কর্মের তাগিদে তুচ্ছ জীবনের মায়া
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চলছে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ছাড়া/ছবি: জাগো নিউজ
হাতে নেই গ্লাভস, মুখে নেই মাস্ক। চোখেও নেই সুরক্ষার কোনো সরঞ্জাম। এভাবেই কেউ লোহার পাত কাটছেন, কেউ জাহাজ-লঞ্চের গায়ে লেগে থাকা মরিচা ওঠাচ্ছেন। আবার কেউ জাহাজের উপরের অংশে রং করছেন। এভাবে কাজ করতে গিয়ে আগুনে হাত পুড়ছে কারও, কেউ হচ্ছেন বৈদ্যুতিক শকের শিকার। এছাড়া কেমিক্যাল, ধুলা আর গ্যাসের কারণে শরীরের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হচ্ছে, যা তাৎক্ষণিক দেখা বা বোঝা যাচ্ছে না। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। এমন অনিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়েই চলছে বুড়িগঙ্গার তীরে কেরানীঞ্জের ডকইয়ার্ডগুলো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে ডকইয়ার্ডে কাজ করার ফলে এমন সব সমস্যা হয়, যা শ্রমিকরা বুঝতেও পারেন না। দীর্ঘ মেয়াদে দৃশ্যমান হয় সেসব ক্ষতি।
অন্যদিকে, এভাবে কাজ করা নিয়ে মালিক, শ্রমিক ও ঠিকাদাররা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। তবে সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি কোনো পক্ষ থেকেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কেরানীগঞ্জে গড়ে উঠেছে ৫০টির বেশি জাহাজ-লঞ্চ নির্মাণ ও মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান। চর মীরেরবাগ ও চর কালীগঞ্জ এলাকায় বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে চলছে পণ্যবাহী কার্গো ভেসেল ও যাত্রীবাহী লঞ্চ তৈরির কাজ। পাশাপাশি পুরোনো জাহাজ ও লঞ্চ সংস্কারের কাজও হচ্ছে ইয়ার্ডগুলোতে। শ্রমিকরা সেখানে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন বছরের পর বছর। সেখানে শিশু শ্রমিকরাও আছে।
প্রায় প্রতিটি ইয়ার্ডেই কার্গো জাহাজ ও লঞ্চের নির্মাণ এবং সংস্কারের কাজ করছেন শ্রমিকরা। তবে কারোই কোনো ধরনের সেফটিগার্ড, হ্যান্ড গ্লাভস, বিশেষ পোশাক, জুতা বা নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি নেই।
আরও পড়ুন: রেলস্টেশনে রাত কাটিয়ে ভোর হলেই বিক্রি হন তারা
এছাড়া এই ডকইয়ার্ডগুলোর পাশেই কালীগঞ্জে গড়ে উঠেছে জাহাজের পাখা, হুইলসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশের কারখানা। সেগুলোতেও একইভাবে কাজ করছেন শ্রমিকরা। এর বাইরে সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থাও নেই। ফলে সেখানকার বায়ুদূষণ পৌঁছেছে চরম পর্যায়ে।
ডকইয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, সৌন্দর্যবর্ধন বা মেরামতের জন্য জাহাজ ডকে ওঠানো হয়। সেগুলো মেরামতের জন্য জাহাজ মালিকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করেন ঠিকাদাররা। শ্রমিকরা কাজ করেন দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন ওই এলাকায়।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্মাণ শ্রমিকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেন। ভারী এসব কাজ করতে গিয়ে জখম হওয়া নিত্যদিনের ব্যাপার। তাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম বলতে কেবল নিজের গামছা। পাশাপাশি বেতন-ভাতাও যথা সময়ে পাওয়া যায় না। বকেয়া আদায়ে তাদের আন্দোলন-ধর্মঘটও করতে হয়।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ভয়ংকর সিসা দূষণ, হৃদরোগে বছরে লাখো মানুষের মৃত্যু
ডকইয়ার্ড শ্রমিক পারভেজ হাসান বলেন, আমরা সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করি। মাঝে দুপুরে খাওয়ার জন্য ১ ঘণ্টা সময় পাই। ১২-১৩ ঘণ্টা ডিউটি করে আমদের বেতন দিনে মাত্র ৪০০ টাকা। এ লাইনে গত ১০ বছর থেকে আছি। অনেক অভিজ্ঞতা থাকলেও বেতন বাড়েনি। অন্যান্য যে কোনো জায়গায় একই পরিশ্রম করলে আমরা আরও বেশি আয় করতে পারতাম। কিন্ত এখানে সে সুযোগ নেই। ঈদের সময় বোনাস নেই, অসুস্থ বা দুর্ঘটনার শিকার হলে চিকিৎসা নেই।
২৫ বছর ধরে ডকইয়ার্ডে কাজ করেন সোহেল। বর্তমানে কাজ করছেন রহমান ডকইয়ার্ডে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এই ডকইয়ার্ডগুলোতে আমরা কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হই। আমাদের এখানে নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবে না। ইয়ার্ড মালিকরা কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জামই দেন না। প্রতিটি মুহূর্তে কাজ করার জন্য আমাদের গ্লাভস দরকার। গ্লাভস না থাকলে হাতে ফোসকা পড়ে, হাত পুড়ে যায়। চোখের জন্য গ্লাস দরকার। অনেকে মুখে গামছা বেঁধে কাজ করে। এভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
এমন পরিবেশে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল জাগো নিউজকে বলেন, ডকইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা যন্ত্রের অভাবে হাত পুড়ে যাওয়া, শরীর মারাত্মক জখম হওয়া- এগুলো প্রতিনিয়ত ঘটছে। পাশাপাশি জাহাজের পাত কাটার সময় আগুন লেগে হাত-পা পুড়ে যায়। ওয়েল্ডিং করার সময় আগুনের যে রশ্মি, সেটিকে প্রতিরোধ করার মতো বিশেষ গ্লাস দরকার। সেগুলোও থাকে না।
আরও পড়ুন: শিপইয়ার্ডে বিস্ফোরণে প্রাণ গেল শ্রমিকের
তিনি আরও বলেন, এভাবে কাজ করার সময় কিছু কিছু সমস্যা হয় যেটি শ্রমিকরাও বুঝতে পারে না। জাহাজগুলো যখন মেরামত করার জন্য ডকে ওঠানো হয়, তখন তা পরিষ্কার থাকে না। জাহাজের ভেতরে বিভিন্ন রাসয়নিক পদার্থ থাকে। সেগুলো শরীরে গিয়ে অনেক ক্ষতি করে। এছাড়া প্রতি মুহূর্তে তারা যে শব্দের মধ্যে থাকে, এটি দীর্ঘমেয়াদে কানের সমস্যা তৈরি করে।
কাজের পরিবেশ এমন কেন? এ নিয়ে কেরানীগঞ্জের কয়েকজন ডকইয়ার্ড মালিক জাগো নিউজকে জানান, আসলে আমরা কন্ট্রাক্টরকে কাজ দেই। তাদের ভালো পরিমাণ টাকাও দিয়ে থাকি। তারা শ্রমিকদের কী পরিমাণ টাকা দেয় সেটি আমাদের জানা নেই।
শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে তারা বলেন, সবার জন্য আমাদের সরঞ্জাম ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। তবে নিরাপত্তার জন্য আমরা কিছু পদক্ষেপ নেবো।
ডকইয়ার্ড শ্রমিক সমিতির সভাপতি কামাল, যিনি একজন কন্ট্রাক্টর। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এখানে যারা কাজ করে তারা ১০-১৫ বছর ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই কাজ করে যাচ্ছে। নূন্যতম গ্লাভস, হেলমেট দু-একটা ডকইয়ার্ড ছাড়া অন্য ডকে দেওয়া হয় না। নিরাপত্তা সরঞ্জামের সঙ্গে যে বিষয়টি বেশি জরুরি, কোনো শ্রমিক অসুস্থ হলে তেমন সুযোগ সুবিধা পায় না। শিপইয়ার্ড মালিকরা আমাদের মজুরি দিতেও ঝামেলা করে।
এ নিয়ে ডকইয়ার্ড মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও হোসেন ডকইয়ার্ড-এর মালিক মাসুদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, কাজ করতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকদের শারীরিক যে ক্ষতি, শ্রমিকরা মাঝে মাঝে দুর্ঘটনার শিকার হয়, এগুলো ঠিক। কিন্তু শ্রমিকরাই নিরাপত্তার সামগ্রী ব্যবহার করতে আগ্রহী হয় না। কিছু শ্রমিক আগ্রহী। কিন্তু অধিকাংশ শ্রমিকই নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার করে কাজ করতে অভ্যস্ত নয়। আমি আমার ডকইয়ার্ডে শ্রমিকদের জন্য গ্লাভস, জুতা এনে রেখেছি। কয়েকদিন ব্যবহার করার পর ফেলে রেখেছে। শ্রমিকদেরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রামের ডকইয়ার্ডে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে। এখানকার লোকাল ডকইয়ার্ডে সরকার থেকেও শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্যোগ নেই।
আরএ/এমএইচআর/জিকেএস