শোকাতুর রাজনীতি জনআকাঙ্ক্ষা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রতীক্ষা
নতুন বছরের সূর্যোদয় সবসময়ই নতুন আশার বার্তা নিয়ে আসে। তবে ২০২৬ সালের এই নতুন ভোরটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তন নয়, বরং এটি এক গভীর আত্মোপলব্ধি এবং পুনর্গঠনের বছর। গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংস্কারের লড়াই এবং জনমতের পরিবর্তনের পর দেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ-পরবর্তী বাস্তবতায় এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চলে যাওয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের শূন্যতা নয়, বরং কয়েক দশকের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক রাজনীতির একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। এই নতুন বাস্তবতায়ই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সীমা পার হয়েছে গত ২৯ ডিসেম্বর। দেশ এখন পুরোপুরি নির্বাচনি আবহে।
বলতে গেলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভাগ্যনির্ধারক দিন হতে যাচ্ছে। একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা ও সংস্কার প্রক্রিয়ার পর এই জাতীয় নির্বাচন কেবল জনমত প্রতিফলনের মাধ্যম নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনর্গঠনের এক মহাপরীক্ষা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—এবারের ভোট হবে প্রকৃত অর্থেই অংশগ্রহণমূলক এবং কারচুপিমুক্ত।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এখন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের লড়াই নয় বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাতের বদলে সমঝোতার একটি সূক্ষ্ম তাগিদ অনুভব করা যাচ্ছে, যা স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক।
একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রথম শর্ত হলো ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোটাররা যেন কোনো চাপ বা ভয়ভীতি ছাড়া তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে নিরাপদ রাখা জরুরি।
গণতন্ত্র তখনই সার্থক হয় যখন সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে হলে সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিশেষ দলকে সুবিধা না দিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সরকারের পাশাপাশি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নৈতিক বাধ্যবাধকতা।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা হবে ইতিহাসের পাতায় দালিলিক প্রমাণের মতো। কমিশনকে প্রমাণ করতে হবে তারা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুগত নয়, বরং সংবিধানের রক্ষক। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শতভাগ নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করার চ্যালেঞ্জ কমিশনকে দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করতে হবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কেবল প্রশাসন নয়, নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রার্থীরা যেন জনকল্যাণমুখী ইশতেহার নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হন এবং ভোট যেন পেশিশক্তি বা অর্থের বিনিময়ে না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের কার্যকর পর্যবেক্ষণ নির্বাচনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
দুই.
গত বছর ‘সংস্কার’ শব্দটি ছিল বহুল আলোচিত। ২০২৬ সালের রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়ী সংস্কার। নাগরিকরা এখন আর কেবল শাসক পরিবর্তন চায় না, তারা চায় ব্যবস্থার পরিবর্তন। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে নতুন বছরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইয়ে না মেতে, রাষ্ট্র সংস্কারের রোডম্যাপ স্পষ্ট করতে হবে।
২০২৪-২৫ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তীসময়ে ২০২৬ সাল হবে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক পরিপক্বতা প্রমাণের বছর। রাজনীতিতে মেধা ও তারুণ্যের সংমিশ্রণ এখন সময়ের দাবি। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এবং জনহিতকর রাজনীতির চর্চা তরুণদের হাত ধরেই শুরু হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা এবং নতুন নেতৃত্ব জায়গা করে দেওয়া এখন আর শৌখিনতা নয়, বরং টিকে থাকার শর্ত।
সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতির সার্থকতা ধরা পড়ে বাজারের ব্যাগে। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুর্নীতি রোধ করাই হবে ২০২৬ সালের রাজনীতির মূল পরীক্ষা। রাজনীতি যদি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই রাজনীতির ওপর জনগণের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হবে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ব্যাংকখাতে শৃঙ্খলা ফেরানো রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রধান অংশ হওয়া উচিত।

বিদ্বেষ আর বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি গড়ে তোলা ২০২৬ সালের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সংস্কৃতি চালু করতে হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে প্রতিযোগিতার রাজনীতিই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
২০২৬ সাল হোক অর্জনের বছর। আমরা এমন এক রাজনীতির স্বপ্ন দেখি যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার হবে প্রশ্নাতীত এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ কাজ করবে জনগণের সেবায়। ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং সেবার মানসিকতা হোক নতুন বছরের রাজনীতির মূলমন্ত্র। নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা—রাজনীতি হবে মানুষের জন্য, মানুষ রাজনীতির জন্য নয়।নতুন বছরে সুস্থ ধারার রাজনীতির জয় হোক।
তিন.
খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরবর্তীসময়ে এক নতুন বাস্তবতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বিএনপির ঐক্য ও শক্তির মূল উৎস। তার মৃত্যু-পরবর্তীসময়ে দলের ভেতরে ঐক্য ধরে রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে এটি দলের জন্য একটি নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। দীর্ঘদিনের 'ব্যক্তিনির্ভর' রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দলীয় কাঠামো ও যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে বিএনপি কীভাবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিজেদের প্রমাণ করে, তা দেখার বিষয়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় দল এখন এক নতুন সাংগঠনিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আবেগীয় ঢেউ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তার কারাজীবন এবং অসুস্থতা নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটেছে এক গভীর শোকের আবহে। এই জনআবেগ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটারদের একটি বড় অংশ এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারে, যা ভোটব্যাংকে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।
নতুন প্রজন্মের ভোটারদের একটি বড় অংশ বেগম জিয়ার শাসনামলের চেয়ে তার পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামই বেশি দেখেছে। তার প্রয়াণের পর তরুণরা এখন ব্যক্তিত্বের চেয়ে দলের ইশতেহার, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং আগামীর নেতৃত্বের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এটি দেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক উপাসনা কমিয়ে আদর্শিক রাজনীতির পথ প্রশস্ত করছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এখন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাতের বদলে সমঝোতার একটি সূক্ষ্ম তাগিদ অনুভব করা যাচ্ছে, যা স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরবর্তী বাংলাদেশ এখন এক ‘পোস্ট-ক্যারিশমেটিক’ নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ করেছে। এই নতুন বাস্তবতা আমাদের শেখায় যে, নেতা নশ্বর কিন্তু রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র অবিনশ্বর। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের রায়ই নির্ধারণ করবে এই নতুন বাস্তবতায় দেশের রাজনীতি কোন পথে এগোবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে একটি সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হোক ২০২৬ সালের বড় প্রত্যাশা।
চার.
চলতি বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন ও এর মাধ্যমে একটি নতুন সরকারের পথচলা। নির্বাচন হোক বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয়। যদি এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তবেই বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে এবং দেশ এক নতুন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যুগে প্রবেশ করবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিজয়ী ও বিজিত—উভয় পক্ষকেই জনরায় মেনে নেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরিহার করে সংসদকে কার্যকর করা এবং দেশের উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করাই হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এএসএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষ - মতামত
- ১ শোকাতুর রাজনীতি জনআকাঙ্ক্ষা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রতীক্ষা
- ২ নিজের সামর্থ্য বুঝে সঠিক পথ বেছে নেওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা
- ৩ হাদি হত্যা মামলার আসামী ফয়সালের লোকেশন নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
- ৪ সশস্ত্র বাহিনী ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যেন অলীক স্বপ্ন
- ৫ কেন বারবার টার্গেটে ম্যানচেস্টার–সিলেট রুট?