ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. জাতীয়

দেশি-বিদেশি ২৫০০ আইডি হ্যাক, টাকা না দিলেই ‘জঙ্গি’ বানানোর হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৭:৪৩ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২২

ফিশিং লিংকের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের প্রায় দুই হাজার ৫০০টির মতো ফেসবুক আইডি হ্যাক করেছেন মো. লিটন ইসলাম (২৮) নামের এক প্রতারক। হ্যাকড আইডি থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, স্পর্শকাতর ও গোপন ছবি এবং ভিডিও হাতিয়ে নিতেন আন্তর্জাতিক এ হ্যাকার।

পরে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইডি হ্যাকের বিষয়টি নিজেই জানাতেন। চাহিদা মতো টাকা না দিলে আইডি থেকে নেওয়া গোপন তথ্য, ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন। হুমকিতেও কাজ না হলে ভুক্তভোগীদের ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাতেন। তাতে অনেক ভুক্তভোগী নিজের সামাজিক অবস্থান ও জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে চাহিদা মোতাবেক লিটনকে টাকা দিয়ে দিতেন।

এমনই একজন ভুক্তভোগী গত ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক হ্যাকার লিটন ইসলামের বিরুদ্ধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কদমতলী থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এরপরই মামলার ছায়া তদন্তে নামে ডিবির-সাইবার আ্যন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। মামলার তদন্তকালে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় রোববার (১০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় আশুলিয়ার এনায়েতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হ্যাকার লিটনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে হ্যাকিংয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি সিপিইউ, দুটি মোবাইল ফোন ও ১০টি সিম কার্ড জব্দ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ডিভাইসে তার দখলে থাকা প্রায় আড়াই হাজার দেশি-বিদেশি ফেসবুক আইডি লগইন করার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড পাওয়া যায়।

সোমবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের টিম লিডার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. নাজমুল হক এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, যার কাছে যেভাবে যত টাকা নেওয়া যায় সেটিই করতেন হ্যাকার লিটন। তার চাহিদার সর্বনিম্ন পরিমাণ ছিল ১০ হাজার টাকা। গোপন তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির পরেও যারা টাকা দিতে রাজি না হতো, তাদের জঙ্গি ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতো। লিটন ভুক্তভোগীদের বলতো ‘টাকা না দিলে আপনার আইডি থেকে রাষ্ট্রবিরোধী এমন পোস্ট করা হবে যেন সবাই আপনাকে জঙ্গি মনে করে’। এ ধরনের হুমকির পর ভুক্তভোগীরা ভয়ে তাকে টাকা দিয়ে দিতো।

এ ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে হ্যাকার লিটন ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক কত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, এমন প্রশ্নে এডিসি নাজমুল হক বলেন, হ্যাকার লিটনের কাছে ১০টি সিম কার্ড পাওয়া গেছে। সেগুলোতে বিকাশ ও রকেট অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ওইসব মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ করলে মোট অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ জানা যাবে।

ডিবি কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের এ গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ।

তিনি বলেন, হ্যাকার লিটন প্রথমে অনলাইনে ফিশিং লিংক তৈরি করে ছবি ও ভিডিও যুক্ত করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে। ওই লিংকে ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করার চেষ্টা করার সঙ্গে সঙ্গে সেই ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড হ্যাকারের কাছে চলে যায়। পরে হ্যাকার লিটন সেই আইডির পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে দ্রুত তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এরপর নিয়ন্ত্রিত আইডির মেসেঞ্জারে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি/ভিডিও সংগ্রহ করে ডাউনলোড করে তা সংরক্ষণ করে।

ডিবির এ কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রায় হাড়াই হাজারের মতো ফেসবুক আইডি হ্যাক করেছে আন্তর্জাতিক হ্যাকার লিটন। যেখানে অনেক ভিআইপি ও শিল্পপতিদের অ্যাকাউন্টও রয়েছে। শুধু দেশের নয়, বিদেশি নাগরিকদের আইডিও হ্যাক করেছে সে। হ্যাক করা আড়াই হাজার আইডির মধ্যে অনেক বিদেশি আ্যকাউন্ট পাওয়া গেছে।

হারুন-অর-রশীদ বলেন, গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে লিটন জানিয়েছে, সে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সামাজিক মাধ্যমের আইডি হ্যাক করেছে। এসব আইডি হ্যাক করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল চাঁদাবাজি। হ্যাক হওয়ার পর ভুক্তভোগীর মোবাইলে থাকা সব তথ্য সে নিয়ে নিতো। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে হ্যাকার দেখতো এর মধ্যে নেগেটিভ কোনো তথ্য আছে কি না। নেগেটিভ তথ্য পেয়ে গেলে সে ভুক্তভোগীকে বলতো- ‘আপনার আইডি আমি হ্যাক করেছি। আমাকে টাকা না দিলে আপনার সব গোপন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেবো’।

তিনি আরও বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ও ছবি/ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে ভুক্তভোগীদের অনেকে লিটনকে চাহিদা মতো টাকা দিয়ে দিতো। শুধু বাংলাদেশ নয়, আমেরিকা-ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আইডি হ্যাক করে এভাবেই অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিলো লিটন। এভাবে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বহু ভুক্তভোগীকে সে সর্বস্বান্ত করেছে। হাজার হাজার মানুষ তার প্রতারণার শিকার, জিজ্ঞাসাবাদে আমাদের কাছে এমনটি সে স্বীকারও করেছে। তার এ হ্যাকিং চক্রের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত, যাদের বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।

গোয়েন্দা পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, হ্যাকিং একটি জঘন্যতম অপরাধ। আমরা মনে করি অনেক মানুষ বিশেষ করে অনেক মেয়ে এ ধরনের সমস্যায় পড়েছেন। সামাজিকভাবে লোকলজ্জার ভয়ে তারা এসব তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অনেক সময় শেয়ারও করে না। আর ঠিক এ সুযোগটাই নেয় হ্যাকার ও প্রতারকেরা।

শুধু মেয়েরাই নয়, লিটনদের মতো আন্তর্জাতিক হ্যাকারদের খপ্পরে পড়ে নাকানিচুবানি খেতে হয় অনেক ভিআইপি ও শিল্পপতিদেরও। আমরা তাদের (ভুক্তভোগীদের) তথ্য পেয়েছি, কিন্তু তারা আমাদের কাছে এসব তথ্য আগে বলতে চায়নি। তারা গোপনে টাকা দিতেই থাকে লিটনকে। যখন টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত হয় তখন উপায় না দেখে আমাদের কাছে আসে।

এ ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে ভিকটিমরা শুরুর দিকে যোগাযোগ করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত এসব হ্যাকারকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবে বলে মনে করেন মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হ্যাকারদের কবল থেকে সুরক্ষিত থাকতে বেশকিছু পরামর্শ দেন ডিবি কর্মকর্তা হারুন। পরামর্শগুলো হলো-

# সাইবার স্পেসে অপরিচিত কোনো আইডি থেকে পাঠানো লিংকে প্রবেশ না করা।
# সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কোনো আইডির সঙ্গে বন্ধুত্ব না করা।
# সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথাযথ সিকিউরিটি সেটিংস ব্যবহার করা।
# সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো স্পর্শকাতর তথ্য, ছবি/ভিডিও শেয়ার না করা।

টিটি/এমকেআর/এএসএম