানিয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার গ্রহণ করতো এবং একই মাধ্যমে বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করতো। তারা কেটামিন প্রক্রিয়াজাত করে সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করতো।
চক্রটি অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি নির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করতো। তারা মূলত টিআরওএম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লেনদেন পরিচালনা করতো এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য গ্রহণ করতো। পরে ৪ থেকে ৫ হাজার ইউএসডিটি সমপরিমাণ অর্থ একত্রে উত্তোলন করতো, যা তাদের কার্যক্রম গোপন রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল।
গ্রেফতার চীনা নাগরিকদের ভ্রমণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, তারা স্বল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন দেশে অবস্থান করতো এবং ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করতো। এ তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটির কার্যক্রম একাধিক দেশে বিস্তৃত এবং বিভিন্ন দেশে পৃথক প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্তাধীন রয়েছে।
হাসান মারুফ বলেন, গ্রেফতার আসামিরা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইল ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তাদের কার্যক্রম গোপন রাখতো। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে। তবে তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ এবং ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এ নেটওয়ার্কের কার্যক্রম ধাপে ধাপে উন্মোচিত হচ্ছে।
মানবদেহে কেটামিনের ক্ষতিকর প্রভাব
কেটামিন একটি শক্তিশালী ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ, যা স্বল্পমেয়াদে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও মূত্রথলির মারাত্মক ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আসক্তির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নিয়মিত সেবনে সহনশীলতা তৈরি হয়ে ডোজ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়, যা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
এই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
টিটি/এমএএইচ/