ঘরের ভেতর আগুন, বাড়ির ছাদে তালা
গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাড়িতে আগুনে প্রাণ হারান দুই পরিবারের শিশুসহ ছয়জন। তবে আগুনে পুড়ে নয়, ঘন কালো ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে তাদের নির্মম মৃত্যু হয়। স্বজনরা বলছেন, তারা দৌড়ে ছাদে উঠতে পারলে বেঁচে যেতেন। কিন্তু ছাদের দরজায় ছিল তালা।
ছাদ সব সময় খোলা এবং ভাড়াটিয়াদের জন্য সেটি উন্মুক্ত—এরকম সৌভাগ্যবান ভাড়াটিয়ার সংখ্যা ঢাকা শহরে হাতেগোনা। কেন বাড়িওয়ালা ছাদের দরজায় তালা দিয়ে রাখেন কিংবা কেন ছাদে ওঠার মতো পরিবেশ থাকে না—তার অনেকগুলো কারণ আছে। সেসব কারণ বিশ্লেষণের পাশাপাশি ঢাকাসহ বড় শহরের ভাড়াটিয়াদের দৈনন্দিন যন্ত্রণা লাঘবে রাষ্ট্র কী করছে—সেই আলোচনাটিও জরুরি।
উত্তরা ট্র্যাজেডির বিষয়ে গণমাধ্যমের খবর বলছে, অনেকে আগুন থেকে বাঁচতে ছাদের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দরজায় তালা থাকায় ছাদেও উঠতে পারেননি। নিজেদের ফ্ল্যাটে বা সিঁড়িতেই আটকা পড়েন। ধোঁয়ার তীব্রতায় শ্বাস নিতে না পেরে একসময় অনেকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হয়, ‘এই ফ্যামিলিটা ছাদে গেলে বাঁচতে পারতো, কিন্তু ঢাকার বেশিরভাগ বাড়িওয়ালারা ছাদের চাবি ভাড়াটিয়াদের কাছে দিয়ে রাখে না। জানালা দিয়ে চিৎকার করে বলছিল বাঁচাতে, আমরাও যেতে পারছিলাম না আগুনের কারণে। পরে বললাম আপনার ছাদে চলে যান। পরে বলছে ছাদের গেটে তালা দেওয়া।’
অনলাইনে এই খবরের নিচে অসংখ্য মানুষ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কয়েকটা এরকম:
১. তালাটা ভেঙে ছাদে যাওয়া যাইতো..! জীবনটা বাঁচলে তালা হাজারটা কেনা যাইতো।
২. ঢাকার বেশির ভাগ বাসায়তেই ছাদ তালা দেওয়া আর চাবি ভাড়াটিয়াদের কাছে থাকে না। ইভেন কোনো প্রয়োজনেও যদি ছাদের চাবি চাওয়া হয়, বহু কৈফয়তের পর সেইটা পাওয়া যায়।
৩. যেকোনো জায়গায় বাড়িওয়ালাদেরই পাওয়ার। কয়েক বছর পর পর বাড়ি ভাড়া বাড়ায় অথচ সরকার তাদের ট্যাক্স বাড়ায় না।
৪. আমার বাসা খুলনা। আমাদের বাসার ছাদের গেইট সবসময় খোলা থাকে এবং আমরা সব ভাড়াটিয়া যখন খুশি তখন ছাদে যাই। আমাদের বাসার ছাদ উন্মুক্ত।
প্রসঙ্গত, গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরে একটি কেমিক্যালের গোডাউনে আগুন এবং দমবন্ধ হয়ে ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ওই মৃত্যুর পেছনেও ভবনের ছাদ তালাবদ্ধ থাকাকে দায়ী করা হয়। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, কেমিক্যালের গোডাউনে আগুন লাগার পর চারদিকে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দ্রুত আক্রান্ত হন ঠিক পাশের চারতলা পোশাক কারখানার ভবনটির কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাশের কারখানার আগুন দ্রুত সরু গলির ওপারের পোশাক কারখানার ভবনের নিচে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে পোশাক কারখানার কর্মীরা নিচে নামতে পারেননি। আবার ছাদের দরজায় তালা থাকায় ধোঁয়া থেকে বাঁচতে ওপরেও যেতে পারেননি।
এবার আসা যাক কেন ছাদের দরজায় তালা দেয়া থাকে। একাধিক বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে তারা ভাড়াটিয়াদের ছাদে ওঠাকে ভাড়াটিয়ার অধিকার মনে করেন না। কারণ তারা ভাড়া দিয়েছেন বাসা। ছাদ নয়। এইধরনের মানসিকতা অনেকেই পোষণ করেন। এখানে মালিকদের ইগো বা ভাড়াটিয়াদেরকে অধীনস্ত মনে করার সামন্তীয় মানসিকতাও বড় কারণ।
বাড়িওয়ালা যদি মনে করেন যে ভাড়া দিয়েই দায়িত্ব শেষ, মাসে মাসে তিনি শুধু ভাড়া তুলবেন, কিন্তু ভাড়াটিয়ার কোনো সমস্যার সমাধান করবেন না—তাহলে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া সম্পর্ক সাপেনেউলেই থেকে যাবে। একটা কাঙ্ক্ষিত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে না। যদি বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটিয়ার মধ্যে সত্যিই একটা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে না ওঠে তাহলে কিছুদিন পরপর উত্তরা ট্র্যাজেডির মতো ঘটনা ঘটতে থাকে। সংবাদ হবে। টকশোতে আলোচনার ঝড় বয়ে যাবে। পরক্ষণে আরেকটা নতুন ইস্যু এলে সেটি চাপা পড়ে যাবে।
তবে যৌক্তিক কারণও আছে। যেমন নিরাপত্তা। ছাদ খোলা থাকলে আশেপাশের ভবনের ছাদ থেকে চোর-ডাকাত ঢুকতে পারে। যে কারণে অধিকাংশ বাড়ির ছাদে তালা দেয়া থাকে।
দ্বিতীয়ত, ছাদে অনেক সময় অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। যেমন- বিভিন্ন সময়ে ছাদ দিয়ে লাফ দিয়ে কারো আত্মহত্যার বাড়িওয়ালা পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব কারণেও বাড়িওয়ালা চান কেউ যাতে ছাদে উঠতে না পারেন। তৃতীয়ত, ঢাকা শহরের অনেক বাড়ির ছাদেই কৃষি বা ফুলের বাগান আছে-যেগুলোর মালিক বাড়িওয়ালারা। তারা মনে করেন, ছাদ উন্মুক্ত থাকলে ভাড়াটিয়ায় ছাদের ফসল নিয়ে যাবে। ফুল ছিঁড়বেন। গাছ নষ্ট করবেন। সে কারণে তারা ছাদের দরজায় তালা দিয়ে রাখেন।
কিন্তু এই সমস্যারও সমাধান আছে। সেটি হলো, নিরাপত্তার কারণে বাড়ির ছাদ তালা দেয়াই থাকবে। কিন্তু প্রত্যেক ভাড়াটিয়ার কাছে একটি করে চাবি থাকবে। যার যখন প্রয়োজন ছাদে যাবেন। যেসব ছাদে ফুলগাছ বা ফসলের চাষ করা হয়, সেসব ছাদ ব্যবহারে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়া প্রত্যেকেরই আন্তরিকতা ও যত্ন প্রয়োজন। গাছের মালিক বাড়িওয়ালা বলে তার যত্ন নেয়ার দায়িত্ব শুধু তারই, এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
শুধু বাড়ির ছাদে তালা নয়, ঢাকা শহরের ভাড়াটিয়াদের আরও কিছু যন্ত্রণার নাম বছর বছর বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি কিন্তু বিপরীতে কোনো সুযোগ-সুবিধা বাড়বে না; ঘরের ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে বা অন্য কোনো সমস্যা হলে তা ভাড়াটিয়াকে নিজের পয়সায় ঠিক করতে হবে। রাত ১১টার পরে গেট বন্ধ। জরুরি প্রয়োজনে বাসায় ফিরতে ১১টার বেশি বেজে গেলে বাড়িওয়ালা বা কেয়ারটেকার কিংবা দারোয়ানের সঙ্গে ঘ্যাচ ঘ্যাচ অবধারিত। বাসায় অতিথি এলে তার গাড়ি রাখতে হবে বাড়ির বাইরে রাস্তার ওপরে। কিন্তু ভাড়াটিয়াদের এসব যন্ত্রণা লাঘবে রাষ্ট্রের কোনো দায় পরিলক্ষিত হয় না।
১৯৯১ সালে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন নামে একটি আইন করা হয়েছিল–যেখানে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য সরকার কোনো ব্যক্তিকে কোনো এলাকার জন্য ‘নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে বলে বিধান করা হয়। কিন্তু আইন প্রণয়নের ৩৪ বছরেও ঢাকা শহরের কোনো এলাকায় এরকম নিয়ন্ত্রক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১৫ সালে হাইকোর্ট একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটির কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ডিসেম্বর মাস এলেই বাড়িভাড়া বৃদ্ধির মানসিক চাপে ভুগতে থাকেন ভাড়াটিয়ারা। এ বিষয়ে ভাড়াটিয়াদের প্রতিবাদ কোনো কাজে আসে না। বাড়িওয়ালারা স্পষ্ট বলে দেন, পোষালে থাকেন, না হয় চলে যান। কারণ তিনি জানেন, রাগ কিংবা অভিমান করে অথবা আর্থিক কারণে কোনো ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ার পরে ওই বাড়ি বা ফ্ল্যাট অন্য আরেকজন আগের চেয়ে বেশি টাকায় ভাড়া নেবেন।
সরকারি-বেসরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা শহরে যে প্রায় তিন কোটি বা তারও বেশি মানুষ বসবাস করেন, তাদের প্রায় ৭২ শতাংশই থাকেন ভাড়া বাসায়। আয়তন ও জনসংখ্যার হিসাবে ঢাকা সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের একটি। এ শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ—যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই অকল্পনীয়। ন্যূনতম মানবিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই মানুষ এই শহরে থাকতে বাধ্য হয়। এই শহরের বাসা ও ফ্ল্যাট ভাড়ায় নৈরাজ্যের মূল কারণ জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ তথা মানুষের বিকল্প না থাকা।
এরকম বাস্তবতায় সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানিছেন, ঢাকা শহরের বাড়ি ভাড়া ঠিক করে দেবে সিটি করপোরেশন। কিন্তু এখানে বিরাট চ্যালেঞ্জ আছে। কেননা প্রতিটি বাড়ির সুযোগ সুবিধা ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং ভাড়াও ভিন্ন হতে বাধ্য। সে কারণে বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া কঠিন।
আবার এলাকাভেদে বাসা ভাড়া ঠিক করে দেওয়াও সম্ভব নয়। কারণ একই এলাকায়, এমনকি পাশাপাশি দুটি ভবনের মধ্যেই অনেক পার্থক্য থাকে। ফ্ল্যাটের সাইজ, নকশা, নতুনত্ব, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি পার্থক্যের কারণে পাশাপাশি দুটি ভবনের ফ্ল্যাটের ভাড়ায় পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সিটি করপোরেশেন চাইলেও ভাড়া নির্ধারণ করে দিতে পারবে কি না সেটি বিরাট প্রশ্ন।
জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের পরে গত দেড় বছর ধরে যে শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে তার একটি ‘সংস্কার’। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য অনেকগুলো কমিশন হলেও বাড়ি ভাড়ার মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক সমস্যা সমাধানে সরকারের কোনো সংস্কার বা সংস্কারের উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
অর্থনীতির সহজ সূত্র হচ্ছে, যে পণ্যের চাহিদা বেশি কিন্তু জোগান কম, সরকার চাইলেও সেই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। চাকরি, ব্যবসা, সন্তানের পড়ালেখা আর অভিভাবকের চিকিৎসা—সবকিছুর জন্য যে দেশের মানুষকে রাজধানী ঢাকায় আসতে হয়, সেই শহরে বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
মোদ্দা কথা, বাড়িওয়ালারা টিকে থাকেন ভাড়াটিয়ারা আছেন বলে। আবার বাড়িওয়ালারা বাড়ি ভাড়া দেন বলেই ভাড়াটিয়ারা থাকতে পারেন। অর্থাৎ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এখানে বাড়িওয়ালা যদি নিজেকে সুপিরিয়র আর ভাড়াটিয়া নিজেকে তুচ্ছ মনে করেন তাহলে ছাদ খোলা রাখা, রাত ১১টায় গেট বন্ধ, অতিথির গাড়ি বাইরে রাখা, বছর বছর ভাড়া বৃদ্ধি কিংবা ঘরের কোনো কিছু নষ্ট হলে সেগুলো ভাড়াটিয়ার পকেট থেকে দেয়ার প্রবণতাগুলো বন্ধ হবে না। যিনি ভাড়া থাকেন তার যেমন ওই বাড়ির প্রদি দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি বাড়িওয়ালারও।
বাড়িওয়ালা যদি মনে করেন যে ভাড়া দিয়েই দায়িত্ব শেষ, মাসে মাসে তিনি শুধু ভাড়া তুলবেন, কিন্তু ভাড়াটিয়ার কোনো সমস্যার সমাধান করবেন না—তাহলে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া সম্পর্ক সাপেনেউলেই থেকে যাবে। একটা কাঙ্ক্ষিত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে না। যদি বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটিয়ার মধ্যে সত্যিই একটা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে না ওঠে তাহলে কিছুদিন পরপর উত্তরা ট্র্যাজেডির মতো ঘটনা ঘটতে থাকে। সংবাদ হবে। টকশোতে আলোচনার ঝড় বয়ে যাবে। পরক্ষণে আরেকটা নতুন ইস্যু এলে সেটি চাপা পড়ে যাবে।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/এমএস