অসহায়ত্বের এক নীল দহন: আমার স্ত্রী ও বর্তমান যুদ্ধবাজ পৃথিবী
আমার স্ত্রী নাজমুন নাহার খানম। গত তিনটি বছর ধরে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়ছে সে। চোখের সামনে একজন প্রাণবন্ত মানুষকে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেখা যে কতটা যন্ত্রণার, তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে। আজ তার সেই শীর্ণ দেহটি আর এই মরণঘাতি রোগের ভার সইতে পারছে না।
চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে আমরা আজ ক্লান্ত, নিঃস্ব। এক অসীম বেদনা আর অনিশ্চয়তা সারাক্ষণ আমার পরিবারকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। হাসপাতালের বারান্দায় কিম্বা ক্লিনিকে ঘুরতে ঘুরতে দেখেছি আমার মতো কত শত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর অসহায়ত্ব।
অথচ বড় অদ্ভুত এই পৃথিবী! যেখানে মানুষের জীবন বাঁচাতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে আজ বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা। এক দেশ অন্য দেশকে ধ্বংস করতে উন্মত্ত হয়ে বোমা ছুঁড়ছে। অকাতরে মরছে নিষ্পাপ শিশু, নারী আর বৃদ্ধ। চিকিৎসার অভাবে যখন প্রাণ নিভে যাচ্ছে, তখন যুদ্ধের পেছনে ব্যয় হচ্ছে কোটি কোটি অর্থ। সভ্যতার এই বৈপরীত্য আর প্রিয়তমা স্ত্রীর এই কষ্ট—সব মিলিয়ে এক গভীর শূন্যতা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
দুই.
মানবসভ্যতার প্রগতির জয়গান আজ দিকে দিকে। আমরা মঙ্গলে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অসাধ্য সাধনের দাবি করছি। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি বড়ই করুণ। যে সভ্যতা ক্ষুদ্র এক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন বা ‘ক্যান্সার’ রুখতে আজও হিমশিম খাচ্ছে, সেই সভ্যতা কেন একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতায় এতোটা নিবেদিত? প্রশ্ন জাগে, আমাদের বিজ্ঞানের লক্ষ্য কি জীবন রক্ষা, নাকি পরিকল্পিত জীবন হরণ?
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে পিলে চমকে ওঠার মতো তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই বিপুল অর্থ দিয়ে পৃথিবীর প্রান্তিক দেশগুলোর চরম দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব ছিল বহু আগেই। এর বিপরীতে, মরণব্যাধি ক্যান্সার গবেষণায় বৈশ্বিক বিনিয়োগ এই সামরিক বাজেটের একটি নগণ্য অংশ মাত্র। অথচ প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২ কোটি মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে। একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র বা নিউক্লিয়ার সাবমেরিন তৈরি করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তা দিয়ে হয়তো কয়েকশ বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল এবং উন্নত গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। রাষ্ট্রশক্তির কাছে আজ জীবনের চেয়ে আধিপত্যই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
ক্যান্সার যেমন শরীরের সুস্থ কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়, যুদ্ধও ঠিক তেমনি সমাজের প্রাণশক্তিকে কুরে কুরে খায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সশস্ত্র সংঘাত বা যুদ্ধ সরাসরি ক্যান্সার রোগীদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। চলমান বিভিন্ন যুদ্ধের কারণে ধ্বংস হচ্ছে হাসপাতাল, ব্যাহত হচ্ছে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির মতো জরুরি চিকিৎসা। ইউক্রেন বা গাজার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় রোগ নির্ণয়ে মাত্র ৪ মাস বিলম্বের ফলে হাজার হাজার অতিরিক্ত ক্যান্সার মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধের বারুদ আর রাসায়নিক বিষক্রিয়া পরোক্ষভাবে ক্যান্সার সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবেও চিহ্নিত হচ্ছে। অর্থাৎ, মানুষ একদিকে প্রাকৃতিকভাবে ক্যান্সারে মরছে, অন্যদিকে যুদ্ধের মাধ্যমে ‘কৃত্রিম ক্যান্সার’ তৈরি করে মৃত্যুকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২ কোটি মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে। একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র বা নিউক্লিয়ার সাবমেরিন তৈরি করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তা দিয়ে হয়তো কয়েকশ বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল এবং উন্নত গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। রাষ্ট্রশক্তির কাছে আজ জীবনের চেয়ে আধিপত্যই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এখনই সময় বিশ্বনেতাদের বিবেক জাগ্রত করার। সভ্যতার মাপকাঠি যেন মারণাস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং কতগুলো প্রাণ অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল—তা দিয়ে নির্ধারিত হয়। পৃথিবীটা বারুদ আর ধ্বংসের নয়, হোক প্রতিটি নিশ্বাসের সুরক্ষার।
ক্যান্সারের অর্থনৈতিক বোঝা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও এক বড় ধাক্কা। ২০২০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ক্যান্সারের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হতে পারে আনুমানিক ২৫.২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিশাল ক্ষতি সত্ত্বেও দেশগুলোর অগ্রাধিকার পাল্টায়নি। তারা জনস্বাস্থ্যের চেয়ে কামানের গোলার পেছনে বিনিয়োগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। একজন সাধারণ মানুষ যখন তার সহায়-সম্বল বিক্রি করেও ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারে না, তখন অন্য প্রান্তে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে শহর ধ্বংসের মহড়া চলে—এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?
তিন.
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই বৈপরীত্য আরও বেশি প্রকট এবং যন্ত্রণাদায়ক। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ১.৫ থেকে ২ লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন লক্ষাধিক। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যক রোগীর বিপরীতে বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল।
বাংলাদেশ ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কেমোথেরাপি ওষুধ এবং রেডিওথেরাপির যন্ত্রপাতির জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক যুদ্ধের ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) ভেঙে পড়ে এবং ডলারের সংকট তীব্র হয়। ফলে জীবনরক্ষাকারী ক্যান্সার ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে ওষুধের কাঁচামালের দাম ও পরিবহন খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে অনেক নিম্নবিত্ত পরিবার চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের (৫%) তুলনায় অনেক কম। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার দোহাই দিয়ে সামরিক খাতের ব্যয় প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। যদি এই সামরিক বাজেটের একটি ক্ষুদ্র অংশ জেলা পর্যায়ে ক্যান্সার স্ক্রিনিং সেন্টার স্থাপনে ব্যয় করা হতো, তবে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল।
ক্যান্সার চিকিৎসা বাংলাদেশে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত পরিবারের প্রায় ৭০ শতাংশই চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। মানুষ যখন ভিটেমাটি বিক্রি করে ঢাকা বা বিদেশের হাসপাতালে দৌড়াচ্ছে, তখন বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলারের মারণাস্ত্র তৈরি কেবল এক নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।
যুদ্ধের ফলে ব্যবহৃত রাসায়নিক এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন পরোক্ষভাবে বাংলাদেশে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নদীমাতৃক এই দেশে শিল্পবর্জ্য ও বায়ু দূষণ ইতিমধ্যেই এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করেছে, যা ক্যান্সার কোষের বিস্তারে সহায়ক। বিশ্বনেতারা যখন যুদ্ধের ময়দানে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলো পরিবেশগত বিপর্যয়ে ধুঁকছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার মহামারির দিকে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধ মানে কেবল টিভির পর্দায় দেখা কোনো ধ্বংসলীলা নয়, বরং এটি তাদের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়া আর উন্নত চিকিৎসার সুযোগ হারানো। রাষ্ট্র যখন মহৎ উদ্দেশ্য ভুলে ধ্বংসাত্মক পথে হাঁটে, তার খেসারত দিতে হয় ক্যান্সারের সাথে লড়াই করা এক নিঃস্ব বাবাকে কিংবা তার সন্তানকে। তাই বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের উন্মাদনা বন্ধ করে সেই অর্থ ও মেধা মরণব্যাধি জয়ের লড়াইয়ে স্থানান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
চার.
ক্যান্সার কোনো জাতি, ধর্ম বা রাষ্ট্রের একক শত্রু নয়; এটি মানবজাতির সাধারণ শত্রু। আর যুদ্ধ হলো মানুষের নিজের তৈরি করা এক আত্মঘাতী ব্যাধি। আমরা যদি সামরিক বাজেটের মাত্র এক-দশমাংশও মরণব্যাধি নিরাময় ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় করতে পারতাম, তবে হয়তো ‘ক্যান্সার’ শব্দটি আজ আর ভয়ের কারণ হতো না। এখনই সময় বিশ্বনেতাদের বিবেক জাগ্রত করার। সভ্যতার মাপকাঠি যেন মারণাস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং কতগুলো প্রাণ অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল—তা দিয়ে নির্ধারিত হয়। পৃথিবীটা বারুদ আর ধ্বংসের নয়, হোক প্রতিটি নিশ্বাসের সুরক্ষার।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/জেআইএম