ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

নির্বাচনে সেনাবাহিনীর মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখা অপরিহার্য

সিরাজুল ইসলাম | প্রকাশিত: ০৩:২৮ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি কেবল আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বড় উপলক্ষ। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভোটগ্রহণকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবাহিনীর ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সক্রিয় ও দৃশ্যমান উপস্থিতি নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে একটি বড় আস্থার জায়গা তৈরি করে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেসব নির্বাচনে নিরাপত্তাবাহিনীর উপস্থিতি শক্ত, সুসংগঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী ছিল, সেসব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। মানুষ যখন ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে ভয় পায় না, যখন ভোট দেওয়ার সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে না, তখনই একটি নির্বাচন সত্যিকারভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে। এই নিরাপত্তাবোধ তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীগুলোর।

সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এ দেশের মানুষের আস্থা বহুদিনের। দুর্যোগকালীন উদ্ধার অভিযান, সীমান্ত নিরাপত্তা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা জাতীয় সংকট- প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। ফলে নির্বাচনের সময় জনগণ স্বাভাবিকভাবেই তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের মনোভাব এমন- নির্বাচনের মাঠে সেনাবাহিনী রয়েছে, ফলে মাঠ সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। এই আস্থাই একটি বড় শক্তি। তবে এই শক্তিকে কার্যকর রাখতে হলে বাহিনীগুলোর মনোবল অক্ষুন্ন রাখা অপরিহার্য।

মনোবল কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি একটি বাহিনীর কার্যক্ষমতার প্রাণশক্তি। মনোবল উঁচু থাকলে একজন সদস্য চাপের মধ্যেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, দায়িত্ব পালনে দৃঢ় থাকতে পারেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও পেশাদার আচরণ বজায় রাখতে পারেন। বিপরীতে, মনোবল দুর্বল হলে সবচেয়ে প্রশিক্ষিত বাহিনীও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারে। নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে এই বাস্তবতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক সময়ের মতো নয়। এখানে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকে, নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাহিনীগুলোর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলে। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের ওপর কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো সামাজিক চাপ, আবার কখনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাজ করে। এই সবকিছু সামলে দায়িত্ব পালন করতে গেলে মানসিকভাবে শক্ত থাকা ছাড়া বিকল্প নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই মানসিক শক্তি বা মনোবল কীভাবে বজায় থাকবে? প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় অবস্থান। নিরাপত্তাবাহিনীকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে, তারা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে এবং এই দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। দায়িত্ব পালনের সময় নেয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্তের জন্য ভবিষ্যতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে হবে না- এই নিশ্চয়তা মনোবলের মূল ভিত্তি।

নির্বাচনের সময় প্রায়ই একটি সমস্যা দেখা যায়- দায়িত্বের সীমা নিয়ে অস্পষ্টতা। কোথায় বাহিনী হস্তক্ষেপ করবে, কোথায় করবে না, কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে- এই বিষয়গুলো যদি পরিষ্কার না থাকে, তাহলে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা দ্বিধায় পড়ে যান। দ্বিধা মানেই সিদ্ধান্তে বিলম্ব, আর সিদ্ধান্তে বিলম্ব মানেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হাতছাড়া হওয়া। তাই নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং আইনি কাঠামো থাকা অত্যন্ত জরুরি।

রাজনৈতিক আচরণও এখানে বড় একটি ফ্যাক্টর। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাবাহিনীর মনোবলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। দায়িত্বশীল বক্তব্য অবশ্যই বাহিনীর সদস্যদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, আর দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। নিরাপত্তাবাহিনীকে নিয়ে সন্দেহ, অবিশ্বাস বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার- নিরাপত্তাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, তারা রাষ্ট্রের বাহিনী। তাদের কাজ হলো সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা। এই মৌলিক সত্যটি যদি রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃত না হয়, তাহলে শুধু নির্বাচন নয়, যেকোনো জাতীয় সংকটেই রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়বে। নিরাপত্তাবাহিনীর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র নিজেই।

মনোবল অক্ষুন্ন রাখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান ও স্বীকৃতি। বাহিনীর সদস্যরা যদি মনে করেন, তাদের কাজকে রাষ্ট্র মূল্যায়ন করছে, তাদের ত্যাগকে সম্মান দিচ্ছে, তাহলে তারা আরো উৎসাহ নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। সম্মান শুধু পদক বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নীতিগত সুরক্ষা, মানবিক আচরণ এবং ন্যায্য ব্যবস্থার মাধ্যমেও প্রকাশ পায়।

নির্বাচনের সময় বাহিনীর সদস্যদের কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, কখনো প্রতিকূল পরিবেশ- এই সবকিছু মিলিয়ে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে চলবে না। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাদের কল্যাণের বিষয়টি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ একজন ক্লান্ত, হতাশ বা অবমূল্যায়িত সদস্যের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশিক্ষণ। নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশেষ ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, উত্তেজিত পরিস্থিতিতে সংযম, আইনের সীমার মধ্যে থেকে কার্যকর পদক্ষেপ- এই সবকিছু নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সদস্যদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে। প্রশিক্ষণ যত ভালো হবে, আত্মবিশ্বাস তত বাড়বে, আর আত্মবিশ্বাসই মনোবলের ভিত্তি।

নির্বাচন শেষে কী হবে- এই প্রশ্নটিও বাহিনীর সদস্যদের মনে কাজ করে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি পরবর্তীতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়, তাহলে এই আশঙ্কা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে। তাই নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের জন্য একটি সুস্পষ্ট পোস্ট-ইলেকশন নীতি থাকা প্রয়োজন, যেখানে বলা থাকবে- দায়িত্ব পালনকারী সদস্যরা রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষিত থাকবেন।

গণতন্ত্রের একটি বড় পরীক্ষা হলো নির্বাচন। আর এই পরীক্ষায় নিরাপত্তাবাহিনী হলো পরীক্ষার পরিবেশ রক্ষাকারী। পরীক্ষার পরিবেশ যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে ফলাফল কখনোই গ্রহণযোগ্য হয় না। ঠিক একইভাবে, নির্বাচনের পরিবেশ যদি নিরাপদ ও শান্ত না হয়, তাহলে সেই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এই নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের মনোবল দুর্বল রাখা রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের শামিল।

সবশেষে বলতে হয়, নিরাপত্তাবাহিনীর মনোবল অক্ষুন্ন রাখা কোনো পক্ষপাতের বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন, এটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই জরুরি। যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের মানসিক শক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত। সেনাবাহিনীর ওপর জনগণের যে আস্থা রয়েছে, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালিত হলেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হবে।

(লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

এইচআর/এএসএম

আরও পড়ুন