ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

ভিসা জটিলতা

বাংলাদেশিদের জন্য ছোটো হয়ে আসছে পৃথিবী

ড. হারুন রশীদ | প্রকাশিত: ০৯:১৮ এএম, ১০ জানুয়ারি ২০২৬

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য বিদেশ ভ্রমণ বা অভিবাসনের ক্ষেত্রে ভিসা পাওয়া ক্রমেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। এই সংকটের পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু বিষয়ের জটিল মিশ্রণ দায়ী। ভিসা জটিলতায় আমাদের বিদেশে ভ্রমণ প্রায় আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

ভিসা জটিলতা আরও বাড়ছে। ভিসা পেতে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন শর্ত। এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিজনেস (ব্যবসা) ও ট্যুরিস্ট (পর্যটক) ভিসার জন্য বাংলাদেশিদের পাঁচ থেকে ১৫ হাজার ডলার জামানত দিতে হবে। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশিদের জন্য এ নিয়ম কার্যকর হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর আগস্টে জাম্বিয়া ও মালাউইর নাগরিকদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ‘ভিসা বন্ড’ (ভিসা পেতে জামানত) বাধ্যতামূলক করে। এরপর আরো কয়েকটি দেশকে ওই তালিকায় যোগ করা হয়েছিল।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশকেও ‘ভিসা বন্ড’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষে অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশের জন্য ‘ভিসা বন্ড’ চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আগে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভ্রমণ ভিসা দিত। সম্প্রতি এ সংখ্যাটি নেমে গেছে দুই লাখেরও কমে।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ করে দেয় ভারত। আর ঘোষণা ছাড়াই ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার অনেক দেশের ভিসা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে।

কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলোও ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক কম ভিসা দিচ্ছে। প্রতিবেশী ভারতের অবস্থায়ও তাই। আগে প্রতিদিন যেখানে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ ভারতে যাওয়ার জন্য আবেদন করতো, সেখানেও বর্তমানে মাত্র ১৫০০ থেকে ২০০০ মানুষ আবেদন করছে। এরমধ্যে বেশিরভাগই মেডিক্যাল ভিসার আবেদন।

একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সেই দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অনেক উন্নত দেশ তাদের ভিসা নীতি কঠোর করেছে। নিরাপত্তার অজুহাতে অনেক দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ধীর করে দিয়েছে।

কিছু সংখ্যক বাংলাদেশী নাগরিক ভিজিট ভিসা বা স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের পর দেশে ফিরে না আসার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে ভিসা প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে, যা সৎ ভ্রমণকারীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তি কঠিন করে তোলে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে দেশে ফিরে আসা গুরুত্বপূর্ণ।

ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে জাল নথিপত্র বা ভুয়া তথ্য ব্যবহারের কিছু ঘটনা ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই ধরনের ঘটনা ভিসা কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর করে তোলে, যার ফলে সাধারণ আবেদনকারীদেরও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সঠিক তথ্য ও কাগজপত্র জমা দেওয়া ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য অত্যাবশ্যক।

আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট সূচকে একটি দেশের অবস্থান সেই দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের বর্তমান র্যাঙ্কিং উন্নত দেশগুলিতে ভিসা পেতে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। পাসপোর্টের মান উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন অনেক সময় ভিসা নীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বা অর্থ পাচার সংক্রান্ত কঠোর নীতিমালার কারণেও ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কঠিন হতে পারে, যা সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

ভিসা প্রাপ্তির সংকট নিরসন এবং বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও ব্যক্তিগত—উভয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উন্নত দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশিদের যাওয়ার প্রবণতা বেশি (যেমন: ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য), তাদের সাথে 'ভিসা ফাসিলিটেশন এগ্রিমেন্ট' বা ভিসা সহজীকরণ চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশে অবস্থিত অনেক বিদেশি দূতাবাস প্রচুর সংখ্যক ভিসা আবেদনের চাপ সামলাতে পর্যাপ্ত জনবল বা কারিগরি অবকাঠামোর অভাবে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। এর ফলে আবেদনকারীদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে বা ভিসা প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। একই সাথে, নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশের আইন ও নিয়ম মেনে চলা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে আসা দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে বাংলাদেশের পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করবে, যা ভিসা প্রাপ্তি সহজ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

দুই.
ভিসা প্রাপ্তির সংকট নিরসন এবং বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও ব্যক্তিগত—উভয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উন্নত দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশিদের যাওয়ার প্রবণতা বেশি (যেমন: ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য), তাদের সাথে 'ভিসা ফাসিলিটেশন এগ্রিমেন্ট' বা ভিসা সহজীকরণ চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।

শুধু অদক্ষ শ্রমিক না পাঠিয়ে দক্ষ ও পেশাদার জনবল পাঠানোর দিকে নজর দিতে হবে। আইটি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, নার্স ও চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ কোটা বা সহজ ভিসা স্কিম চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে চুক্তি করা যেতে পারে। দক্ষ জনশক্তি কখনোই কোনো দেশের জন্য বোঝা হয় না, বরং তারা সম্মানের সাথে ভিসা পায়।

ভিসা জটিলতা: বাংলাদেশিদের জন্য ছোটো হয়ে আসছে পৃথিবী

ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, কাজের অভিজ্ঞতা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করতে হবে। সরকারিভাবে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে, যা বিদেশি দূতাবাসগুলো প্রয়োজনে যাচাই করতে পারবে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বিদেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

বিদেশে গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের পর ফিরে না আসার প্রবণতা রোধে নাগরিকদের সচেতন করতে হবে। যারা ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে অবৈধভাবে থেকে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা বা জরিমানা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ই-পাসপোর্ট এবং বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও আধুনিকায়ন করতে হবে। ইন্টারপোলসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থাগুলোর সাথে তথ্য আদান-প্রদান বাড়িয়ে অপরাধীদের পাসপোর্ট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাসপোর্টের বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং উন্নত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

ঢাকাস্থ বিদেশি দূতাবাসগুলোর কনস্যুলার সেবা যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে আবেদনকারীরা হতাশ হন; এক্ষেত্রে ডিজিটাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম এবং দ্রুত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় দূতাবাসগুলোকে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বা তথ্য সরবরাহ করা যেতে পারে।

আবেদনকারী হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সঠিক তথ্য প্রদান করা। ট্রাভেল এজেন্টদের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে সরাসরি দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকে সঠিক নিয়ম জেনে আবেদন করা উচিত। আপনি যদি ভিসার শর্ত মেনে চলেন এবং সময়মতো ফিরে আসেন, তবে তা ভবিষ্যতে আপনার এবং দেশের অন্য নাগরিকদের জন্য ভিসার দুয়ার উন্মুক্ত রাখবে।

ভিসা সংকট কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় ইমেজের বিষয়। সরকারের সঠিক নীতি এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ—এই দুইয়ের সমন্বয়েই কেবল এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের সফলতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা সারাবিশ্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারি। এটা হলেই বাংলাদেশিদের জন্য সারা বিশ্বে ভ্রমণ সহজতর হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএস