ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

যে বোঝে, সে খোঁজে; যে খোঁজে, সে পায়

সাইফুল হোসেন | প্রকাশিত: ১১:৫৪ এএম, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬

মানুষের জীবনের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার ব্যবধান গড়ে দেয় একটি মাত্র গুণ—সত্যানুসন্ধান বা ক্রমাগত খোঁজার মানসিকতা। সৃষ্টির আদি থেকে আজ পর্যন্ত সভ্যতার যত চাকা ঘুরেছে, তার মূলে ছিল মানুষের অদম্য কৌতূহল। কিন্তু এই খোঁজার প্রক্রিয়ার আগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে, তা হলো ‘বোঝা’। কোনো বিষয়ের গুরুত্ব বা তার ভেতরের সম্ভাবনাকে যে অনুধাবন করতে পারে, কেবল সেই সেটি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। প্রচলিত এই আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সত্যটি—'যে বোঝে, সে খোঁজে; আর যে খোঁজে, সে পায়'—আসলে সাফল্যের এক শাশ্বত সূত্র। এটি কেবল একটি দার্শনিক প্রবাদ নয়, বরং আধুনিক মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং সফল মানুষের জীবন দর্শনের এক সমন্বিত রূপ। মহাকবি জালালুদ্দিন রুমি বলেছিলেন, "তুমি যা খুঁজছো, তা-ও তোমাকে খুঁজছে।" কিন্তু এই পারস্পরিক মিলন তখনই সম্ভব, যখন ব্যক্তি তার লক্ষ্যের গুরুত্ব হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করে সন্ধানে নামে।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় সচল থাকলেও এটি কেবল সেই তথ্যগুলোকেই গ্রহণ করে যা তার চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একে বলা হয় ‘সিলেক্টিভ পারসেপশন’। অর্থাৎ, আপনি যখন কোনো বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন, আপনার চোখ তখন চারপাশের হাজারো ভিড়ের মধ্যেও সেই সুযোগটি খুঁজে নিতে শুরু করে। আধুনিক ডেটা সায়েন্স এবং নিউরোসায়েন্সের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে, তাদের মস্তিষ্কের ‘রেটিকুলার অ্যাক্টিভেটিং সিস্টেম’ (RAS) অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একজন উদ্যোক্তা যখন বোঝেন যে তার এলাকায় একটি নির্দিষ্ট সেবার অভাব রয়েছে, তখন তার মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সেবার উৎস, কাঁচামাল এবং বাজার খুঁজতে শুরু করে। এই খোঁজাটা তখন আর শ্রমসাধ্য কাজ থাকে না, বরং তা পরিণত হয় নেশায়। আর এই নিরবচ্ছিন্ন অন্বেষণই তাকে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবী বদলে দেয়া মানুষগুলো প্রথমে সমস্যার গভীরতা বুঝেছিলেন এবং তারপর সমাধানের নেশায় বুঁদ হয়েছিলেন। টমাস আলভা এডিসন যখন বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কারের পথে ছিলেন, তিনি হাজার বার ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন যে আলোর একটি কৃত্রিম উৎস মানবসভ্যতাকে বদলে দেবে। এই গভীর ‘বোঝাপড়া’ তাকে দমে যেতে দেয়নি। তিনি প্রতিবার ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন নতুন ফিলামেন্ট খুঁজেছেন। তার সেই বিখ্যাত উক্তি—"আমি ব্যর্থ হইনি, আমি শুধু ১০,০০০টি পথ খুঁজে পেয়েছি যা কাজ করে না"—প্রমাণ করে যে খোঁজার প্রক্রিয়াটি আসলে শেখারই একটি অংশ। তিনি বুঝেছিলেন বলেই খুঁজেছেন, আর খুঁজেছিলেন বলেই আজ পৃথিবী আলোকিত। আবার অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের কথা ধরা যাক। তিনি বুঝেছিলেন যে প্রযুক্তি কেবল জটিল সার্কিট নয়, এটি হওয়া উচিত মানুষের ব্যবহার উপযোগী ও নান্দনিক। এই বোধ থেকেই তিনি নিখুঁত ডিজাইনের পেছনে ছুটেছেন এবং শেষ পর্যন্ত স্মার্টফোন বিপ্লব ঘটিয়েছেন।

আধুনিক কর্পোরেট ও বিনিয়োগের জগতেও এই সূত্রটি সমান কার্যকর। ওয়ারেন বাফেট যখন কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন, তিনি আগে সেই ব্যবসার অভ্যন্তরীণ শক্তি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ‘বোঝার’ চেষ্টা করেন। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা বার্ষিক প্রতিবেদন পড়েন। সাধারণ মানুষের কাছে যা কেবল অংকের খেলা, বাফেটের কাছে তা হলো একটি কোম্পানির ভাগ্যলিপি। তিনি যখন সেই শক্তির হদিস পান, তখন তিনি সুযোগটি লুফে নেন। বড় বিনিয়োগকারীদের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইনসাইট’। এই ইনসাইট বা অন্তর্দৃষ্টিই হলো বোঝার প্রথম ধাপ। আপনি যদি বাজারের ট্রেন্ড না বোঝেন, তবে আপনি হন্যে হয়ে খুঁজলেও লাভজনক বিনিয়োগ পাবেন না। আর যারা খোঁজে না, সুযোগ তাদের দরজায় এসে কড়া নাড়লেও তারা তা দেখতে পায় না। কারণ, সুযোগ আসে ছদ্মবেশে, যা কেবল অনুসন্ধানী চোখই চিনতে পারে।

জীবন আমাদের ততটুকুই দেয়, যতটুকু আমরা দাবি করি এবং যার জন্য আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। মনে রাখতে হবে, থেমে থাকা মানে পিছিয়ে পড়া। জগৎ নিয়ত পরিবর্তনশীল, আর এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে যারা সত্য ও সুযোগের অনুসন্ধান চালিয়ে যায়, প্রকৃতি তাদের খালি হাতে ফেরায় না। কারণ মহাবিশ্বের অমোঘ নিয়ম হলো—অন্বেষণকারীর জন্য সাফল্যের দুয়ার সব সময়ই উন্মুক্ত। তাই বোঝার চেষ্টা করুন, সন্ধানে নামুন, প্রাপ্তি আপনার সুনিশ্চিত।

ব্যক্তিগত ও পেশাদার জীবনে অনেক সময় আমরা অভিযোগ করি যে ভাগ্য আমাদের সহায় নয়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ভাগ্য অনেক সময় প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে। রোমান দার্শনিক সেনেকা বলেছিলেন, "ভাগ্য হলো সেই মুহূর্ত, যখন প্রস্তুতি সুযোগের দেখা পায়।" এই প্রস্তুতির মূল ভিত্তি হলো জ্ঞান ও অনুসন্ধান। যারা বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার এবং প্রযুক্তির প্রভাব বুঝতে পেরেছে, তারা নতুন নতুন দক্ষতা বা স্কিল খোঁজার পেছনে সময় দিচ্ছে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দশকে সেইসব পেশাজীবীরাই টিকে থাকবে যারা প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান অন্বেষণ করে। যারা পরিবর্তিত পরিস্থিতি বুঝতে অক্ষম, তারা খোঁজার তাগিদ অনুভব করে না এবং দিনশেষে তারা স্থবির হয়ে পড়ে। সুতরাং, পাওয়ার আগে খোঁজা জরুরি, আর খোঁজার আগে বোঝার সক্ষমতা অর্জন করা আবশ্যক।

আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রেও এই কথাটি ধ্রুব সত্যের মতো কাজ করে। সুফি সাধক এবং ঋষিরা যুগ যুগ ধরে বলে এসেছেন যে, স্রষ্টা বা পরম সত্যকে পাওয়ার আগে তাকে পাওয়ার তীব্র তৃষ্ণা থাকতে হয়। এই তৃষ্ণাই হলো ‘বোঝা’। যখন একজন সাধক বুঝতে পারেন যে আত্মিক শান্তিই জীবনের পরম উদ্দেশ্য, তখন তিনি নির্জনে, লোকালয়ে বা নিজের অন্তরে সেই সত্যের সন্ধান শুরু করেন। আমাদের লোকসংগীতের ভাবাদর্শেও লালন শাহ বা হাসন রাজার গানে এই খোঁজার ব্যাকুলতা ফুটে উঠেছে—"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়"। এই যে অচিন পাখিকে চেনার বা বোঝার আর্তি, এটিই মানুষকে সত্যের দুয়ারে পৌঁছে দেয়। যা ভেতরে নেই, তা বাইরে খোঁজা বৃথা—এই বোধোদয় হওয়ার পরই মানুষ প্রকৃত ধন খুঁজে পায়।

উপসংহারে বলা যায় আমাদের জীবন হলো এক বিশাল সমুদ্র, যেখানে অসংখ্য মণি-মুক্তা লুকিয়ে আছে। কিন্তু সমুদ্রের তীরে বসে ঢেউ গুনে কেউ মুক্তা পায় না। মুক্তা সেই পায়, যে সমুদ্রের গভীরতা বোঝে এবং ডুবুরি হয়ে অতলে তলিয়ে দেখার সাহস রাখে। আধুনিক যুগে তথ্যের কোনো অভাব নেই, কিন্তু সেই তথ্যকে জ্ঞানে রূপান্তর করার জন্য প্রয়োজন একাগ্রতা। আপনার লক্ষ্য যদি হয় আর্থিক স্বাধীনতা, তবে আপনাকে অর্থের মনোবিজ্ঞান বুঝতে হবে। আপনার লক্ষ্য যদি হয় মানসিক প্রশান্তি, তবে আপনাকে নিজের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে।

জীবন আমাদের ততটুকুই দেয়, যতটুকু আমরা দাবি করি এবং যার জন্য আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। মনে রাখতে হবে, থেমে থাকা মানে পিছিয়ে পড়া। জগৎ নিয়ত পরিবর্তনশীল, আর এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে যারা সত্য ও সুযোগের অনুসন্ধান চালিয়ে যায়, প্রকৃতি তাদের খালি হাতে ফেরায় না। কারণ মহাবিশ্বের অমোঘ নিয়ম হলো—অন্বেষণকারীর জন্য সাফল্যের দুয়ার সব সময়ই উন্মুক্ত। তাই বোঝার চেষ্টা করুন, সন্ধানে নামুন, প্রাপ্তি আপনার সুনিশ্চিত।

লেখক : “দ্য আর্ট অব কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য আর্ট অব পার্সোনাল ফাইনান্স ম্যানেজমেন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাবো না, দ্য সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট ইত্যাদি বইয়ের লেখক, করপোরেট ট্রেইনার, ইউটিউবার এবং ফাইনান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট।

এইচআর/জেআইএম